একটু পরে ম্যাকেঞ্জি উঠে ভেতরের দিকে চলে গিয়েছিল।
তারপর দাঁতে দাঁত চেপে পিয়ার্সন গর্জে উঠেছিল, স্কাউণ্ডেল।
জনসন চমকে উঠেছিল, কে?
কে আবার? ম্যাকেঞ্জি।
না, ও কথা বলছ কেন? ফাদার লোক খুব ভালো। আমাদের কত ভালোবাসেন।
বিরক্ত, ঝাঁঝাল গলায় পিয়ার্সন বলেছিল, কাল সকালে বুঝবে, কেন গালাগালি দিলাম। কাল তোমার জন্যে যে সকালটা আসবে, একদিন এমনই একটা সকাল আমার জীবনেও এসেছিল। বলতে বলতে সশব্দে বেতের চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিল পিয়ার্সন।
এই পাহাড়ের নিসর্গের রূপ স্বপ্নের মতো মনে হয়েছে জনসনের। পরের দিন সকালে সুরটা ছিঁড়ে গেল। একটা তীব্র ঝনঝনানি সমস্ত না জুড়ে প্রবল ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল।
ম্যাকেঞ্জি প্রিচিংয়ের নতুন ভাষ্য শুনিয়েছিল, অদ্ভুত তাৎপর্য শিখিয়েছিল। মিশনারি হবার আগে, কি নাগা পাহাড়ে আসার আগে প্রিচিং সম্বন্ধে এমন হীন ধারণা তার কোনোদিন হয়নি। ভয়ে, আশঙ্কায় বুকটা তার থরথর কেঁপেছে। ধর্মপ্রচার সম্বন্ধে এমন কথা আগে কখনও শোনেনি সে। মনের দিক থেকে তখনও সুন্দর শুভ্র পবিত্র শৈশব পেরিয়ে আসতে পারে নি জনসন। তাই ম্যাকেঞ্জির ভাষ্য তার স্নায়ুগুলোকে মুচড়ে-দুমড়ে বিকল করে দিয়েছে। চারপাশের সুন্দর পাহাড়, আকাশ-ওক বন-পাইন বন, এর মধ্যে পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি নামে এক সাঙ্ঘাতিক দুঃস্বপ্ন ছিল, এর আগে তা কি কোনোদিন ভাবতে পেরেছিল জনসন।
মনে মনে জনসন ভীরু, দুর্বল এবং কুণ্ঠিত। প্রতিবাদ করতে সে জানে না। কুণ্ঠা, দ্বিধা ও সহজাত সংকোচ সবসময় তাকে আড়ষ্ট করে রাখে। অথচ ভেতরে ভেতরে সমগ্র সত্তার মধ্যে ভীষণ আলোড়ন হয়। যে-প্রতিবাদ বেরিয়ে আসার পথ পায় না তা ভাবনায় চিন্তায় পাক খেয়ে খেয়ে ছটফট করতে থাকে। যন্ত্রণায় বেদনায় জীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে।
দিনকয়েক আগে জুনোবটতে বড় পাদ্রী লোক পাঠিয়েছিল। জনকতক পাহাড়ী মেয়ে জোগাড় করে কোহিমায় পাঠাতে হবে। ম্যাকেঞ্জির আদেশ, হ্যাঁ আদেশই বলা উচিত, অমান্য করার সাহস নেই তার। গ্রামে গ্রামে মেয়ের খোঁজে নিজেই গিয়েছিল জনসন। মেয়ে মেলেনি। পাহাড়ীরা বর্শা উঁচিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। শাসিয়েছে, আর কোনোদিন এমন মতলব নিয়ে এলে প্রাণ নিয়ে ফিরতে হবে না। অনেকদিনের জানাশোনা, তার কাছ থেকে নিমক কাপড় খাবার অনেক পেয়েছে, তাই এবারটা রেহাই দিয়েছে।
.
চার্চের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে এলোমেলো নানা কথা ভাবছিল জনসন। আচমকা ভাবনার ঝোঁকটা অন্য দিকে ঘুরে গেল। একটু আগে বসওয়েলের স্কিমের কথা শুনেছে সে। পাহাড়ী মেয়েদের দিয়ে কোন উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে তা বুঝতে পেরেছে। শুনতে শুনতে ক্ষমাহীন। পাপবোধে, জঘন্য অপরাধের ছোঁয়ায় সমস্ত চেতনা কুঁকড়ে গিয়েছে, সারা শরীর ঘিন ঘিন করছে। এখন একটা পিণ্ডের মতো প্রবল কান্নার বেগ হাড়-মেদ-শিরা রক্ত চুরমার করে গলার কাছে ডেলা পাকিয়ে রয়েছে। কান্নাটা বেরিয়ে আসছে না, নিচের দিকে নেমেও যাচ্ছে না। অনড় হয়ে গলায় চেপে রয়েছে। জনসন ভাবল, একটু কাঁদতে পারলে বুকটা হালকা হয়ে যেত। সমস্ত সত্তার ওপর যে অসহ্য, অকথ্য পীড়ন চলছে তা থেকে মুক্তি পেতে হলে কাঁদতে হবে। কাঁদতেই হবে।
সে ভীরু, দুর্বল এবং কুণ্ঠিত। এখানে এসে পিয়ার্সনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। পিয়ার্সন অদম্য এক যুবক। তাকে পাওয়া গেলে এখন সব কিছু বলা যেত। এই মানসিক পীড়ন, এই ভীষণ নির্যাতন সে আর সহ্য করতে পারছে না। বুকের মধ্যে বাতাস আটকে আটকে আসছে। চারপাশে এত অফুরন্ত বায়ুস্রোত, তবু জনসনের নিশ্বাস নেবার মতো সামান্য বাতাস যেন কোথাও নেই।
ক্লান্ত পা ফেলে ফেলে পবিত্র ভজনালয়ে চলে এল জনসন। শ্বেত পাথরের মসৃণ বেদি। সামনে ক্রাইস্টের মর্মর মূর্তি। জ্যোতির্ময় পুরুষের প্রসারিত বাহুতে বরাভয় এবং করুণা। চোখে ক্ষমাসুন্দর প্রসন্ন দৃষ্টি। জনসন তাকিয়ে রইল। আচমকা একটু আগের কান্নাটা গলার কাছে ফুলে ফুলে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। শুভ্র বেদিতে আছড়ে পড়ল জনসন, আছড়ে পড়ল একটি পাপের অনুভূতি। পরম পুরুষের পায়ের নিচে লুটিয়ে লুটিয়ে একটু আশ্রয় চাইল, ক্ষমা প্রার্থনা করল ব্যাকুলভাবে।
বেদিতে ফুলে ফুলে জনসন কাঁদছে। যে কান্নাটা গলার কাছে আটকে ছিল এবার সেটা পথ। পেয়েছে। হু-হু–বেগে নেমে আসছে। কাঁপা কাঁপা আকুল গলায় জনসন বলছে, ওহ্ ক্রাইস্ট, আই অ্যাম আ সিনার। সেভ মি, সেভ মি। আই কনফেস, আই অ্যাম আ সিনার। ওহ ক্রাইস্ট–
জ্যোতির্ময় পুরুষের পদপ্রান্তে একটি অন্যায়, একটি অনিচ্ছাকৃত পাপ কেঁদে কেঁদে শুদ্ধ হচ্ছে, পবিত্র হচ্ছে, চোখের জলে কালিমা ধুয়ে যাচ্ছে।
.
৪৩.
মুখোমুখি নিঝুম বসে রয়েছে পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি আর পুলিশ সুপার বসওয়েল। কেউ কথা বলছে না, একেবারেই চুপচাপ। শুধু ম্যাকেঞ্জির আঙুলের তলা দিয়ে রুপোবাঁধানো জপমালাটা মসৃণ গতিতে সরে সরে যাচ্ছে। ঠুনঠুন করে মৃদু ধাতব আওয়াজ হচ্ছে। এ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। রাতের শান্তি এখন অবাধ, একটানা।
লোহার গেটে কাঁচ করে আওয়াজ হল। ম্যাকেঞ্জির রোমশ আঙুলের তলায় জপমালা এবং বসওয়েলের দাঁতের ফাঁকে আইভরি পাইপটা চমকে উঠল।
একটি মাত্র মুহূর্ত। তার পরেই উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল ম্যাকেঞ্জি, আরে সর্দার, এসো এসো। তারপর তোমদের সালয়ালা গ্রামের খবর কী?
