এদেশে আসার আগে ইংরেজ মিশনারি, যারা ভারতবর্ষ ঘুরে এসেছে, তাদের কাছে এখানকার অনেক কথা শুনেছে জনসন। শুনে মুগ্ধ, বিস্মিত হয়ে গিয়েছে। টেগোর এবং কোনো কোনো ইংরেজ লেখকের রচনায় ভারতবর্ষের কিছু কিছু কাহিনি সে পড়েছে। এ দেশের নিসর্গ নাকি অপূর্ব। অতি মনোরম। যতদূর দৃষ্টি ছড়ানো যায়, শুধু সীমাহীন নীল আকাশ, ফসলভরা সবুজ খেত। পাহাড়-নদী-সমুদ্র। শুনতে শুনতে কিংবা পড়তে পড়তে মন নেচে উঠেছে। এক দুর্দম, অমোঘ আকর্ষণে ইণ্ডিয়ার মাটি তাকে ক্রমাগত টেনেছে।
ভারতবর্ষে আসার সবচেয়ে সোজা, সহজ পথটাই ধরেছিল জনসন। সরাসরি সে চার্চে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে পরম পিতার পতাকা মাথায় তুলে কিছুদিন দক্ষিণ ভারতের এক উপজাতি গ্রামে কাটিয়ে কোহিমা পাহাড়ে এসেছে, তা-ও মাস কয়েক হল।
এই নাগা পাহাড়। টিলা-উপত্যকা-মালভূমি-গুহা বন, ফুল-পাখি-গাছ, সাপের মতো পাক খাওয়া পথ, ঝরনা আর গর্জমান নদী। জনসনের ভালো লেগেছিল। অপরিসীম ভালো লাগার আনন্দে মনটা সবসময় ভরে থাকত। রক্তে রক্তে এই পাহাড়, তার আকাশ বাতাস নেশার মতো জড়িয়ে থাকত।
কোহিমা থেকে যে পাহাড় কাটা পথটা মাও-এর দিকে চলে গিয়েছে, সেটা ধরে একা একা অনেকদূর চলে যেত জনসন। বাঁ পাশে অতল গভীর খাদ, ঘন বন। লালচে রঙের আখুশি ফল থোকায় থোকায় পেকে রয়েছে, সবুজ পাতায় রোদ চিকচিক করে। শান্ত, হিম হিম ছায়া রয়েছে খেজাঙ কাটার ঝোপে। ঝাঁকে ঝাঁকে আউ পাখি পাখা ঝাঁপটায়। বাতাসে ঢেউ ওঠে, সোঁ সোঁ শব্দ হয়। কখনও চোখে পড়ে, খাসেম গাছের মাথায় পাহাড়ী বানর লাফাচ্ছে। নিচের উপত্যকায় দাঁতাল শুয়োর ছুটছে। এক ধরনের নীলাভ পাহাড়ী সাপ হামেশাই দেখা যায়। হিলহিলে দেহ নিয়ে এঁকে বেঁকে পলক পড়তে না পড়তেই অদৃশ্য হয়। বেশ লাগে জনসনের। দেখতে দেখতে বিস্ময়ে দুচোখ ভরে যায়। মন বুঁদ হয়ে থাকে।
পড়ন্ত বিকেলে পশ্চিম পাহাড়ের মাথায় সূর্যটা রক্তপিণ্ডের মতো দেখায়। রোদ নিভু নিভু হয়ে আসে। বাতাসে হিম হিম আমেজ ঘন হতে থাকে। সেইসময় কোহিমায় ফেরার পথ ধরে জনসন।
সন্ধ্যায় চার্চে ফিরে সোৎসাহে বলতে থাকে, ফাদার, অদ্ভুত ধরনের সব গাছ আর লতা দেখলাম। এত মোটা লতার এত ছোট পাতা হোমে দেখিনি। সাদা গাছ দেখলাম একটা, নাম জানি না। আমাদের চার্চে তো পাহাড়ীরা আসে, তাদের কাউকে নিয়ে একদিন যাব, লতা আর গাছ চিনিয়ে দেবে।
ম্যাকেঞ্জি বিশেষ কথা বলত না। দুঠোঁটে মৃদু, নীরব হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ত। প্রথম প্রথম সে হাসিতে সস্নেহ প্রশ্রয় ছিল, কিছুটা বা কৌতুক।
একদিন হয়তো জনসন বলল, এই দেশটা চমৎকার। এমন সুন্দর বন আর পাহাড় আগে দেখিনি। আজকে ফাদার নীলচে সাপ দেখলাম। এত ভালো লাগল! গলায় মুগ্ধ সুর ফুটে উঠত জনসনের।
ম্যাকেঞ্জি বিড়বিড় করে কী বলত, ঠিক বোঝা যেত না।
উচ্ছ্বাসে ছেদ পড়ত। থতমত গলায় জনসন বলত, বেগ ইওর পারডন।
আশ্চর্য ক্ষমতা ম্যাকেঞ্জির। একটু বিচলিত হয় না সে। মুখের রেখাগুলোকে একটুও না ভেঙে, যথাযথ রেখে, সেই মৃদু, নিঃশব্দ হাসিটা হাসত। বলত, খুব খুশি হলাম। এই দেশ তা হলে তোমার ভালো লেগেছে।
বলেন কী ফাদার! প্রবল উৎসাহে ফেটে পড়ত জনসন, এমন দেশ জীবনে আর দেখি নি।
শান্ত, নির্লিপ্ত গলায় ম্যাকেঞ্জি বলত, বেশ বেশ। তবে একা একা বেশি ঘুরো না। তোমার ওই চার্মিং নীলচে সাপগুলো কিন্তু সাঙ্ঘাতিক বিষাক্ত। বাঘ, হাতি, দাঁতাল শুয়োর কিন্তু হামেশাই বেরোয়। আর পাহাড়ীরা বিদেশি দেখলে বর্শা দিয়ে কুঁড়েও ফেলতে পারে। সাবধানে ঘোরাফেরা করবে।
দিনগুলো চমৎকার কাটছিল। রোদ-পাখি-মেঘ-আকাশ নদী ঝরনা দেখতে দেখতে,পাহাড়ী ধুলো গায়ে মেখে পথ হাঁটতে হাঁটতে নেশা ধরে যেত। একদিন সন্ধ্যার পর ম্যাকেঞ্জি বলল, পাহাড় দেখে, বন-নদী-ঝরনা দেখে তো মাসখানেক কাটালে। আশা করি, এবার তুমি আসল। কাজের জন্যে তৈরি হবে।
একটু চমকে জনসন বলেছিল, কী কাজ?
বাঃ! যে জন্যে তোমার এখানে আসা সেই কাজ। প্রিচিং। একটু কঠিনই হয়তো শুনিয়েছিল ম্যাকেঞ্জির গলা, শোন, আমি ঠিক করেছি, আসছে সপ্তাহ থেকেই তোমাকে পিয়ার্সনের সঙ্গে পাহাড়ীদের গ্রামে পাঠাব। ওর কাছে কেমন করে প্ৰিচ করতে হয়, শিখে নেবে। আর পাহাড়ীদের ভাষাটা শিখে নিয়ো, বুঝলে? একটু ছেদ। তারপর আবার বলেছে, কাল সকালে আমার সঙ্গে দেখা করবে। প্রিচিং সম্বন্ধে দুচারটে কথা বলব।
ইয়াস ফাদার। দু পাশে মাথা হেলিয়ে জনসন বলেছিল খুব আস্তে, নিরুৎসুক গলায়।
কথা বলতে বলতে আচমকা চোখে পড়েছিল জনসনের, পাশের বেতের চেয়ারে পিয়ার্সনের সাড়ে ছ ফিট ঋজু দেহটা চুপচাপ বসে রয়েছে। নিশ্বাসের শব্দ হচ্ছিল না। বুকটা। ওঠানামা করছে কিনা, বোঝা যাচ্ছিল না। চওড়া কাঁধ, ঈষৎ মোটা নাক, জানু পর্যন্ত দীর্ঘ পেশীপুষ্ট হাত এবং বিশাল সবল একখানা বুকের দুর্দান্ত মানুষটা কেমন নিঝুম হয়ে ছিল। জনসনের নজর পড়েছিল পিয়ার্সনের চোখে। দেখেছিল, পিয়ার্সনের চোখজোড়া জ্বলন্ত ধাতুপিণ্ডের মতো জ্বলছে এবং নির্নিমেষে ম্যাকেঞ্জির মুখে আটকে আছে। তার দৃষ্টিতে জ্বালা। রোষ ক্ষোভ এবং হিংস্রতা একাকার হয়ে মিশে ছিল। দেখতে দেখতে জনসন কেমন যেন হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
