বিমূঢ় মুখে তাকিয়ে রইল জনসন। প্রায় অসাড় গলায় বলল, পুলিশ ব্যারাকে মেয়েগুলোকে পাঠিয়ে কী হবে মিস্টার বসওয়েল?
কী হবে! হে-হে-হে–টেনে টেনে শব্দ করে হাসতে লাগল বসওয়েল। সে হাসিতে মেদস্ফীত বিপুল দেহটা দুলতে লাগল। একটা বিরাট মাংসের পিণ্ড থরথর কাঁপছে। হাসির দমকে আঙুলের ফাঁক থেকে আইভরি পাইপটা ঘাসের জমিতে ছিটকে পড়ল।
আঙুলের নিচে জপমালাটা আবার থেমে গিয়েছে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির। মুখে বিরক্তি ফুটে বেরিয়েছে। ঈষৎ ঝঝাল গলায় সে বলল, এতটা মাড়ল-হেডেড তোমাকে আমি ভাবতে পারিনি জনসন; এতটা বোকা তুমি! খাতার পাতায় খালি অঙ্কই কষেছ, তাকে জীবনে প্রয়োগ করতে শেখনি। গম্ভীর, ভরাট গলায় ম্যাকেঞ্জি বলে চলল, আমাদের পুলিশগুলো হল ইন্ডিয়ান। সমতলের লোক। আর মেয়েগুলো এই পাহাড়ের। প্লেনসে গ্যান্ডি স্বরাজ স্বরাজ করে চল্লিশ কোটি লোককে খেপিয়ে তুলছে। এই নাগা পাহাড়ে তার দেখাদেখি গাইডিলিও পাহাড়ী কুত্তাগুলোকে তাতাচ্ছে। সমতল আর পাহাড়ের লোকেরা একসঙ্গে হলে উপায় থাকবে না। তাই দুদলের মধ্যে সবসময় একটা বিরোধ জিইয়ে রাখতে হবে। এর নাম হল রাজনীতি। বলে একটু থামল ম্যাকেঞ্জি।
পেঁজা তুলোর মতো কয়েক টুকরো মেঘ আকাশের কোনোকুনি পাড়ি দিচ্ছে। দূরের ওক বনে কক কক শব্দ করে এক ঝাক আউ পাখি ডেকে উঠল। এখন রাত কত, ঠিক বোঝা যাচ্ছে। না। তবে কোহিমা শহর আশ্চর্য নিস্তব্ধ, অদ্ভুত রকম নিঝুম।
একটু পর ম্যাকেঞ্জি আবার শুরু করল, পাহাড়ীগুলো মনে করবে, তাদের মেয়েদের ইজ্জত নিচ্ছে সমতলের লোকেরা। আমরা গ্রামে গ্রামে তাই চাউর করে দেব। আর বউ কি সুইটহার্ট ছেড়ে চাকরির দায়ে যেসব প্লেনসম্যান এখানে এসেছে, তাজা হিল বিউটি পেলে তারা পোষা কুকুরের চেয়েও বেশি বশে থাকবে। এ সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত। আমার বিশ্বাস, পাহাড়ীদের একবার খেপিয়ে দিতে পারলে গাইডিলিওর মুভমেন্ট ইন্ডিয়ার প্লেনসম্যানদের বিরুদ্ধে ঘুরে যাবে। তারপর বুঝতেই পারছ। ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করে শব্দহীন অথচ ইঙ্গিতময় হাসি হাসল ম্যাকেঞ্জি।
ঘাসের জমি থেকে আবার পাইপটাকে কুড়িয়ে নিয়েছে বসওয়েল। নতুন উদ্যমে তামাক পুরতে পুরতে সে বলল, এবার আশা করি বুঝতে পারছে ইয়ং ফাদার। ব্যাপারটা সহজ সরল করে দিলে এই দাঁড়ায়। যেমন করেই হোক, পাহাড়ের এই মুভমেন্ট ভেঙেচুরে তছনছ করে দিতে হবে। আই থিঙ্ক, নাউ ইউ উইল অ্যাডমায়ার মাই স্কিম।
ডান দিকের ভুরুটা কুঁচকে, কপালে খাঁজ ফেলে জনসনের পিঠে গোটাকয়েক মৃদু এবং সস্নেহ চাপড় দিল ম্যাকেঞ্জি। বলল, মাই বয়, এবার যাও। অনেক রাত হয়েছে। তুমি টায়ার্ড হয়ে আছ। খাওয়াদাওয়া সেরে শুয়ে পড় গিয়ে।
বেতের চেয়ার থেকে উঠে পড়ল জনসন। ক্লান্ত, এলমেলো পা ফেলে সামনের চ্যাপেলের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। কপালের দু’পাশে দুটো রগ দপদপ করে লাফাচ্ছে। গলার কাছে একটা নীল শিরা পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে। স্নায়ু ইন্দ্রিয় হাড় মেদ দিয়ে গড়া দেহটা অবসাদে ঝিমঝিম করছে। কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। বুকের মধ্যে শ্বাসকষ্টের মতো একটা অনুভূতি। আতঙ্কে এবং উত্তেজনায় ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে কপালে। সমস্ত চেতনা কেমন যেন অবশ, অসাড় হয়ে যাচ্ছে। জনসনের মনে হল, এখন পিয়ার্সনকে পেলে ভাল হত, খুব ভাল হত।
রূপকথায় গরগনদের কাহিনী শুনেছে। জনসন ভাবল, বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি এবং পুলিশ সুপার বসওয়েল, দুজনেই গরগন। তাদের সামনে এলে সমস্ত চেতনা, বিচার বুদ্ধি, বিবেক লোপ পেয়ে যায়। সমস্ত সত্তা পাথরের মতো নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। নিজের স্বাধীন ভাবনা এবং চিন্তাগুলি প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পায় না। শুধু মাথা নেড়ে তাদের কথায় সায় দেওয়া ছাড়া দেহমনের সক্রিয় ইন্দ্রিয়গুলো বিকল হয়ে যায়।
গরগন, এই নামকরণের কৃতিত্ব পিয়ার্সনের। পিয়ার্সন ওদের দুটোকে গরগন নামে ডাকে। জনসনের মনে হয়, শুধু গরুগন নয়, নরকের দুটো প্রেত ম্যাকেঞ্জি আর বসওয়েল নাম নিয়ে কোহিমার পাহাড়ে উঠে এসেছে।
পাহাড়ী অজগর যেমন নিশ্বাসে এবং দৃষ্টির জাদুতে নিরীহ সম্বরকে আচ্ছন্ন এবং বিমূঢ় করে তার গ্রাসের মধ্যে টেনে আনে, ঠিক তেমন করেই ম্যাকেঞ্জি ও বসওয়েল তার বুদ্ধি বিচার-চিন্তা-ভাবনা অথর্ব করে তাকে মুঠোর মধ্যে নিয়ে আসে। আর একটা অসহায়, নিরুপায় শিকারের মতো তাদের সামনে চুপচাপ বসে থাকে জনসন।
চ্যাপেলের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে অতীত জীবনটাকে মনে পড়ে জনসনের। সঙ্গে সঙ্গে মনের সঙ্গোপন কোণে বর্তমান জীবনের সঙ্গে একটা তুলনামুলক দ্বন্দ্বও বুঝি চলে।
সে জীবনটা ইংলণ্ডের আঙুর খেতে, ছায়াতরুর তলায় তলায়, পাইন এবং ফুলপাতা-ভরা ঝোপেঝাড়ে ছড়িয়ে ছিল। সেসব দিনে য়ুনিভার্সিটিতে পিওর ম্যাথমেটিকসের নোট নিত জনসন আর রোমান্টিক কবিতা লিখত। কবিতার বিষয় ছিল নিসর্গ। নদীর নীল জলে উইলো পাতার ছায়া কাঁপে, রুপোলি মাছ লাফায়, আকাশে সূর্য রং ঢেলে দেয়, সোনার জরিমোড়া মেঘ উড়ে যায়, রুপোর গুঁড়োর মতো ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ে, হু-হু–বাতাস ছোটে, উঁচু উঁচু গাছগুলো এলোপাথাড়ি মাথা কোটে, রাত্রি নামে, কখনও আঁধি, কখনও জ্যোৎস্না। ফেনার মতো সাদা ধবধবে শান্ত আলো ছড়িয়ে ছড়িয়ে স্থির হয়ে থাকে। চাঁদের আলোয় রোদবৃষ্টি-মেঘ-বাতাস এবং মরশুমি পাখির ডানার শব্দ রক্তে মিশে ছিল জনসনের। সুযোগ পেলেই নিঃসঙ্গ নিরালা আখবনের ধারে ঘাসফড়িং আর প্রজাপতি দেখত সে। দূরে দূরে কৃষাণদের ফার্ম হাউস, বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক–সব মিলিয়ে একটা অনির্বচনীয় খুশিতে মনটা ভরে থাকত।
