বিরাট মাথাটা প্রবলভাবে নেড়ে মৃদু হাসল বসওয়েল, ওহ নো নো, মাই ইয়ং ফাদার। এ একেবারেই অসম্ভব। ব্রিটিশার স্পাই চিনতে ভুল করে না। যদি করত, তা হলে এত বড় দুনিয়ায় রাজত্ব করা আমাদের কোনোকালেই সম্ভব হত না। তাছাড়া, এই পাহাড়ী মানুষগুলো অন্য ধাতুতে গড়া। আমাদের সভ্য জগৎ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা, নিমকহারামি নামে বিশেষ বিশেষ শব্দগুলো এখনও এই সব পাহাড়ে এসে পৌঁছুতে পারেনি। তাই বাঁচোয়া। একবার যদি এদের টাকা কাপড়-খাবার দিয়ে বশ করে নিতে পারা যায়, তা হলে জীবনে এরা কোনোদিনই বেইমানি করবে না। তাই ভরসা আছে, আজ হোক, কাল হোক, গাইডিলিও ধরা পড়বেই। আর তা সম্ভব হবে এই পাহাড়ীদের দিয়েই। একটু থামল পুলিশ সুপার বসওয়েল। দু’পাটি দাঁতের ফাঁকে পাইপটাকে আরো হিংস্রভাবে কামড়ে ধরল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে লাগল, সেদিন, ইয়াস–দ্যাট ডে কোহিমার খোলা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে মাগীকে আমি চাবুক মারব। তার ওপর বেয়নেট প্রাকটিশ করাব। অ্যান্ড দেন–ভয়ঙ্কর মুখভঙ্গি করে, একটা সাঙ্ঘাতিক ইঙ্গিত দিয়ে বসওয়েল থেমে গেল।
কিছুক্ষণের জন্য নিরেট স্তব্ধতা নেমে এল ঘাসের জমিতে।
দাঁতের ফঁক থেকে পাইপটাকে হাতের তালুতে নিয়ে মোটা মোটা আঙুল দিয়ে বারকয়েক তাল ঠুকল বসওয়েল। তারপর বলতে লাগল, অবশ্য সব ব্যবস্থাই আমি করেছি। প্লেনসম্যানদের সঙ্গে যাতে এই পাহাড়ের কোনো যোগাযোগ না থাকে, গাইডিলিওর মুভমেন্টের খবর যাতে প্লেনসের লোকেরা জানতে না পারে, তার জন্যে সব পথ বন্ধ করে দিয়েছি। সে সব থাক। যে জন্যে আসা, আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। সমতলের লোকেদের সঙ্গে কোনোমতেই পাহাড়ীগুলোকে মিশতে দেওয়া হবে না। তা ছাড়া, কাঁটা দিয়ে কাটা তুলতে হবে। সেই জন্যে স্কিমটা কেঁদেছিলাম। তা মেয়ে জোগাড় করতে পারলেন ফাদার?
আমি তো আপনার কথামতো জুনোবট, চোঙলিয়া, সাজুবট–সব জায়গায় মিশনারিদের খবর পাঠিয়েছি। তারা যেন মেয়ে জোগাড় করে কোহিমা পাঠিয়ে দেয়। এই তা জুনোবট থেকে জনসন এসেছে। তাকে জিগ্যেস করুন। ম্যাকেঞ্জি বলল। তার আঙুলের তলায় জপমালাটা আবার সচল হয়েছে।
পাইপের মাথায় তাল ঠুকতে ঠুকতে বসওয়েল বলল, কী ব্যাপার ইয়ং ফাদার, মেয়ে জোটানো গেল?
না। একেবারেই ইমপসিবল। আমি নিজে গিয়েছিলাম গ্রামে গ্রামে। পাহাড়ীরা বর্শা নিয়ে তেড়ে আসে। প্রখর দৃষ্টিতে বসওয়েলের মুখের দিকে তাকাল জনসন।
চুক চুক–আলটাকরা এবং জিভের সহযোগে অদ্ভুত শব্দ করল বসওয়েল, সর্বনাশ! আপনি নিজে যান কেন? কক্ষনো এই সব ব্যাপারে নিজে সামনে থাকবেন না। পেছনে থেকে পাহাড়ীদের দিয়ে করাবেন। নিজে গেলে মিশনারিদের সম্বন্ধে এই হিলি বিস্টগুলো খারাপ ধারণা করে নেবে। এতে আমাদের ক্ষতি, ভীষণ ক্ষতি।
পাহাড়ীদের দিয়ে কী করে করাব?
হাঃ-হাঃ-হাঃ–কোহিমার শান্ত সমাহিত রাতকে চমকে দিয়ে বসওয়েলের গলায় অট্টহাসি বাজল, এবারে হাসালেন ইয়ং ফাদার। এমন একটা ওয়ার্থলেস বোকা প্রশ্ন আমি আপনার কাছে আশা করি নি। পাইপের মাথায় মোটা মোটা আঙুলের তালটা এবার আরো উদ্দাম হয়ে উঠেছে। বসওয়েল আবার শুরু করল, মানি মানি–টাকা, ব্রাইব, ইয়াস ব্রাইব, এই ব্রাইব দিয়ে এদের রিপুতে ক্রমাগত সুড়সুড়ি দিতে হবে। তারপর এই পাহাড়ের মনুষ্যত্ব আর সরলতাকে কিনে নিতে হবে। আই থিঙ্ক মাই ইয়ং ফাদার, দিস সিলভার মেটাল ক্যান মেক এনি ইমপসিবস পসিবল, পসিবল ইমপসিবল। তবে রুটির কোন দিকে মাখন মাখাতে হবে সেই আর্টটা জানা দরকার। অর্থাৎ টাকাটা কেমন করে খরচ করতে হবে সে সম্বন্ধে দস্তুরমতো জ্ঞান থাকা চাই। আর একটা কথা, পাহাড়ীগুলো একটু একটু করে চালাক হয়ে উঠছে। তাই এই সব গুরুতর ব্যাপারে ইউ মাস্ট চুজ রাইট পারসনস।
জনসন বলল, আমি কিন্তু একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারছি না মিস্টার বসওয়েল। এই মেয়ে সংগ্রহের সঙ্গে ধর্মপ্রচারের কী সম্পর্ক? একটু আগে ফাদারকে আমি সেকথা জিগ্যেস করছিলাম। এ তো দস্তুরমতো পাপ। আমার বড় ভয় করে।
পরিষ্কার গলায় বসওয়েল বলল, এতটুকু সম্পর্ক নেই। প্রিচিং-এর সঙ্গে মেয়ে জোগাড়ের কোনোরকম যোগাযোগ থাকতে পারে না। আবার পারেও। দুটো মোটা মোটা ঠোঁটের ফাঁকে এক টুকরো রহস্যময় হাসি ঝুলতে লাগল বসওয়েলের। আগের কথার খেই ধরে বলল, কী বলছিলেন ইয়ং ফাদার, ভয়! হেঃ—ভয় শব্দটা কিন্তু ইংরেজের জীবন থাকতে নেই। আর পাপ? আপনি দেখছি অত্যন্ত ইমোশানাল শুচিবাইগ্রস্ত যুবক। অনেক লোককে অন্ধকার থেকে আলোতে আনতে গেলে, ব্যাপটাইজ করতে গেলে, এসব ব্যাপার ধর্তব্যের মধ্যে আনতে নেই। ভয় করে! পাপ! হেঃ, কাওয়ার্ড কোথাকার?
কিন্তু মিস্টার বসওয়েল, আপনি তো বললেন না প্রিচিং-এর সঙ্গে মেয়ে জোগাড়ের সম্পর্ক কী? কাঁপা কাঁপা, ভাঙা গলায় জনসন জিগ্যেস করল। তার চোখ দুটো অসহায়ভাবে বসওয়েলের বিরাট মুখে আটকে রইল।
সেটা হল আমার স্কিমের ব্যাপার। ব্রিটিশ রাজত্বকে এই পাহাড়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে ওটা দরকার। মেয়েগুলোকে আমি কোহিমার পুলিশ ব্যারাকে ছেড়ে দেব। পুলিশ হল ইন্ডিয়ার প্লেনসমেন। এবার বুঝতে পারছেন, আশা করি। একটা রহস্যময় হাসি বসওয়েলের বিরাট ভয়ঙ্কর মুখখানায় কতকগুলো কুটিল রেখা ফুটিয়ে তুলল।
