ইয়াস ফাদার–বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জনসন। ম্যাকেঞ্জির সামনে এলে বিচারবুদ্ধি, বিবেক, দেহমন এবং শিরাস্নায়ুর সমস্ত জোর বিকল হয়ে যায়। নিরুপায়ের মতো বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। কী এক সম্মোহন যেন জানে ম্যাকেঞ্জি। তার গলার স্বরে, চোখের মণিতে অদ্ভুত ধরনের কুহক আছে।
ম্যাকেঞ্জি বলল, লোকের কাছে আমাদের পরিচিত হতে হবে মিশনারি নামে, আর কাজ করতে হবে ব্রিটিশার হিসেবে।
কেন?
জাতির স্বার্থের খাতিরে। ফর আ বেটার কজ, ফর আ গ্রেটার ইন্টারেস্ট। বুঝলে কিনা, একটু আগে বলেছিলাম সারা পৃথিবীতে ক্রিস্ট্যানিটি প্ৰিচ করতে হবে। তার মানে কী? তার মানে হল, ক্রিস্ট্যানিটির তলায় তলায় ব্রিটিশ রাজত্বকে বাড়ানো। আন্ডার ওয়ান ব্রিটিশ ব্যানার, আন্ডার হিজ একজন্টেড ম্যাজেস্টিস রুল সমস্ত পৃথিবীকে জড়ো করতে হবে। এই কাজে ক্রিস্ট্যানিটি হল আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। প্রভু যীশুর পুণ্যনাম আমাদের স্বার্থে লাগাতে হবে। রাজত্ব বাড়লে প্রিচিঙের ক্ষেত্রও বাড়বে। আশা করি, সব কিছু পরিষ্কার হয়েছে।
হয়েছে। কিন্তু ফাদার, এ তো ক্রিস্ট্যানিটি আর যীশুর নামকে দস্তুরমতো এক্সপ্লয়েট করা।
বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির মুখে আবার সেই স্বর্গীয় হাসি ফুটে বেরিয়েছে। আশ্চর্য শান্ত গলায় বলল, মাই বয়, এক্সপ্লয়েট শব্দটা শুনতে খারাপ। ওকথা বোলো না। সমস্ত পরিষ্কার করে দিয়েছি, এ সম্পর্কে আর আলোচনা নয়। এবার অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। ম্যাকেঞ্জির আঙুলের তলা দিয়ে জপমালাটা মসৃণ গতিতে সরে সরে যাচ্ছে। মাথার ওপর চাঁদ আরো উজ্জ্বল হয়েছে। দূরে ওক বনের মাথা চিকচিক করছে। শান্ত, স্তব্ধ এবং সমাহিত হয়ে রয়েছে চারপাশের পাহাড়। একটা আঁচড়ের মতো ফুটে বেরিয়েছে আনিজা উইখুর দীর্ঘ রেখাটা।
জনসন বলল, ক্ষমা করবেন, একটা ব্যাপার আমার কাছে কিছুতেই ক্লিয়ার হচ্ছে না ফাদার।
কী ব্যাপার?
আপনি যে পাহাড়ী মেয়েগুলো জোগাড় করে এখানে পাঠাতে বলেছিলেন, তার সঙ্গে আমাদের প্রিচিং আর রাজত্ব বাড়বার কী সম্পর্ক? তা ছাড়া ও তো সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। আপনার কথামতো মেয়ে জোগাড় করতে গিয়ে প্রাণটা গিয়েছিল আর একটু হলে। আমার বড় ভয় করে এসব করতে। স্তিমিত, ভীরু গলায় জনসন বলল।
গেটে ক্যাচ করে শব্দ হল। ঘাসের জমিতে মসমস আওয়াজ করে একজোড়া উদ্ধত ভারী বুট এগিয়ে আসছে। পুলিশ সুপার বসওয়েল।
সোল্লাস অভ্যর্থনায় গদগদ হয়ে উঠল বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি, আসুন, আসুন মিস্টার বসওয়েল।
একটা বেতের চেয়ার টেনে বসে পড়ল বসওয়েল। বিরাট পাইপের পেটে টোবাকো পুরতে পুরতে ম্যাকেঞ্জির দিকে তাকাল, তারপর ফাদার, আমাদের সেই স্কিমটা যে তামাদি হতে চলল। আপনার সাহায্য না পেলে বড় অসুবিধায় পড়ব। অসুবিধা কি, স্কিম স্কিমই থেকে যাবে। তাকে আর বাস্তবে রূপ দেওয়া যাবে না। একটু থেমে আবার বলল, ইয়াস, কয়েক ডজন পাহাড়ী গার্ল আমার চাই। এই হিলি বিউটি দিয়েই বিস্টগুলোকে আমি শায়েস্তা করব। বুঝতেই পারছেন, আমরা মানে পুলিশের লোকেরা গ্রামে গ্রামে হানা দিয়ে তো মেয়ে জোগাড় করতে পারি না। তাতে অনেক ল্যাঠা। পাহাড়ীগুলো সাঙ্ঘাতিক খেপে রয়েছে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে দ্যাট মিনক্স ড্যামনড় উইচ গাইডিলিওটা আমাদের বিপক্ষে পাহাড়ী কুত্তাগুলোকে তাতাচ্ছে। কী বলব ফাদার, গ্রেট ওয়ারের সমস্ত হরর, সব ম্যাসাকর আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। জীবনে আমার অনেক অভিজ্ঞতা। কিন্তু গাইডিলিও শয়তানী আমাকে পাগল করে ছাড়ছে। পাইপটা আধাআধি আন্দাজ মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে হিংস্রভাবে কামড়ে ধরল বসওয়েল।
পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির বুড়ো আঙুলের নিচে জপমালাটা থমকে গেল। তীক্ষ্ণ স্বরে সে জিগ্যেস করল, গাইডিলিও এখন কোথায়?
তাই যদি জানব, তা হলে কি কোহিমার পাহাড়ে চুপচাপ বসে থাকি, না পাইপ কামড়াই? দু হাতের দশটা মোটা মোটা আঙুলে হতাশাব্যঞ্জক মুদ্রা ফুটিয়ে বসওয়েল বলল, বুঝলেন ফাদার, গ্রেট ওয়ার ফেরত লোক আমি। জীবনে অনেক কিছু দেখেছি। কিন্তু এই গাইডিলিও মেয়ে নয় ফাদার, একটা দুঃস্বপ্ন। একশো পুলিশ নিয়ে শিকারি কুকুরের মতো পাহাড়ে পাহাড়ে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এই হয়তো খবর পেলাম শয়তানীটা লোহটাদের গ্রামে রয়েছে। দলবল নিয়ে সেখানে ছুটলাম। কোথায় কে? পৌঁছে দেখি বেমালুম হাওয়া হয়ে মিলিয়ে গেছে। এই তো পরশু রাত্রিতে কোনিয়াক সর্দার খবর দিয়ে গেল, ছুকরিটা নাকি তাদের পাশের গ্রামে আস্তানা গেড়েছে। আবার দৌড়। সমস্ত রাত গ্রামটাকে ঘিরে রইলাম। সকালবেলা পাহাড়ীদের ঘরে ঘরে ঢুকে সার্চ করলাম। তাজ্জবের ব্যাপার, কখন যে আমাদের করডনের মধ্য দিয়ে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মাগীটা ভেগেছে, টেরই পেলাম না। লাইফটাকে একেবারে মিজারেবল করে তুলেছে পাহাড়ী কুত্তীটা। ওহ ক্রাইস্ট, যা দেখছি, গ্রেট ওয়ারের সব ফেম আমার নষ্ট হয়ে যাবে এই কোহিমাতে এসে। অবসন্ন ভঙ্গিতে বেতের চেয়ারে নিজের বিরাট দেহটাকে টান টান করে ছেড়ে দিল বসওয়েল।
পাশ থেকে জনসন বলল, এমনও তো হতে পারে, পাহাড়ী সর্দারেরা হ্যারাস করার জন্যে আজেবাজে খবর দিচ্ছে।
