ম্যাকেঞ্জি লক্ষ করতে লাগল, তার কথাগুলোতে জনসনের মুখেচোখে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে।
লজ্জিত সুরে জনসন বলল, না না ফাদার, আমি তা মীন করিনি। কর্তব্যে কি সংগ্রামে আমি একটুও ভয় পাই না। ক্রিস্ট্যানিটির জন্য আমি প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারি। কিন্তু–
কিন্তু কী?স্থির দৃষ্টিতে তাকাল ম্যাকেঞ্জি। চোখের ফঁদটা এবার আরো স্পষ্ট হয়েছে, বল বল, থামলে কেন?
আপনি যা বলেছেন তা করতে গিয়ে জুনোবটতে মারা পড়েছিলাম আর কি। পাহাড়ীরা স্পিয়ার নিয়ে তাড়া করেছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। ত্রস্ত গলায় জনসন বলে চলল, আমি তো ভেবেই পাই না ফাদার, প্রিচিঙের সঙ্গে এর সম্বন্ধ কোথায়?
ম্যাকেঞ্জির মুখ থেকে সুন্দর, সস্নেহ হাসিটুকু এবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মসৃণ, শুভ্র কপালে একটা অদৃশ্য মাকড়সা আবার আঁকাবাঁকা রেখায় কুটিল জাল বুনতে লাগল। ফিসফিস গলায় বড় পাদ্রী বলল, ইউ টু ডেসপেয়ার অ্যান্ড ড্রপ, মাই চ্যাপ! তোমাকে আমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি। ইয়াস, তোমার ওপর ভরসা করে আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। জুনোবটর ছোট সেন্টারে এখন তুমিই সর্বেসর্বা। তুমি জানো না, কোহিমার এই বড় চার্চে আমার পর তুমিই বড় পাদ্রী হবে। ইউ উইল বী মাই সাকসেসর।
থ্যাঙ্কস, মেনি থ্যাঙ্কস ফাদার। আপনার এই মহত্ত্বের জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব আই উড রিমেন এভার গ্রেটফুল। উদ্দীপনায় দেশলাইর কাঠির মতো ফস করে জ্বলে উঠেই কিন্তু পরক্ষণে নিভে গেল জনসন। কঁপা, ভাঙা গলায় বলল, কিন্তু ফাদার, প্রাণের ভয়ের কথা বাদ দিলেও কনসায়েন্সে বড় বাধছে। মন থেকে কিছুতেই সায় পাচ্ছি না। কনসায়েন্স–
সরু, চিকন শব্দ করে হাসল ম্যাকেঞ্জি। জনসনের পিঠে মৃদু চাপড় মারতে মারতে বলল, কনসায়েন্স খুব ভালো জিনিস জনসন। ভেরি গুড থিঙ। কিন্তু জানো মাই বয়, মাঝে মাঝে ওই বিবেক বোধটাকে ধরেবেঁধে শিকেয় তুলে রাখা দরকার। নইলে ওটা ভীষণ গণ্ডগোল পাকিয়ে দেয়। হে হে, বুঝলে কিনা, কনসায়েন্স, অনেস্টি, মোরাঙলিটি এই সব গোলমেলে শব্দগুলো মাঝে মাঝে ভুলে যেতে হয়। নইলে অসুবিধা হয়, ভয়ানক অসুবিধা হয়।
কিন্তু ফাদার–বলতে বলতে কুণ্ঠিতভাবে জনসন থেমে গেল। তার থতমত দৃষ্টিটা ম্যাকেঞ্জির মুখের ওপর থমকে গেল।
এই কোহিমা শহর, সু-লুর রাত্রি, শুভ্র ফেনার মতো জ্যোৎস্না, আকাশের ছায়াপথ, চারপাশে বন-টিলা-পাহাড়, মাঝখানে এই চার্চ। কেমন এক আবছা রহস্যে সব কিছু ভরে রয়েছে।
ম্যাকেঞ্জি হাসছে। জনসনের মনে হয়, ম্যাকেঞ্জির হাসি বড় দুর্বোধ্য। জটিল অঙ্কের চেয়েও দুরূহ। সেই হাসিটা এখন স্বর্গীয় হয়ে উঠেছে। শান্ত, গম্ভীর গলায় ম্যাকেঞ্জি বলল, বুঝেছি, সব বুঝেছি জনসন। একটা কথা তোমাকে পরিষ্কার করে দিতে চাই। তার আগে বলব, আমার জীবনে অনেক কিছু দেখেছি। তোমার চেয়ে আমার বয়েসও কম করে পঁচিশ বছর বেশি হবেই। অভিজ্ঞতা বল, বয়েস বল, জীবনদর্শন বল সব দিক থেকেই আমি তোমার সিনিয়র। আই থিঙ্ক, ইউ মাস্ট অ্যাডমিট।
ও–সিয়োরলি ফাদার, সিয়োরলি–জনসন মাথা নাড়ল।
মাকড়সা যেমন জাল বুনে বুনে মাছি, ভোমরা কি অন্য পতঙ্গ শিকারের আশায় তাকিয়ে থাকে, ঠিক তেমনই ভঙ্গিতে পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি তাকাল জনসনের দিকে। বলল, ভেরি গুড মাই বয়। এবার আসল কথায় আসা যাক। সাত বছর ধরে এই নাগা পাহাড়ে আমি প্ৰিচ করছি। এখানে এসে একটা বড় সত্য খুঁজে পেয়েছি। ইয়াস, আ কলোসাল টুথ, পারহ্যাপস দা বেস্ট ইন মাই লাইফ। বলতে পার মাই বয়, সেটি কী?
ম্যাকেঞ্জির চোখজোড়া সন্ধানী আলোর মতো জনসনের মুখে এসে পড়ল। সে মুখ বোকা, মূঢ় এবং বিহ্বল দেখাচ্ছে।
ম্যাকেঞ্জি ফের বলতে লাগল। তার গলায় আত্মপ্রসাদ এবং কৌতুকের সুর, পারলে না তো? জানি, পারবে না। কিন্তু মাই বয়, কথাটা আমি অনেক অনেকবার বলেছি। লাইক এনি ওল্ড টেল টোল্ড, দেন রি-টোল্ড সো মেনি টাইমস। যাই হোক, সত্যটি হল, আমরা প্রথমে ব্রিটিশারস, তার পরে মিশনারি। এ শুধু সত্য নয়, এ আমাদের আদর্শ, জীবনদর্শন।
কিন্তু ফাদার, পিয়ার্সন যে বলে আমরা প্রথমে মিশনারি, পরে ব্রিটিশার।
পিয়ার্সন! সারা মুখের সেই স্বর্গীয় হাসিটুকু নিভে নিভে ঠোঁটের ফাঁকে একটা সূক্ষ্ম এবং কুটিল ভঙ্গির মধ্যে মিলিয়ে গেল। চোখের কটা মণি দুটো একবার যেন জ্বলে উঠল। গলাটা একটু কঠিনও যেন শোনাল, কোহিমায় আসার পর তোমার সঙ্গে আজ পিয়ার্সনের দেখা হয়েছে কি?
না ফাদার। জুনোবট যাবার আগে পিয়ার্সনের কাছে ওকথা শুনেছি।
বিড়বিড় করে প্রায় নিঃশব্দে কী যেন বলতে লাগল বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি।
জনসন বলল, আই কান্ট ফলো ইউ ফাদার–
না না, ও কিছু নয়। আমার কথাটা সবসময় মনে রাখতে চেষ্টা করবে, আমরা প্রথমে ব্রিটিশারস, পরে মিশনারি।
ও তো ন্যারো আউটলুকের কথা।
ম্যাকেঞ্জি করুণার হাসি হাসল। মুখেচোখে পরম বাৎসল্যের ভঙ্গি ফুটে বেরুল তার। বলল, তোমাদের বয়েসে ওকথা মনে হবে। কিন্তু অনুপাতটা কষে দেখ। তুমি তো অঙ্কের ছাত্র ছিলে। দেখ, ব্রিটিশারদের যে জনসংখ্যা তার তুলনায় আমরা মিশনারিরা কজন? খুব সামান্য। ভেরি মাইনর ইন নাম্বার। তা হলেই বোঝ, মিশনারি নামে পরিচিত হতে দৃষ্টিভঙ্গি আরো কত ছোট করতে হয়।
