বর্শাসহ হাতখানা নেমে এল সেঙাই-এর। নাগাদের প্রথা অনুযায়ী মেহেলীতার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছে। পাতা নাড়িয়ে তার ওপর বসার পর হত্যা করা রীতিমতো অপরাধ।
পলকহীন তাকিয়ে আছে মেহেলী। তার দু’টি ছোট ছোট চোখে আতঙ্ক আর অসহায়তা।
সেঙাইও তাকিয়ে ছিল। তার চোখে একটা বিরক্ত ভ্রুকুটি ফুটে রয়েছে। থাবার সীমানায় শিকার। অথচ তাকে বিন্দুমাত্র আঘাত হানা এক নিকৃষ্ট পাপাঁচরণ। কোনমতেই তার অনিষ্ট করা চলবে না। পুরোপুরি বশ্যতা স্বীকার করেছে মেহেলী।
লম্বা লম্বা পা ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে থমকে দাঁড়াল সেঙাই। মনের মধ্যে অনেক দিন আগে শোনা খাপেগার কাহিনী স্নায়ুতে তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি করল হঠাৎ। এমনি নিঃশব্দ আর নির্জন এক ঝরনাধারার পাশে বহুকাল আগে মুখোমুখি হয়েছিল নিতিৎসু আর জেভেথাঙ। পোকরি আর জোহেরি বংশ। আশ্চর্য মিল। আশ্চর্য যোগাযোগ। এত বছর পর দুই বংশের উত্তরকাল আবার সেই ঝরনার পারেই মিলিত হয়েছে। সেঙাই আর মেহেলী। টিজু নদীর এপার আর ওপার। অনেক বছর আগে দুই বংশের যে দুই যৌবন এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের যবনিকা তুলে দিয়েছিল, কালের অমোঘ প্রভাবে তারা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। নতুন কালে মেহেলী আর সেঙাই, দুই বংশের নতুন যৌবন আবার অন্য এক সংগ্রামের নায়ক-নায়িকা হয়ে এল কিনা, কে বলতে পারে।
চারিদিকে একবার সতর্ক চোখে তাকাল সেঙাই। কিছু বিশ্বাস নেই শত্রুপক্ষের কুমারী যৌবনকে। হয়তো আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে লোহার মেরিকেতসু কি একখানা তীক্ষ্ণধার থেনি মী (স্ত্রীলোর বর্শা)। একটু অসাবধান হলেই সাঁ করে ছুঁড়ে মারবে। নাঃ, তেমন সন্দেহজনক কিছুই আবিষ্কার করতে পারল না সেঙাই।
রেঙকিলান আসেনি। অতিকায় ন্যাড়া পাথরটার ওপাশ থেকে সে সেঙাই আর মেহেলীর ভাবগতিক লক্ষ করছিল কি করছিল না। এক ভয়াল ভাবনা তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছে। আনিজার কবল থেকে অশুচি দেহমন আর ভাবনাটাকে কিছুতেই মুক্ত করতে পারছে না রেঙকিলান। নিজের দেহটাকে অস্বাভাবিক ভারী মনে হচ্ছে তার। বিশাল পাথরটার ওপর শরীর হেলিয়ে দিয়ে নির্জীবের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে।
আরো একটু এগিয়ে এসেছে সেঙাই। এবার তার প্রাকুটিটা সরে গেল। তার বদলে এক বিস্মিত কৌতূহল ফুটে বেরিয়েছে, হু-হু, তোর আচ্ছা সাহস তো! হুই বস্তি থেকে রোজ এ বস্তির ঝরনায় আসিস চান করতে! ভয়-ডর নেই একটুও?
চারদিক দেখে আসি। এই ঝরনায় চান করতে আমার বড় ভালো লাগে।
কিন্তু কেউ যদি দেখে ফেলে?
না, কেউ দেখবে না। নিশ্চিন্ত আনন্দে ঝরনার হিমাক্ত জল গায়ে ছিটিয়ে ছিটিয়ে দিতে লাগল মেহেলী।
এই যে আমি দেখে ফেললুম।
তুই তো আমাকে মারলি না। আর কেউ এলে পাতা নেড়ে নেড়ে তার ওপর বসে পড়ব। আমার বাপ বলে দিয়েছে। তা হলে আর কেউ মারবে না। শান্ত মুখে এতটুকু ভাবনার লেশ নেই এখন মেহেলীর। দুই চোখে আর ঠোঁটে মধুর রহস্যের মতো হাসি লেগে রয়েছে শুধু।
জানিস, আমাদের আর তোদের বস্তিতে ভীষণ ঝগড়া!
জানি তো। অপরূপ সরল চোখে তাকাল মেহেলী।
তবু তোর ভয় নেই?
ভয়ের কী আছে? আমি পাহাড়ী মেয়ে না? ঝঙ্কার তুলে হেসে উঠল মেহেলী।
আশ্চর্য মেয়ে! এই নগ্ন সৌন্দর্যের মধ্যে শুধু রূপই নয়, শুধু একটা আদিম আকর্ষণই নয়, আরো কিছুর সন্ধান পেল সেঙাই। একটা বিচিত্র ভাবনার দোলা লাগল অস্ফুট পাহাড়ী যৌবনের চেতনায়। সে ভাবনার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবে না সেঙাই। তবু দেহ নয়, শুধু রূপগত নয়, যেন আরো অভিনব কিছু আছে মেহেলীর মধ্যে। ভয়ের লেশ নেই, ভাবনার এতটুকু লক্ষণ নেই, পরম নিশ্চিন্তে সে পার হয়ে এসেছে টিজু নদীর ভয়ঙ্কর সীমানা। এমন মেয়ে নিঃসন্দেহে বিচিত্র, অদ্ভুত। সেঙাইর বন্য পাহাড়ী মন তার অধস্ফুট বুদ্ধি দিয়ে এই মেয়েটিকে ঠিক বুঝতে পারছে না। তবু নেশার মতো এক আলোড়ন জেগেছে শিরায় শিরায়, স্নায়ুতে স্নায়ুতে।
একসময় সেঙাই বলল, তুই চান কর। আমাদের খিদে পেয়েছে। যাচ্ছি।
সত্যি, পেটের মধ্যে খিদের ময়াল ফুঁসছে। ক্লান্ত দু’টি পা রেঙকিলানের দিকে বাড়িয়ে দিল সেঙাই।
.
০৩.
উত্তরের পাহাড়টা যেখানে একটা খাড়াই বাঁক ঘুরে নিচের মালভূমিতে নেমে গিয়েছে ঠিক সেখানে একটা বড় আরেলা ঝোঁপের পাশে বসে আছে ওঙলে আর পিঙলেই। পড়ন্ত বেলার নিবু নিবু আলোর রংটুকু আসন্ন সন্ধ্যা যেন শুষে নিচ্ছে। অন্ধকার নামতে দেরি নেই। পশ্চিম পাহাড়চূড়ার আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে দিনান্তের সূর্য। শুধু দূরের আকাশ-ছোঁয়া চূড়াটা ঘিরে এখনও লালচে একটু আভা ছড়িয়ে রয়েছে।
গোটা পাঁচেক ঝরনা, দুটো জলপ্রপাত আর বনময় বিরাট মালভূমিটা ডিঙিয়ে উত্তরের পাহাড়ে চলে এল সেঙাই আর রেঙকিলান।
ওঙলে বড় বড় টঘুটুঘোটাঙ পাতার ওপর কাঁচা চাল, ঝলসানো বাসি মাংস, কাঁচা লঙ্কা আর আদা সাজিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাঁশের চোঙায় ভর্তি রয়েছে উত্তেজক পানীয়। হলদে রঙের রোহি মধু।
একটি কথা বলল না সেঙাই। খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে আধফোঁটা উল্লাসের শব্দ করে উঠল মাত্র। তারপর টঘুটুঘোটাঙ পাতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
থাবায় থাবায় কঁচা চাল মুখে তুলছে সেঙাই। সেই সঙ্গে আদা, কাঁচা লঙ্কা আর খণ্ড খণ্ড মাংস। একসময় খাবার শেষ হয়ে গেল। তারপর বাঁশের বিশাল পানপাত্রটা ঠোঁটের ওপর তুলে নিল সে। একটি মাত্র চুমুক। রোহি মধুর শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত শুষে নিয়েছে সে।
