তারপর একান্ত আচমকা, সারপ্লিসটা খুলে ফেলল পিয়ার্সন। বেরিয়ে এল সাড় ছ ফিট ঋজু এক স্পোর্টসম্যান। একবার সর্দারের দিকে সে তাকাল। লোকটার ঘোলাটে, ঈষৎ লালচে চোখে মৃত্যু ঝিলিক দিচ্ছে। সেই ভয়ানক চোখজোড়া নিষ্পলক পিয়ার্সন নামে এক দুর্দান্ত প্রতিপক্ষের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
প্রথমটা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল সর্দার। তার বর্শার লক্ষ্যকে ব্যর্থ করে দিয়েছে ওই সাদা মানুষটা, ওই পাগলা সাহেব। তার অসংখ্য বছরের জীবনে এমনটি আর কোনোদিনই ঘটেনি। তার বর্শার তাক এমন করে আর কখনও ব্যর্থ হয়নি। সর্দারের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ী জোয়ানগুলোও অবাক এবং স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।
কেউ কিছু করা বা বলার আগেই আমারী গাছটার দিকে ছুটল পিয়ার্সন। চিনাসঙবার একটা হাত ধরে টানতে টানতে সামনের নিঝুম ঝরনাটা পেরিয়ে গেল। প্রথমটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ছুটছিল চিনাসঙবা। বলা যায়, পিয়ার্সনই তাকে ছোটাচ্ছিল। একটু একটু করে ঘোরটা কেটে গেল। প্রাণ বাঁচাবার আদিম, জৈবিক তাড়নায় পিয়ার্সনের পাশাপাশি নিজেই সে এবার দৌডুতে লাগল। জোরে, আরো জোরে। তীব্র, প্রবল গতিতে।
একটা সাদা এবং একটা উজ্জ্বল বাদামি দেহ সাঁ সাঁ করে দূরের চড়াইটার দিকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
পেছনে থেকে সর্দার চিৎকার করে উঠল, শয়তানের বাচ্চারা ভাগল। ধর—ধর–ফুঁড়ে ফেল।
সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের জোয়ানদের গলা থেকে একটা আকাশ ফাটানো গর্জন বেরিয়ে এল, হো-ও-ও-ও-য়া-য়া–
.
৪২.
কোহিমা পাহাড়ে বাতাস মেতে উঠেছে। সমতলের দেশ পাড়ি দিয়ে কত দূর থেকে বাতাস এসেছে, কে জানে। পাক খেতে খেতে চারপাশের বনভূমি মাতিয়ে ঝাঁকিয়ে নাচিয়ে, ফল-পাতা ঝরিয়ে, এলোপাথাড়ি ডালপালা ভেঙেচুরে, টিলায় টিলায় আছাড়ি পিছাড়ি খেয়ে সোঁ সোঁ ছুটছে। কোহিমার বাতাস-জখমী জানোয়ারের মতো সেটা কেবল ফেঁসে আর গর্জায়।
আকাশে আশ্চর্য সুন্দর চাঁদ উঠেছে। সু লু (শুক্ল পক্ষের চাঁদ। ধবধবে জ্যোৎস্না ফেনার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এই শহর কোহিমা, চারপাশে টিলায় টিলায়, চূড়ায় চূড়ায় দোল-খাওয়া নাগা পাহাড় আলো আঁধারির বুননে রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
চার্চের সামনে নিরপেক্ষভাবে ছাঁটা ছোট ঘাসের জমি। সবুজ মখমলের মতো নরম এবং সুখস্পর্শ। একটু দূরে কাঠের সাদা ক্রস। মানবপুত্র নিজের রক্ত দিয়ে এই রিপুতাড়িত, ভোগাসক্ত এবং সংস্কারাচ্ছন্ন জগৎকে শুদ্ধ করেছিলেন, পবিত্র করেছিলেন। এই ক্রস আক্ষেপ, মূঢ়তা এবং প্রায়শ্চিত্তের স্মৃতি।
ঘাসের জমিতে খানকয়েক বেতের চেয়ার ইতস্তত ছড়ানো। একটিতে জাঁকিয়ে বসেছে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে অলস ভঙ্গিতে জপমালা ঘোরাচ্ছে।
সামনের গেটে কাঁচ করে শব্দ হল।
বিডস জপতে জপতে গভীর, আত্মগত ভাবনায় মগ্ন হয়ে ছিল বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। কপালে মাকড়সার জালের মতো অনেকগুলো সূক্ষ্ম হিজিবিজি রেখা ফুটে রয়েছে। গেটে শব্দ হতেই চমকে তাকাল সে। ভাবনাটা পেঁজা তুলোর মতো মনের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। সামনের দিকে তাকিয়ে চোখের কটা মণিদুটো একটু নেচে উঠেই প্রসন্নতায় ভরে গেল। কপাল থেকে মাকড়সার জালটা মুছে গিয়েছে। সোচ্ছ্বাসে ম্যাকেঞ্জি রীতিমতো ব্যস্ত হয়ে উঠল, আরে, তুমি দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ওই চেয়ারটায় বোসো।
কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে সামনের বেতের চেয়ারে বসল জনসন। ম্যাকেঞ্জি এবার বলল, তারপর মাই চ্যাপ, জুনোবটতে কেমন প্রিচিঙ চলছে? বলতে বলতে সমস্ত মুখে সস্নেহ হাসি ফোঁটাল। এই ধরনের হাসি বহুদিনের সাধনায় আয়ত্ত করেছে ম্যাকেঞ্জি। যে-কোনো সময়, একান্ত অবলীলায় সে এমন ভঙ্গিতে হাসতে পারে। সমস্ত মুখে হাসি আর দুই চোখের মণিতে অতি ধূর্ত, অতি চতুর এবং সূক্ষ্ম একটা ফাঁদ পেতে জনসনের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
প্রিচিঙ খুব সুবিধের হচ্ছে না ফাদার। বিষঃ দেখাল জনসনকে।
কেন? কটা চোখের মণিতে সেই ফাঁদটা এবার একটু একটু করে স্পষ্ট হতে লাগল বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির।
কেন আবার, এদিকে যীশু মেরী বলবে, ওদিকে আবার কুকুর শুয়োর মোষ বলি দেবে। নুড়ি-পাখি-সাপবাঘ পুজো করবে। এমন করলে এত কষ্ট করে পিচ করে কী লাভ? হতাশ, মুষড়ে-পড়া গঙ্গিতে জনসন বলল।
আইডেলেটারস, ইনফিডেলস, হিলি বিস্টস–জপমালা ঘোরাতে ঘোরাতে শব্দগুলোকে কড়মড় করে চিবুতে লাগল যেন ম্যাকেঞ্জি, এই প্যাগানগুলোকে ব্যাপটাইজ করা আমরা তো কোনো ছার, যীশুর ফোরফাদারেরও সাধ্য নেই।
পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির উচ্চারণে মহিমা আছে। এমন সংযতভাবে, মুখের একটি রেখাকেও বিকৃত করে, জপমালার ওপর ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা নিরুত্তেজ রেখে, এত আস্তে কথাগুলো জিভ থেকে বার করে আনে, মনে হয়, সে বুঝি কোনো সুনীতি-বিষয়ক অরাকল আওড়াচ্ছে।
জনসন বলল, কী বললেন ফাদার?
ও কিছু নয়। ব্যাপার কি জানো জনসন–বেতের চেয়ারটা আরো একটু এগিয়ে এনে সরাসরি জনসনের চোখের দিকে তাকাল ম্যাকেঞ্জি। দৈব আবেশ যেন ভর করল তার গলায়, এত সহজে বিশ্বাস হারালে কিংবা হতাশ হলে তো চলবে না মাই বয়। প্রভুর নির্দেশমতো আমরা, এই মিশনারিরা সমস্ত ওয়ার্ল্ডে ছড়িয়ে পড়েছি। সন্স অব সিনারদের অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যেতে হবে। ডোন্ট বী ডিজেক্টড মাই চ্যাপ। পৃথিবীর দশ দিকে যেশাসের নাম ছড়িয়ে দিতে হবে। ইন দা ডেজার্ট, ইন দা সী, ইন দা ফরেস্ট, ফ্রম ওয়ান পোল টু অ্যানাদার, বুঝলে কিনা জনসন, যেখানে এতটুকু জীবনের চিহ্ন রয়েছে, সেখানেই আমরা, ইয়াস আমরা উড হোল্ড অ্যালফট ফ্ল্যাগ অব ক্রিস্ট্যানিটি। সার্টেনলি, ডু উই মাস্ট–ম্যাকেঞ্জির ভরাট গম্ভীর গলা ধীর স্থির শান্ত। উত্তেজনা নেই, অস্থিরতা নেই তার মুখেচোখে। তীক্ষ্ণ কর্তব্যবোধে জনসনকে সজাগ করে দিতে দিতে ম্যাকেঞ্জি আবার বলল, জানো তো জনসন, অন্ধকারের সঙ্গে যেশাসকে কত সংগ্রাম করতে হয়েছে। এই অন্ধকার পাশব প্রকৃতির মানুষের কুসংস্কার, তাদের মূঢ়তা হীনতা এবং হিংস্রতার অন্ধকার। শেষ পর্যন্ত জগতের কল্যাণের জন্যে, পাপাচারীর সন্তানদের মতিগতি শুদ্ধ করার জন্যে প্রাণ পর্যন্ত তাকে দিতে হয়েছে। তবু কর্তব্য থেকে তিনি এক-পা সরে যাননি। আমরা তারই সন্তান। তাঁর অভিপ্রেত পথে নেমে আমাদের বিচলিত হলে তো চলবে না, মাই বয়।
