লাংফু গ্রামের সর্দার ক্রুর চোখে তাকাল। বলল, এখনও সরে যা বলছি পাগলা সায়েব। নইলে জানে মেরে ফেলব। তুই আমাদের বস্তিতে রোজ আসিস, তোকে আমরা খাতির করি। তাই বর্শা হাঁকড়াই না। এবার ভেগে যা। মাগীটাকে সাবাড় করতে দে।
স্থির দৃষ্টিতে একবার সর্দারের দিকে তাকাল পিয়ার্সন। মিশনারি পিয়ার্সন নয়, স্পোর্টসম্যান পিয়ার্সন। সর্দারের ঘোলাটে চোখে হত্যা ঝিলিক দিচ্ছে। ভীষণ, ভয়ঙ্কর এবং বীভৎস হত্যা। শিউরে উঠল পিয়ার্সন। নাগা পাহাড়ের এই বনস্থলীতে, এই উপত্যকায়, এই উজ্জ্বল রোদে ভরা দিনটাতে তার স্পোর্টসম্যান জীবনের এবং মিশনারি জীবনের এমন একটা মারাত্মক অরডিল, এমন একটা সাংঘাতিক পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল, তা কি সে জানত?
এবার খানিকটা দূরে আতামারি গাছের গায়ে একটা নগ্ন নারীদেহের দিকে তাকাল পিয়ার্সন–চিনাসঙবা। এতক্ষণ চিনাসঙবা ভয়ে কাঁপছিল। টলছিল। এখন একেবারেই নিথর হয়ে গিয়েছে। তার স্নায়ুশিরা, অস্ফুট বন্য মনের বোধ বুদ্ধি-অনুভূতি, হাড়-মেদ-মজ্জা, নিষ্ঠুর অপঘাতের প্রতীক্ষায় আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে। চোখের ঈষৎপিঙ্গল তারা দুটো স্থির হয়ে রয়েছে।
এধারে লাংফু গ্রামের সর্দার নামে এক আদিম হত্যা, ওধারে চিনাসঙবা নামে এক অসহায় প্রাণ। আলারি পাখির মতো বিশাল দুই বাহু বিস্তার করে এই ঝকঝকে উজ্জ্বল দিনে নাগা পাহাড়ের একটি হত্যা এবং একটি নিরুপায় জীবনকে দেখতে দেখতে স্থির সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছুল পিয়ার্সন। জীবন আর মৃত্যু। এই পাহাড়ী পৃথিবীতে তারা কত সহজ, কত স্বচ্ছন্দ, কত অন্তরঙ্গ, কত পাশাপাশি!
পিয়ার্সনের সমস্ত চেতনা জুড়ে একটা অমোঘ কর্তব্যের বোধ ক্রমাগত তাড়না করছে। চিনাসঙবাকে বাঁচাতেই হবে, যেমন করে হোক।
লাংফু গ্রামের সর্দার ফের হমকে উঠল, সরে যা পাগলা সায়েব।
না। নির্মম চোখে তাকাল পিয়ার্সন। তার গলায় বাজ চমকালো যেন, ওকে কেন মারবি? ও কী করেছে?
ইজা হুবুতা! দাঁতে দাঁত ঘষে লাংফু গ্রামের সর্দার বলল, সে আমাদের বক্তির ব্যাপার। হুই মাগী মোরাঙে ঢুকে মোরাঙের ইজ্জত মেরেছে। মাগীর আবার মরদ না পেলে রাত্তিরে ঘুম আসে না। মরদের খোঁজে মোরাঙে ঢুকেছিল। আমরা জেগে উঠে তাড়া দিতে এই জঙ্গলে পালিয়ে এসেছে। চারপাশের জোয়ানদের দিকে দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে সর্দার বলল, তাই না রে শয়তানের বাচ্চারা?
হু-হু–মাথা নেড়ে সমস্বরে সকলে সায় দিল, হুই উলুবাঙের খোঁজে মোরাঙে ঢুকেছিল। উলুবাঙ হল চিনাসঙবার পিরিতের জোয়ান।
একপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকলের ভাবগতিক লক্ষ করছিল উবাঙ। এবার প্রবল বেগে চওড়া ঘাড়, সেই সঙ্গে কোমর থেকে শরীরের উঁচু অংশটা নাড়তে নাড়তে বলল, হু-হু, ঠিক কথা। চিনাসঙবা আমার পিরিতের মাগী। তাই বলে রাত্তিরে ও মোরাঙে ঢুকবে! ও জানে না, মাগীদের মোরাঙে ঢুকতে নেই? ঢুকলে খুনখারাপি হয়ে যায়? বস্তির সব মানুষকে সারাদিন না খেয়ে গেন্না পালতে হয়? আনিজার নামে হলদে কুকুর বলি দিতে হয়? শয়তানীকে সাবাড়ই করে ফেলব। বলতে বলতে উলুবাঙ খুঁসে উঠল। বর্শা উঁচিয়ে লালচে, ক্রুদ্ধ চোখে চিনাসঙবার নিস্পন্দ দেহটার দিকে তাকাল।
বিহ্বল চিনাসঙবা তাকিয়েই রয়েছে। কিছুই যেন শুনতে, দেখতে বা বুঝতে পারছে না। যন্ত্রণা উত্তেজনা রোষ হিংসা-পাহাড়ী মনের তীক্ষ্ণ এবং স্পষ্ট ধর্মগুলো পর্যন্ত সে যেন হারিয়ে ফেলেছে। অদ্ভুত ধরনের এক মৃত্যুভয় তার শিরা-স্নায়ু-শোণিতের দেহটাকে বিকল, অথর্ব করে দিয়েছে। আতামারী গাছের গায়ে হেলান দিয়ে নিঝুম দাঁড়িয়ে আছে সে।
সব শুনলি তো? এবার মাগীটাকে খুঁড়তে দে। অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল লাংফু গ্রামের সর্দার।
না, ওকে আমি মারতে দেব না।
না মারলে মাগীটা থাকবে কোথায়? জঙ্গলে থাকলে বাঘ কি ময়ালের পেটে যাবে। হয়তো বুনো মোষের গুঁতোয় সাবাড় হবে। নইলে ডাইনি হবে। গুণতুক শিখে আমাদের খতম করবে। একটু থেমে, দম নিয়ে সর্দার আবার বলল, ও পাপ রেখে কাজ নেই। তুই যা পাগলা সায়েব, আমরা ওকে খুঁড়ি। বস্তিতে তো ওকে ঢুকতে দেব না, এই পাহাড়েও থাকতে দেব না। যা, যা সায়েব।
বস্তিতে ঢুকতে দিবি না কেন?
বস্তিতে ঢোকালে আমাদের ওপর আনিজার খারাপ নজর এসে পড়বে। সিঁড়িখেতে ফসল ফলবে না। গাছে ফল ধরবে না। কুকুর শুয়োরেরা বিয়োবে না। নতুন বিয়ের ছুঁড়িগুলো বাঁজা হয়ে যাবে। এবার বুঝতে পারছিস, মাগীটাকে কেন খুন করব?
যদি ও বাঁচতে চায়? যদি চিনাসঙবা অন্য পাহাড়ে পালিয়ে যায়?
সর্দার গর্জে উঠল, পালালেই হল!ইজা ঘুতা। আমরা পাহাড়ী মানুষ না? আমাদের হাতে বর্শা নেই? বলতে বলতে চোখজোড়া জ্বলতে লাগল সর্দারের।
একটু চমকে উঠল পিয়ার্সন। চমকের ভাবটা কাটলে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, মারবিই তবে মেয়েটাকে?
হু-হু, মাগীটাকে মারবার আগে তোকে সাবাড় করব। মোরাঙে ঢুকে হুই শয়তানী মোরাঙের ইজ্জত মেরেছে। তুই এসেছিস তাকে বাঁচাতে! তুই একটা আস্ত আনিজা। বলতে বলতে সর্দার বর্শাটা ছুঁড়ে মারল।
দীর্ঘ, টান টান একটা দেহ। শিরায় শিরায় চলমান রক্তের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন। ছিপছিপে বেতের মতো দেহটা একপাশে নুয়ে পড়েই খাড়া হয়ে গেল। এর মধ্যে বর্শাটা সাঁ করে পাশের একটা খাসেম গাছে গেঁথে গিয়েছে। নিমেষের মধ্যে ঘটনাটা ঘটল।
