হো-ও-ও-ও-য়া-য়া—
হো-ও-ও-ও-য়া—য়া–
জোয়ান ছেলেরা সমানে চেঁচাতে লাগল। একজন মেয়েটাকে দেখতে পেয়ে ঝোঁপের মধ্যে বর্শা ঢুকিয়ে খোঁচাতে চেষ্টা করছে।
হুই, হুই তো বসে রয়েছে মাগীটা। হুই তো চিনাসঙবা।
লাংফু গ্রামের সর্দার পাখির পালকের মুকুটে ঝকানি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, আর দেরি করছিস কেন? এবার বর্শা হাঁকড়াতে শুরু কর। মাগীটাকে ছুঁড়ে আবার বস্তিতে ফিরতে হবে না? দুপুর হয়ে এল। খিদে পাচ্ছে। নে, তাড়াতাড়ি কর।
খেজাঙের কাঁটাঝোপে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ উঠল। চিনাসাঙবা বলল, আমাকে মারিসনা সদ্দার। বর্শা হাঁকড়ালে একেবারে সাবাড় হয়ে যাব। একটু থেমে ওপাশের বেঁটেখাটো জোয়ানটাকে লক্ষ করে বলল, এই উলুবাঙ, আমাকে মারিস না। তুই না আমার পিরিতের জোয়ান। তোর খোঁজেই তো কাল রাত্তিরে মোরাঙে ঢুকেছিলাম।
উলুবাঙ দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠল, পিরিতের মরদ! কাল কি তোকে আমি মোরাঙে ঢুকতে বলেছিলাম? এখন তোকে কে বাঁচাবে? বলতে বলতেই খেজাঙ ঝোঁপের ওপর বর্শা ছুড়ল।
চিনাসঙবা কি জানত, উলুবাঙ নামে এক সুন্দর পিরিত, এক উদ্দাম পাহাড়ী যৌবন এত নির্মম, এত নিষ্ঠুর? সে কি জানত, পাহাড়ী সমাজের রীতিতে মমতা নেই, করুণা নেই, সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেও প্রেমিক পুরুষটিও ক্ষমা করবে না।
খেজাঙের কাটাঝোপে এতটুকু কঁক নেই। পাতায়, কাঁটায় এবং সরু সরু ডালে সেটা নিবিড় এবং জটিল হয়ে রয়েছে। উলুবাঙের বর্শা কাটাঝোঁপ ভেদ করে চিনাসঙবার সুন্দর কোমল দেহটাকে খুঁড়তে পারেনি।
উলুবাঙের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য জোয়ানেরা বর্শা ছুঁড়তে লাগল, কিন্তু খেজাঙের কাটাঝোঁপ বড় ঘন। তার মধ্য দিয়ে বর্শা ঢোকে না। একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগল না চিনাসঙবার গায়ে। নিস্পলক, অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে, হাঁটু দুটো বুকের মধ্যে গুঁজে দলা পাকিয়ে রয়েছে। চিনাসঙবা। এখন আর কথা বলছে না, নড়ছে না, কাঁপছে না। একেবারেই বোবা হয়ে গিয়েছে
লাংফু গ্রামের সর্দার সাঙ্ঘাতিক খেপে উঠল। একটা বর্শাও লক্ষ্যে গিঁথছেনা। সব নিশানাই ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছে। কদর্য মুখভঙ্গি করে সে হুঙ্কার ছাড়ল, পাহাড়ী জোয়ান হয়েছে শয়তানের বাচ্চারা! ঝোঁপের মধ্যে মাগীটা বসে রয়েছে, তাকে যদি একজনও খুঁড়তে পারে! ইজা টিবুঙ! তোদের কিছু করতে হবে না। যা, ভাগ। আমিই হুই চিনাসঙবাকে সাবাড় করব।
দুটো ঘোলাটে চোখ চারিদিকে ঘুরপাক খাইয়ে লাংফু গ্রামের সর্দার আবার গর্জে উঠল, এই চিনাসঙবা, এই মাগী, ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে আয়। নইলে ঝোপে আগুন ধরিয়ে দেব। হু-হু–
এতক্ষণে চিনাসঙবা নড়ে উঠল। বুকের মধ্যে গোঁজা হাঁটু দুটো ছিটকে গেল তার। চারপাশের বনভূমি চমকে দিয়ে আর্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, আ-উ-উ-উ-উ, না না, আগুন দিস না সদ্দার। পুড়িয়ে পুড়িয়ে না মেরে বর্শা দিয়েই খতম করে দে।
হ্বিক-হ্বিক-হ্বিক–বিকট গলায় টেনে টেনে হেসে উঠল লাংফু গ্রামের সর্দার। বলল, হু-হু, এর নাম হল ওষুধ। বেরিয়ে আয়, বেরিয়ে আয় শিগগির। বর্শা হাঁকড়াবার জন্যে হাতটা বড় নিশপিশ করছে। বলতে বলতেই দৃষ্টিটাকে জোয়ান ছেলেদের দিকে ঘুরিয়ে দিল, শোন রে টেফঙের বাচ্চারা, তোরা কেউ চিনাসঙবার গায়ে হাত দিবি না। আমি বর্শা দিয়ে গেঁথে, বল্লম দিয়ে ফুঁড়ে, সুচেন্যু দিয়ে কুপিয়ে একটু একটু করে মারব। হ্রিক-হি-হিক। ফের সেই হাসি শুরু হল।
খেজাঙের কাটাঝোঁপ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল চিনাসঙবা। তার সমস্ত দেহ থরথর কাঁপছে।
হ্বিক- হ্বিক-হ্বিক–বীভৎস হাসির রেশটা তখনও থামেনি। লাংফু গ্রামের সর্দার পরিতৃপ্ত, ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, তোকে তারিয়ে তারিয়ে মারব রে মাগী। যা, হই আতামারী গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়া।
সর্দারের নির্দশমতো আতামারী গাছের গায়ে ঠেসান দিয়ে দাঁড়াল চিনাসঙবা। দৃষ্টিটা বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছে। কিছুই সে দেখতে পাচ্ছে না, শুনতে পাচ্ছে না। তামাটে মুখখানা
পাঁশুটে দেখাচ্ছে, নগ্ন সুঠাম দেহটা টলছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না চিনাসঙবা। একটা কথাই সে এখন ভাবতে পারছে, কখন সর্দারের থাবা থেকে বিরাট খারে বর্শার ফলাটা ছুটে এসে তার পাজর কুঁড়ে দেবে।
একটু দূর থেকে বর্শা দিয়ে তাক করতে করতে ভয়ানক চোখে তাকাল লাংফু গ্রামের সর্দার। তার চোখের কালো খসখসে পাতা পড়ছে না। ঘোলাটে, ঈষৎ লালের ছোপধরা তারা দুটোতে ভয়ঙ্কর হিংস্রতা।
আকাশের দিকে বর্শাটা তুলে সর্দার যেই ছুঁড়তে যাবে, তার আগেই বিরাট একটা আলারি পাখির মতো দুটো বাহু বিস্তার করে মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল পিয়ার্সন।
বর্শা নামিয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে হুমকে উঠল লাংফু গ্রামের সর্দার, আছে ভু টেলো! এর মধ্যে তুই আবার কেন এসেছিস পাগলা সায়েব? ভেগে পড় এখান থেকে। মাগীটাকে খুঁড়তে দে।
না। গলায় স্বর অনেক উঁচুতে তুলে চেঁচিয়ে উঠল পিয়ার্সন। সেই চিৎকার দু’পালের পাহাড়ে আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে বাতাসে মিশে গেলে। চারিদিকের বনস্থলীতে তার রিশ অনেকক্ষণ ছড়িয়ে রইল।
লাংফু গ্রামের লোকেরা প্রথমটা চমকে উঠে, তারপর স্তব্ধ হয়ে গেল। পিয়ার্সন যে এমন হুঙ্কার দিতে পারে, তাদের ধারণা ছিল না।
এবার শান্ত, ধীর গলায় পিয়ার্সন বলল, না, আমার সামনে মেয়েলোককে খুন করতে দেব
