চিনাসঙবা হল ইটিভেনের মেয়ে।
তাকে খুঁড়বে কেন?
অসংখ্য শিশুকণ্ঠে এবার দোইয়াঙ নদীর জলোচ্ছাসের মতো শব্দ হল, তুই কি রে পাগলা সায়েব! তোর একটুও মগজ নেই। আমাদের বস্তির, লাঞ্চ বস্তির, হুই ফচিয়াগা বস্তির সবাই জানে আর তুই জানিস না! কাল মাঝরাত্তিরে চিনাসঙবা যে মোরাঙে এসে ঢুকেছিল। মাগীদের তো মোরাঙে ঢুকতে নেই। সদ্দার খেপে গেছে। ভয়ে চিনাসঙবা জঙ্গলে পালিয়েছে। তাকে ফুড়বার জন্যেই তো সকালবেলা জোয়ান ছেলেদের নিয়ে সদ্দার জঙ্গলে যাচ্ছে। মাগীটার রেহাই নেই। ওর ঘাড় থেকে আজ নিঘাত মুণ্ডু নেমে যাবে।
বিমূঢ়ের মতো পিসায়ন বলল, মোরাঙে কেন ঢুকেছিল চিনাসঙবা, কি রে?
ছেলেগুলো এবার চুপ করে গেল। এই জটিল জিজ্ঞাসার কোনো সরল উত্তর তাদের জানা নেই। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তারা। ফিসফিস করে একজন বলল, তা তো জানি না রে পাগলা সায়েব।
যে ছেলেটা পিয়ার্সনের লালচে চুলের গোছা ধরে ঝুলছিল, এবার সে একটা বুনো আপেলের মতো টুপ করে নিচে খসে পড়ল। তার মাথায় কয়েক গাছা মরা মরা ফ্যাকাসে চুল, লিকলিকে ঘাড়ের ওপর বড় মাথা, অতিকায় দুটো কান। অস্বাভাবিক ছোট দুটো কুতকুতে চোখ, বিরাট পেট, হাত-পা সরু সরু, মাংসহীন নীরক্ত দেহ। পাটকিলে রঙের মোটা ঠোঁটের মিটিমিটি হাসির সঙ্গে ছোট ছোট চোখে মজাদার ভঙ্গি ফুটিয়ে ছেলেটা বলল, ইজা হুবুতা! শয়তানের বাচ্চারা, তা-ও জানিস না! হুই চিনাসঙবার গায়ে যে পিরিতের জ্বালা ধরেছে। সদ্দারের ছোট ছেলে হল ওর গোয় লেন (প্রেমিক)। রাত্তিরে মরদের গন্ধ না পেলে মাগীর ঘুম আসে না। সেই ছোঁড়াটার খোঁজেই তো চিনাসঙবা কাল রাত্তিরে মোরাঙে ঢুকেছিল।
ছোট ছেলেটাকে বড় বিজ্ঞ বিজ্ঞ দেখাচ্ছে। দুচোখে কৌতুক মিশিয়ে তাকে লক্ষ করছিল পিয়ার্সন। যতটা ছোট সে তাকে মনে করেছিল, আসলে ততটা ছোট সে নয়। তেরো চোদ্দ বছর বয়স হবে। এই পাহাড়ের অফুরন্ত রোদবাতাস-আলো থেকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য জোগাড় করে নিতে পারেনি সে। দেহের মধ্যে নানা রোগ শিকড় গেড়ে বসেছে। সেই সব রোগ তার পুষ্টি, তার স্বাস্থ্য এবং বাড়কে চিরকালের জন্য ঠেকিয়ে রেখেছে। দেহটা বাড়তে পারেনি। দুর্বল, অশক্ত শরীর নিয়ে আর পাঁচটা শিশুর মতো সে দৌড়ঝাঁপ করতে, কি শিকারে যেতে পারে না। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্রিয়া নেই, সঞ্চালনও নেই। একপাশে বসে বসে সে কেবল দেখে আর ভাবে। ক্রমাগত ভাবতে ভাবতে মনটা অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ক্রিয়া করে। সুস্থ মানুষের ভেতর সহজ বৃত্তিগুলির অনুশীলন যেমন হয়, এই সব অসুস্থ জীর্ণ দেহের মানুষের মধ্যে তেমন হয় না।
পাহাড়ী গ্রামে যেমন নানা শাসনবিধি, আচার-বিচার, ন্যায়-অন্যায়ের কড়াকড়ি রয়েছে, ঠিক তেমনি খোলামেলা আকাশের নিচে দিনের আলোতে হঠাৎই হয়তো জীবনের আদিম প্রবৃত্তির নগ্ন প্রকাশ দেখা যায়। সেসবই চোখে পড়ে ছেলেটির। তার মন পঙ্গু, হাড় জিরজিরে দেহের শিরা-উপশিরার আলো-আঁধারি গলিখুঁজিতে অসহ্য তাড়নায় ছুটতে থাকে। একটু একটু করে মনটা পাকে। বয়সের তুলনায় জৈব প্রবৃত্তিগুলি সম্বন্ধে অনেক বেশি ধারণা হয়। মনের মধ্যে তোলপাড় চলে। রোগা অশক্ত দেহের, অকালপক্ক ছেলেটির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কৌতুক বোধ করছে পিয়ার্সন।
আচমকা পিয়ার্সন চমকে উঠল। নিচের উপত্যকা থেকে ভয়ঙ্কর হইচই উঠে আসছে। দোইয়াঙ নদীর দু’পাশের বনভূমিতে অসংখ্য বর্শা ঝলকাচ্ছে। সমগ্র সত্তা ভীষণভাবে নাড়া . খেয়ে উঠল পিয়ার্সনের।
হো-ও-ও-ও-য়া-য়া—
হো-ও-ও-ও-য়া—য়া–
ছেলেদের জটলাটা ভেঙেচুরে উপত্যকার দিকে ছুটে চলল পিয়ার্সন। পায়ের তলা দিয়ে ছিটকে ছিটকে বেরিয়ে যেতে লাগল ছোট ছোট কাটা গাছ, টিলা, কর্কশ পাথুরে পথ। মাথার ওপর সরে সরে যাচ্ছে অজস্র বুনো গাছের ডালপালা, ফুল আর হালকা মেঘের আকাশ। এই মুহূর্তে, এখনই, দোইয়াঙ নদীর পাড়ে ওই ঘন জঙ্গলটার পাশে তাকে পৌঁছুতে হবে। আরো, আরো জোরে পা চালিয়ে দিল স্পোটসম্যান পিয়ার্সন। আর পেছন থেকে ছোট ছোট ছেলেদের কলকলানি ধাওয়া করে আসতে লাগল, ও পাগলা সায়েব, শিকারে যাবি না? ও পাগলা সায়েব, গল্প বলবি না? তুই কোথায় পালাচ্ছিস? দাঁড়া দাঁড়া—
.
হো-ও-ও-ও-য়া-য়া—
হো-ও-ও-ও-য়া—য়া–
একটা খেজাঙের কাঁটাঝোঁপ ঘিরে চিৎকার উঠছে।
লাংফু গ্রামের সর্দার কানের নীয়েঙ দুলে নাড়া দিয়ে, হাতের বাঁকা বল্লম ঝাঁকিয়ে হুঙ্কার ছাড়ল, হু-হু, মাগীটা এই ঝোঁপের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। তোরা সবাই বর্শা হাঁকড়া। মাগীটার একটা পা আমি দেখতে পেয়েছি। হুই যে, হুই যে–
জনতিনেক জোয়ান ছেলে ঝোঁপের পাশ থেকে সর্দারের কাছে ছুটে এল, কই রে সদ্দার?
সমস্ত মুখে চামড়া কুঁকড়ে অসংখ্য আঁকিবুকি ফুটে রয়েছে। কপিশ চোখজোড়া জ্বলছে। লাংফু গ্রামের সর্দার হুমকে উঠল, আহে ভু টেলো! একেবারে কানা হয়ে গেছিস দেখি। বর্শা হাঁকড়ে আগে তোর চোখ উপড়ে নেওয়া দরকার। হুই দেখছিস না?
খেজাঙের কাঁটা ঝোঁপটার একেবারে মাঝখানে একটি উলঙ্গ নারীদেহ হাঁটু মুড়ে গুটিসুটি বসে আছে। চারপাশে কাটার ঝাড়। কিভাবে ঝোঁপের মধ্যে ঢুকেছে, সে-ই জানে। অসহায় করুণ চোখে সর্দারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মেয়েটি।
