ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল পিয়ার্সন। বাঁ দিকে মাও-গামী পথটা আঁকাবাঁকা ময়াল সাপের মতো পড়ে আছে। হঠাৎ দৃষ্টিটা চমকে উঠল তার। একটা সাদা বিন্দু অনেক দূরের বাঁকে সাঁ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। নির্ঘাত স্টুয়ার্ট।
সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে পিয়ার্সন চাপা গলায় গর্জে উঠল, সন অব আ বীচ! আচ্ছা, কোহিমায় ফিরে বোঝাপড়া হবে। বলতে বলতে উতরাই-এর দিকে নামতে লাগল, তোকেও ছাড়ব না, ওই ম্যাকেঞ্জিকেও না।
.
৪১.
গোটা দুই ছোট ছোট টিলা, একটা আতামারী জঙ্গল এবং তিনটে ঝরনা পেরিয়ে লাংফু গ্রামের সীমানায় এসে পড়ল পিয়ার্সন। সুন্দর ছবির মতো এক পাহাড়ী জনপদ। পাথরের খাঁজে খাঁজে ঘরবাড়ি।
এই সাঙসু ঋতু। ফুল এবং পাখির মরশুম। রাশি রাশি ফুল। আরেলা, সোনু, গুনু, টুঘুটুঘোটাঙ। অগুনতি পাখি। গুটুসঙ, আউ, খুকুঙগুঙ। ফুল আর পাখির রঙে রঙে ছোট্ট গ্রাম লাংফুকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে।
খেজাঙের কাঁটাঝোঁপটা পেছনে রেখে লাংফু গ্রামের মোরাঙের পাশে এসে পড়ল পিয়ার্সন। সামনের চত্বরে অনেকগুলো ছোট ছেলে বর্শা ছুঁড়ে ছুঁড়ে নিশানা ঠিক করছিল। বড় হয়ে এরাই ওস্তাদ শিকারি হবে। পিয়ার্সনকে দেখতে পেয়ে তারা চেঁচামেচি শুরু করল। তাদের। বয়স আট থেকে দশের মধ্যে। ন্যাংটো, হলদেটে গায়ের রং। বর্শা ফেলে সবাই ছুটে এসে পিয়ার্সনকে ঘিরে ধরল, পাগলা সায়েব এসেছে, পাগলা সায়েব এসেছে–
এই সব গ্রামের লোকেরা পিয়ার্সনকে পাগলা সায়েব বলে।
কয়েকটা ছেলে পিয়ার্সনের দীর্ঘ দেহটা বেয়ে বেয়ে কাঁধে, ঘাড়ে আর কোমরে উঠতে লাগল। দু’পাটি সাদা দাঁত বার করে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাসতে লাগল পিয়ার্সন।
ইতিমধ্যে নানা গলায় বায়না শুরু হয়েছে, ও পাগলা সায়েব, চল আমরা টেফঙ (পাহাড়ী বানর) ধরতে যাব। শিগগির চল–
না না, বাঘ শিকার করতে যাব হুই ঝরনার ধারে।
না না, শিকার না, আখুশি ফল আনতে যাব হুই ফচিয়াগা বস্তিতে।
না না, শিকারেও যাব না, হই ফচিয়াগা বস্তিতেও যাব না। গল্প বল পাগলা সায়েব–
জনকয়েক পিয়ার্সনের লালচে চুলের গোছা বাগিয়ে ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়েছে। কেউ ধারাল নখ বসিয়ে দিয়েছে সাদা ধবধবে হাতে। কোনোদিকে নজর নেই। এতটুকু বিরক্তি পর্যন্ত নেই। শুধু নিঃশব্দ, মিটিমিটি হাসিতে মুখখানা ভরিয়ে রেখেছে স্পোর্টসম্যান পিয়ার্সন। অজস্র শিশুকণ্ঠের কলকলানিতে সাঙসু ঋতুর সকালটা মেতে উঠেছে।
মাসতিনেক ধরে এই সব গ্রামে আসছে পিয়ার্সন। প্রথম প্রথম এদের ভাষা পরিষ্কার বুঝত না সে। পাহাড়ী মানুষের দেশে সাড়ে ছ ফিট ধবধবে পিয়ার্সন এক সীমাহীন বিস্ময়। প্রথম দিকে গ্রামের লোকজনের সংকোচ ছিল। দুচোখের কোঁচকানো দৃষ্টিতে ছিল সন্দেহ আর সংশয়। হুন্টসিঙ পাখির মতো সাদা এই মানুষটা তাদের অভ্যস্ত পাহাড়ী জীবনে কিসের খোঁজে এসেছে? দূরত্ব বজায় রেখে তারা তাকিয়ে থাকত পিয়ার্সনের দিকে।
লাংফু গ্রামের সর্দারই তাকে প্রথম নিয়ে এসেছিল। বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির কাছে ঘন ঘন যাতায়াত আছে সর্দারের। তাকে তিন চোঙা রোহি মধু কবুল করে এই ছোট্ট গ্রামে আসার অধিকার পেয়েছিল পিয়ার্সন।
প্রথম প্রথম পাহাড়ী মানুষগুলো দৃষ্টিতে যে সন্দেহ এবং সংশয় বল্লমের ফলার মতো চোখা হয়ে থাকত, একদিন তার বদলে প্রসন্ন অভ্যর্থনা ফুটে বেরুল। এই পাহাড়ী জীবন হাসি, খুশি, সহজ ভালবাসা, এবং সরলতা দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। আজকাল এদের ভাষা বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। নিজের ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে এখানকার ভাষা বলতে পারে পিয়ার্সন।
ছোট ছোট ছেলেগুলো এবার অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে, ও পাগলা সায়েব, দাঁড়িয়ে রইলি যে? আমাদের কথা মোটেই শুনছিস না তুই।
শুনছি তো।
একটা খুব ছোট ছেলে পিয়ার্সনের লালচে চুলের গোছা ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলছিল। তীক্ষ্ণ গলায় সে চেঁচিয়ে উঠল, হুই দ্যাখ সায়েব, সদ্দারেরা জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। হুই দ্যাখ, হুই–যাবি?
নিচের উপত্যকার দিকে তাকাল পিয়ার্সন।
উপত্যকাটা টিলায় টিলায় দোল খেয়ে বহুদূরে চলে গিয়েছে। সেখানে নিবিড় বন। অজস্র বুনো গাছ এবং লতার বাঁধনে অরণ্য জটিল হয়ে রয়েছে। বনটাকে একটা বাঁকা খারে বর্শার মতো ঘিরে রেখেছে দোইয়াঙ নদী। অনেক উঁচু থেকে নদীর পারের লাংফু গ্রামের মানুষগুলোকে খুব ছোট ছোট দেখাচ্ছে। তাদের থাবায় বর্শার ফলায় ফলায় আর তীরের মাথায় মাথায় সাঙসু ঋতুর রোদ ঝলকে যাচ্ছে।
সকলের সামনে রয়েছে গ্রামের সর্দার। তার মুঠোয় একটা বিরাট বল্লম।
জিজ্ঞাসু চোখে ছোট ছোট ছেলেগুলোর দিকে তাকাল পিয়ার্সন। বলল, তোদের গ্রামের লোকেরা জঙ্গলে শিকার করতে যাচ্ছে নাকি রে?
না না–ছেলেগুলো একসঙ্গে হল্লা শুরু করল।
তবে কী করতে যাচ্ছে? জুমের আবাদের জন্যে জঙ্গল পোড়াতে?
না রে পাগলা সায়েব, তা-ও নয়। চিনাসঙবাকে খুঁড়তে যাচ্ছে ওরা। সদ্দার চিনাসঙবার মুণ্ডু এনে মোরাঙে ঝোলাবে। ওর রক্ত দিয়ে মোরাঙ চিত্তির করবে। ছোট ছোট ছেলেগুলোর গলা থেকে উল্লসিত শোরগোল আকাশের দিকে উঠে গেল।
শুনতে শুনতে খাড়া মেরুদাঁড়াটার মধ্য দিয়ে যেন হিম নামতে শুরু করল পিয়ার্সনের; রক্তের কণাগুলোর মধ্য দিয়ে এক ঝলক বিদ্যুৎ বয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় পিয়ার্সন বলল, চিনাসঙবা কে রে?
