আশ্চর্য হাসি পিয়ার্সনের। এ-হাসির ঝাঁপটায় মনের সব কপাট জানালা খুলে যায়। আর সেগুলোর মধ্য দিয়ে একটা সুন্দর প্রাণের শেষ পর্যন্ত দেখা যায়।
স্টুয়ার্ট নিরত্তর। পাহাড়ী টিলায় চুপচাপ নিস্পন্দ পড়ে রয়েছে। রুক্ষ পাথরের ঘা লেগে হাত পাকপাল ছড়েছে, চামড় ছিঁড়েছে। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে।
পিয়ার্সন বলল, কি স্টুয়ার্ট, একেবারে ঘাপটি মেরে পড়ে রইলে যে! দৌড়তে ইচ্ছে হয়েছে, তা আমাকে বললেই পারতে। তোমার জন্যে এই নাগা পাহাড়ে নতুন করে আবার অলিম্পিকস্ বসাতাম। হোহোহোর–
আবারও সেই অবাধ, চারপাশ-মাতিয়ে-দেওয়া হাসি হেসে উঠল পিয়ার্সন, হোয়াট আ ওয়াণ্ডার! স্টুয়ার্ট দৌড়চ্ছে পিয়ার্সনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে–
ও-পক্ষ নির্বিকার। স্টুয়ার্টের জবাব নেই।
আচমকা হাসি থামিয়ে দিল পিয়ার্সন। মুখেচোখে ভয়ানক কাঠিন্য দেখা দিয়েছে এবার। চোখের দৃষ্টি প্রখর হয়ে উঠেছে। শিরা-স্নায়ু-ইন্দ্রিয়গুলো ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে গিয়েছে। এ এক অন্য পিয়ার্সন। হাসি-কৌতুক-পরিহাসে এই মানুষটা যে সবসময় সরস এবং সতেজ, এখন দেখলে একেবারেই বোঝা যায় না।
ঢোলা আলখাল্লাটা গুটিয়ে হাঁটু মুড়ে স্টুয়ার্টের পাশে বসে পড়ল পিয়ার্সন। তারপর তার পাঁজর বরাবর আঙুল দিয়ে খোঁচা লাগিয়ে দিল। দাঁত দাঁতে চেপে বলল, ঘাপটি মেরে রয়েছে। একটা ডেভিলস সন। আর একটা জুডাস। ওঠ–
আঙুলের খোঁচা খেয়ে কোঁৎ করে উঠেছিল স্টুয়ার্ট । এবার ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। কপাল থেকে খানিকটা তাজা গাঢ় রক্ত ফাটা ফাটা ঠোঁটের ওপর এসে পড়েছিল। জিভ বার করে ফোঁটাগুলি চাটতে লাগল স্টুয়ার্ট। ভুরু দুটোও কেটেকুটে রক্তাক্ত। তামাটে গাল থেকে এক খাবলা মাংস উঠে গিয়েছে। এখন অত্যন্ত অসহায় দেখাচ্ছে তাকে। নিতান্তই নিরুপায়।
পিয়ার্সন চিৎকার করে উঠল, স্পাই। তুই একটা স্পাই। মোস্ট হেঁটেড বিস্ট–আমাকে ফলো করে করে আসছিলি?
ইয়াস ফাদার। হাউ হাউ করে ডুকরে উঠল স্টুয়ার্ট। পিয়ার্সনের হাঁটু দুটো আঁকড়ে ধরে বলল, হু-হু– ফাদার, আমি স্পাই। কী করব? হুই বড় ফাদার যে তোর পিছু পিছু যেতে বলে। আমি কিছু জানি না। আমার কোনো দোষ নেই। তুই রোজ পাহাড়ী বস্তিগুলোতে যাস। এই লাংফু, লাঞ্চ, ফচিয়াগা–সব বস্তিতেই তোর পিছু নিই।
স্নায়ুশিরাগুলো এতক্ষণ টান টান হয়ে ছিল। পিয়ার্সনের মনে হল, এবার সেগুলো একসঙ্গে কটাৎ করে ছিঁড়ে যাবে। ভীষণ গলায় সে বলল, তারপর রোজ ম্যাকেঞ্জির কাছে গিয়ে বলিস, বস্তিতে ঘুরে ঘুরে আমি কী করি, কী বলি–তাই না?
হু-হু–প্রবলভাবে মাথা নাড়তে লাগল স্টুয়ার্ট, আমার কোনো দোষ নেই ফাদার, সব হুই বড় ফাদারের কাজ। পারডন মি।
এই তিন বছরে স্টুয়ার্টের বুনো পাহাড়ী জিভের নিচে কয়েকটা ইংরেজি শব্দ এবং বিচিত্র উচ্চারণের মহিমা গুঁজে দিয়েছে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। ইংরেজি এবং নাগাদু’টি ভাষার অদ্ভুত বিস্ময়কর মিলন ঘটেছে স্টুয়ার্টের মুখে।
ভয়ে, আতঙ্কে এবং আশঙ্কায় স্টুয়ার্ট কাঁপতে শুরু করেছে। ফিসফিস গলায় সে বলল, পারডন মি ফাদার। আমাকে যেতে দে, আমার কোনো দোষ নেই।
কোনো দিকে বিন্দুমাত্র হৃক্ষেপ নেই পিয়ার্সনের। সে ভাবতে লাগল। সাঙসু ঋতুর এই পাহাড়ী পৃথিবী থেকে তার মন এক অপরূপ জগতের দিকে উধাও হয়ে গেল। শ্ৰদ্ধার ক্ষমায় প্রেমে সে জগৎ সুন্দর, শোভন এবং শুচিময়। পৃথিবী-ঘেরা সব অন্ধকার এবং কালিমা, সব অন্যায় এবং অবিচার একটি মধুর ক্ষমায় আর প্রেমে স্তব্ধ করে এগিয়ে চলেছেন এক জ্যোতির্ময় পুরুষ। মানবপুত্র। সেই অমৃত পুরুষের নির্দেশ কি সফল হল নাগা পাহাড়ের এই স্টুয়ার্টের মধ্যে? ক্রিশ্চানিটির মহিমা কি চরিতার্থ হল?
একটু আগে পিয়ার্সনের মনে হয়েছিল, এই পাহাড়ের টিলায় টিলায়, ঝোপে জঙ্গলে,লতায় পাতায়, এই সমাহিত বনভূমিতে পরম পিতার নীরব অস্তিত্ব রয়েছে। সে কি একটা বিভ্রান্তি? সে কি মিশনারির আশ্চর্য পরিতৃপ্ত এবং প্রশান্ত মনের বিলাস? আচমকা নিজের মনেই একটা ধমক খেল পিয়ার্সন। না না, এ কথা চিন্তা করাও মিশনারির পক্ষে অপরাধ। এ এক ঘৃণিত পাপাঁচরণ। এই পৃথিবী, তার চারপাশে যে সীমাহীন, অন্তহীন সৌরলোক রয়েছে, তার সর্বত্র, সমস্ত প্রাণে, জীবলোকে, সৃষ্টি এবং বিনাশে, বস্তুতে, আকারে নিরাকারে, জাগতিক অস্তিত্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে পরম পিতার কল্যাণস্পর্শ রয়েছে, মঙ্গলদৃষ্টি রয়েছে। ভাবতে ভাবতে সমস্তু মন ভরে গেল পিয়ার্সনের।
নিরবধি কালের এই পৃথিবী রয়েছে। আছে মানবপুত্রের প্রেম। আছে শয়তানের কুৎসিত কারসাজি। প্যারাডাইসের স্বপ্ন। আছে ইনফার্নোর অন্ধকার। সব কিছুর ওপর এই বিক্ষুব্ধ, অশান্ত পৃথিবীর উর্ধ্বে লাইট-হাউসের মতো রয়েছে বেথেলহেমের উজ্জ্বল তারাটি। সমস্ত দুর্যোগের মধ্যে সেই অনির্বাণ দিশারি পৃথিবীকে পথ দেখাচ্ছে। রিপু, লালসা এবং আসক্তির ডাঙস খেয়ে খেয়ে যে পৃথিবী অস্থির, বিভ্রান্ত এবং ক্রমাগত তাড়িত হয়ে চলেছে, যীশু তাকে শান্ত, নিরুত্তেজ এবং স্নিগ্ধ করে চলেছেন।
আজ প্রথম এই ধরনের অদ্ভুত এক ভাবনায় মগ্ন হয়ে গিয়েছিল পিয়ার্সন। ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। আচমকা তার দৃষ্টি পড়ল সামনের দিকে। তাজ্জবের ব্যাপার। তার ভাবনার সুযোগ নিয়ে কখন যেন টিলার ওপর থেকে স্টুয়ার্ট পালিয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র কয়েক ফোঁটা রক্ত পাথুরে মাটিতে জমাট বেঁধে রয়েছে।
