উপত্যকার ওপর দিয়ে আচ্ছন্নের মতো চলতে চলতে একবার থমকে দাঁড়াল পিয়ার্সন। নির্জন উতরাই। এতক্ষণ খেয়াল হয়নি, আচমকা মনে হল, সরীসৃপের মতো সরসর শব্দ করে কী একটা তার পিছু পিছু আসছে। স্বাভাবিক নিয়মেই যীশু-মেরির ভজন থামিয়ে সাঁ করে ঘুরে দাঁড়াল পিয়ার্সন। আর ঘুরেই চোখে পড়ল, মোটা একটা খাসেম গাছের আড়ালে নিজের বেটপ শরীরটাকে লুকোবার চেষ্টা করছে স্টুয়ার্ট।
তির্যক দৃষ্টিতে তাকাল পিয়ার্সন, কী ব্যাপার স্টুয়ার্ট, লুকোচ্ছ কেন?
মুখের ওপর একটা অসহায় ভঙ্গি ফুটিয়ে তাকিয়ে রইল স্টুয়ার্ট। রক্তমাংসের শরীরটাকে বায়বীয় করে বাতাসে মিলিয়ে দেওয়া যায় কিনা, হয়তো সেই কথাই ভাবছিল সে। ভাবতে ভাবতে ঘেমে উঠছিল।
মাথার চুল নিরপেক্ষভাবে ছাঁটা। গায়ের রং তামাটে। বেয়াড়া রকমের বেঁটে শরীরটার ওপর বিরাট এক মাথা। ঢলঢলে সরেপ্লিসটা পায়ের পাতা ছাপিয়ে আধ হাত খানেক পাথুরে মাটিতে লুটোচ্ছে। ঘোট ঘোট, কুতকুতে দুটো পিঙ্গল চোখ। সে চোখ সবসময় কুঁচকেই থাকে। এই হল স্টুয়ার্ট।
স্টুয়ার্ট লোকটার অতীত ইতিহাস জানে পিয়ার্সন। বছর তিনেক আগেও লোকটার নাম ছিল ইয়ুথু জেমি। বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির ভাষায় এই হিলি হিদেনদেরই রক্তবীজের বংশধর। কিন্তু ম্যাকেঞ্জিই তাকে তিন বছরের প্রাণান্ত সাধনায় স্টুয়ার্ট নামের মহিমা দিয়েছে, সাদা সারপ্লিসের গৌরব দিয়েছে।
ইয়ুথু জেমি থেকে স্টুয়ার্ট। অদ্ভুত এক জন্মান্তর। এ তিনটে বছরে ধবধবে সারপ্লিস, জপমালা আর ঘন ঘন ক্রস আঁকার মধ্যে এক জ্যোতির্ময় পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছে স্টুয়ার্ট। এক-একসময় নিজের সারপ্লিস-পরা দেহটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে যেশাসের বড় অন্তরঙ্গ মনে হয় স্টুয়ার্টের।
এতক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে স্টুয়ার্টকে দেখছিল পিয়ার্সন। তার দু’টি চোখের নীল মণি নীল তীর হয়ে স্টুয়ার্টের হাড়-মাংস, শিরা-স্নায়ু, মেদ-মজ্জা কুঁড়ে কুঁড়ে দিচ্ছিল। বেথেলহেমের সেই উজ্জ্বল তারাটির কাছাকাছি পৌঁছুতে আর কতটা দেরি স্টুয়ার্টের? বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির কাছে তার কতটা পাঠ বাকি?
আচমকা, একান্তই আচমকা, পিয়ার্সনের মনে একটা কুটিল সন্দেহের ছায়া পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে জ দুটো বেঁকে গেল, চোখদুটো আরো তীক্ষ্ণ হল।
মোটা খাসেম গাছটার আড়ালে দেহটাকে সঙ্কুচিত করে রাখতে হিমসিম খাচ্ছিল স্টুয়ার্ট। ভয়ে আর আশঙ্কায় কপাল, বুক এবং বাহুসন্ধি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক্রস আঁকতে শুরু করল। পিয়ার্সনের চোখের আগুনে সে যেন ঝলসে যাচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছে, সমস্ত শরীর একটু একটু করে কুঁকড়ে যাচ্ছে তার।
চড়া গলায় পিয়ার্সন ডাকল, স্টুয়ার্ট–
ইয়াস ফাদার–খাসেম গাছের ওপাশ থেকে ভীরু, মিনমিনে গলায় সাড়া দিল স্টুয়ার্ট।
গাছের আড়ালে লুকোচ্ছ কেন?
নো, ইয়াস–ছোট ফাদার, আমি—মানে–থতমত খেতে লাগল স্টুয়ার্ট, আমি এদিকে এসেছিলাম। হুই লাংফু বস্তির দিকে–
লাংফু বস্তির দিকে তো আমিও যাচ্ছি। তুমি লুকোচ্ছ কেন?
হুই বড় ফাদার বলে দিয়েছে যে।
মনের ভেতর য়ে সন্দেহটা এতক্ষণ হালকা ছায়ার মতো ছড়িয়ে ছিল, এবার সেটা ঘন হল, কুটিল হল। –দুটো ভীষণভাবে বেঁকে গেল পিয়ার্সনের। প্রখর গলায় সে বলল, বড় ফাদার, মানে ম্যাকেঞ্জি তোমাকে পাঠিয়েছে?
হু-হু–ছোট ফাদার–বিরাট মাথাটা ঘন ঘন দোলাতে লাগল স্টুয়ার্ট।
ওহ্! এসপিওনেজ! হরিবল! সাঙসু ঋতুর উজ্জ্বল সকালটাকে কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল পিয়ার্সন।
এতক্ষণ পিয়ার্সনের জ্বলন্ত চোখদুটোর দিকে তাকাতে পারছিল না স্টুয়ার্ট। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। একবার ভয়ে ভয়ে তাকাল। তারপরেই খাসেম গাছটার আড়াল থেকে উদ্ধশ্বাসে সামনের টিলার দিকে দৌড় লাগাল।
ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিল পিয়ার্সন। বিস্ময়ের ঘোর কাটলে রক্তে রক্তে যেন সাইক্লোন বেজে উঠল তার। চক্ষের পলকে সাদা সারপ্লিসটা খুলে পাথুরে মাটিতে ছুঁড়ে দিল। তারপর একটা টগবগে ঘোড়ার মতো বড় বড় পা ফেলে স্টুয়ার্টের দিকে ছুটল।
যীশু, মাদার মেরি, ও টেটসে আনিজা, বাঁচা বাঁচা–চড়াই বেয়ে ওপর দিকে উঠতে উঠতে তারস্বরে চেঁচাতে শুরু করল স্টুয়ার্ট। দম ফুরিয়ে এসেছিল। নিশ্বাস নেবার জন্য একবার থমকে দাঁড়াল স্টুয়ার্ট, পেছন ফিরে দেখল একটা সাদা উল্কা দূরন্ত গতিতে ছুটে আসছে। আবার আকাশ ফাটিয়ে আর্তনাদ করে উঠল স্টুয়ার্ট, ও যীশু, ও মেরি, ও বড় ফাদার, ও আনিজা–বাঁচা বাঁচা–উঁচু চড়াইর দিকে আবার ছুটল স্টুয়ার্ট। মহাপ্রাণীটার জন্য বড় মায়া তার। সাঙসু ঋতুর ঝকমকে সকালটা তার জন্য এমন একটা দুর্বিপাক ঘনিয়ে রেখেছিল, তা কি জানত সে!
মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। তারপরেই স্টুয়ার্টের মাথায় বাজ পড়ল। বাজ নয়, পিয়ার্সনের বিরাট একটা থাবা।
ও যীশু–কাতর শব্দ করে লুটিয়ে পড়ল স্টুয়ার্ট।
কপালে একে আস্তর পাহাড়ী ধুলো জমেছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে বেরিয়েছে। ঝকঝকে দু’পাটি দাঁত মেলে হেসে ফেলল পিয়ার্সন। চোখের নীলাভ মণি দুটো কৌতুকে ঝিকমিক করছে। পিয়ার্সন বলল, স্টুয়ার্ট, শুধু শুধু দৌড়লে। জানো তো, মিশনারি হবার আগে আমি স্পোর্টসম্যান ছিলাম। হোমে থাকতে আমি কত ট্রফি জিতেছি! আর তুমি একটা ন্যাম্বিপ্যাম্বি পাহাড়ী চ্যাপ, আমার সঙ্গে ছুটে পারবে! হোঃ-হোঃ-হোঃ, হোয়াট আ ফান! তুমি আর আমি দৌড়চ্ছি, একবার ভাব তো দৃশ্যটা। ইজ ইট নট কমিক! হোঃ-হোঃ-হোঙ!
