আর্চারি! হ্যাঁ, এককালে আর্চারি শিখেছিল পিয়ার্সন। সেদিনের স্পোর্টসম্যান পিয়ার্সনের দৃষ্টিতে জীবনের সংজ্ঞা একেবারেই স্বতন্ত্র ছিল। সেদিন তার রাইফেলের নিশানা ছিল কী অব্যর্থ! কী নির্ভুল ছিল স্পিয়ারের লক্ষ্য! স্পোর্টস, গেম, শিকার, রোমান্স, অ্যাডভেঞ্চার। ভাবাবেগের সকল নেশাতেই মন ভরপুর ছিল। তাই সুন্দর একটা খেয়ালের খেলার মতো এই সহজ স্নিগ্ধ মিশনারি জীবনের ভূমিকা গ্রহণ করতে অসুবিধা হয়নি। এতটুকু দ্বিধা হয়নি স্পোর্টসম্যান পিয়ার্সনের। প্রিচিঙকে কৌতুককর এক ধরনের গেমের মতো মনে হয়েছে। বেঁড়ে টাটুর পিঠে চড়ে পাহাড়ীদের গ্রামে ঘুরে ঘুরে গলা ফাটিয়ে খ্রিস্টমাহাত্ম্য শোনাতে হয়। সাপ-পাথর নুড়ি পুজোর বিপক্ষে, মোষ কি মুরগি বলির বিপক্ষে, বুনো নাগাদের বিবেককে রীতিমতো তাতিয়ে তুলতে হয়। শয়তান এবং অন্ধকারের এই অসহায় শিকারগুলোকে খ্রিস্টধর্মরূপ আলোর সড়কে নিয়ে আসার জন্য আপ্রাণ কসরত করতে হয়। ভাবতেই আমোদ পায় পিয়ার্সন, মজা লাগে। সারা দিন ঘুরে ঘুরে কপালে, চোখে, লালচে চুলে এবং ভুরুতে পাথুরে পথের ধুলো মেখে, সর্বাঙ্গ পাহাড়ী বাতাসে জুড়িয়ে, টক টক ঝাঁঝাল রিলক ফল চিবুতে চিবুতে এবং চার্চে ফিরতে ফিরতে অদ্ভুত নেশায় মনটা কুঁদ হয়ে থাকে। বেশ লাগে পিয়ার্সনের। অতীত জীবনের চেয়েও এই মিশনারি জীবনে যেন অনেক বেশি মাদকতা, অনেক বেশি মোহ রয়েছে।
চলতে চলতে পিয়ার্সন ভাবে, দেশে থাকতে তার ধারণা ছিল, মিশনারি জীবন বড়ই স্নিগ্ধ, সরল এবং পবিত্র। কিন্তু কোহিমা পাহাড়ে এসে স্নিগ্ধতা, সরলতা এবং পবিত্রতার লেশমাত্র খুঁজে পায়নি পিয়ার্সন।
মিশনারি জীবন তার সারা গায়ে সারপ্লিস এবং হাতে জপমালা দিয়েছে। পিয়ার্সন শিক্ষা পেয়েছে, অকারণে-অকারণে কেন, কোনোক্রমেই দেহমনকে উত্তেজিত করে তোলা ধর্মপ্রচারকের পক্ষে অপরাধের কাজ। নিজের ইন্দ্রিয় যে সংযত করে রাখতে পারে না, প্রশান্তি উদারতা যার মধ্যে নেই, সে কেমন করে অপরকে শীলাচরণ এবং প্রবৃত্তির শাসনের কথা শেখাবে? পিয়ার্সন এসব ভাবে, জানেও। তবু সে উত্তেজিত হয়। চড়াই-উতরাই-মালভূমি উপত্যকায় জড়ানো বিশাল, বিস্তীর্ণ এই নাগা পাহাড়ে মিশনারি জীবনের ভূমিকা সহজ নয়, সুন্দর নয়, পবিত্র নয়। অন্তত বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জিকে দেখে এই ধারণা হয়েছে পিয়ার্সনের। মিশনারি জীবনের গতি এখানে বক্র এবং কুটিল। রোষে রাগে সমগ্র সত্তা আর বুকের মধ্যে অন্তরাত্মা অহরহ যেন চিৎকার করতে থাকে পিয়ার্সনের। সে ভাবে, পাদ্রী ম্যাকেঞ্জির মতো কতকগুলো জীব দিন দিন খ্রিস্টমাহাত্ম্যকে কতখানি খর্ব করে দিচ্ছে! যেশাসের পবিত্র নামে কী পরিমাণ কলঙ্ক মাখাচ্ছে–ভাবে, ভাবতে ভীষণ কষ্ট হয়। যীশু সম্বন্ধে এই একান্ত সরল নাগাদের মধ্যে কী হীন ধারণারই না সৃষ্টি করেছে পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি। অবশ্য এই পাহাড়ী মানুষগুলোর মন এত নিষ্পাপ, এত অপরিণত যে হীন কি মহৎ, কোনো কিছুর তারতম্য বোঝার ক্ষমতা তেমন নেই। তবু পিয়ার্সনের বিশ্বাস, আজ হোক কাল হোক, দশ-বিশ বছর পরেই হোক, এই পাহাড়ীরা শিক্ষাদীক্ষা পাবে। তাদের অজ্ঞতা ঘুচবে, মন পরিণত হবে। সমস্ত কিছু বুদ্ধি দিয়ে, বিচার দিয়ে বিশ্লেষণ করে করে দেখতে শিখবে। সেদিন? ভাবতেও শিউরে ওঠে পিয়ার্সন। সেদিন যীশুর নাম ধুলোয় লুটোবে। ঘৃণিত, অপমানিত ক্রাইস্টের কথা কল্পনা করতেও ভীষণভাবে চমকে ওঠে পিয়ার্সন। সে ভাবে, দাঁতে দাঁতে কড়মড় শব্দ হয়। বিড়বিড় করে বলে, আর একটা জুডাস, ম্যাকেঞ্জিটা আর একটা জুডাস।
কোহিমা থেকে আঁকবাঁকা পথ ধরে দক্ষিণ-পুব দিকে অনেকখানি এসে পড়েছে পিয়ার্সন। সাদা কপালের ওপর এক আক্তর ধুলো জমেছে। সারপ্লিসটাকে হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে মাও-গামী সড়ক থেকে নিচের উপত্যকায় নেমে গেল সে। গোটা দুই ছোট টিলা, একটা আতামারি জঙ্গল এবং নিটে ঝরনা পেরিয়ে গেলেই লাংফু গ্রামের সীমানা শুরু। লাংফু, তারপর ইয়াগুচি, লাঞ্চ, ফচিয়াগা। এমনি অনেক, অসংখ্য গ্রাম। আজ কয়েকদিন ধরে এই সব গ্রামে নিয়মিত আসছে পিয়ার্সন। সাঙসু ঋতুর সমস্ত দিনটা গ্রামে গ্রামে কাটিয়ে সন্ধ্যার একটু আগে সে কোহিমার চার্চে ফেরে।
চারিদিকে একবার তাকাল পিয়ার্সন। ডান পাশে একটা পাথর-ঢাকা আধো-গোপন ঝরনা। ঝোপে ঝোপে উঁচু উঁচু টিলার মাথায় যে-সব বন রয়েছে সেখানে রঙবেরঙের অজস্র ফুল ফুটেছে। নীলচে রঙের সোনু ফুল, হলদে রিলক ফুল, থোকা থোকা সবুজ রঙের আরেলা ফুল। যতদূর চোখ যায়, ফুল আর পাতা, পাতা আর ফল। রঙে রঙে পাহাড় এবং বন স্বপ্নের মতো মনে হয়। আশ্চর্য নীল আকাশে ভেঁড়া ঘেঁড়া পাপড়ির মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গুটসুঙ পাখির ঝাক। আতামারি বনের ওপাশে প্রপাতের গমগম শব্দ শোনা যাচ্ছে।
এতক্ষণ ম্যাকেঞ্জির কথা ভেবে সমস্ত মনটা উত্তেজিত হয়ে ছিল। এখন সেটা শান্ত, প্রসন্ন হয়ে গেল। সাঙসু ঋতুর এই উজ্জ্বল সকালে নাগা পাহাড়ের উপত্যকাটিকে বড় ভালো লাগছে। এই বনে, আকাশে, সাঙসু ঋতুর পরিপূর্ণতার মধ্যে যেন পরম পিতার নীরব অস্তিত্ব রয়েছে। নিজের অজান্তে সমগ্র সত্তার মধ্যে গুনগুন শব্দে যীশু-মেরির ভজনার সুর বাজতে লাগল যেন। খানিকটা উঁচু গলায় গাইতে শুরু করল পিয়ার্সন। প্রশান্তিতে সমস্ত সত্তা ভরে গিয়েছে তার।
