ইজা হুবতা! পাটাতনের তলায় চাপা গলায় হুমকে উঠল সেঙাই, নিজের বউর সঙ্গে কথা বলব, তা-ও শয়তানের বাচ্চারা বাগড়া দেবে! আমি যাব না এখান থেকে।
ওরে ধাড়ি টেফঙ, যা বলছি। কাল আবার আসবি। মেহেলী অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠল।
কাল আমার সঙ্গে পশ্চিমের চড়াইতে বেড়াতে যাবি তো?
তুই যখন বলছিস, নির্ঘাত যাব। এখন পালা, সদ্দার তোকে দেখলে সাবাড় করে ফেলবে। পালা, পালা–করুণ গলায় মিনতি করতে লাগল মেহেলী।
যাচ্ছি। কাল কিন্তু আমার সঙ্গে পশ্চিমের পাহাড়ে বেড়াতে যেতে হবে।
কাল ক্ষয়িত চাঁদের আলোয় উপত্যকা-মালভূমি-উতরাই পেরিয়ে মেহেলীকে নিয়ে সেঙাই যাবে পশ্চিমের চড়াইতে। বুনো ঝরনার পাশে ঘুরতে ঘুরতে বিয়ের কথা, ভবিষ্যৎ জীবনের কথা, ঘরসংসার, বিয়ের সময়কার উৎসব এবং ভোজের কথা বলবে। অস্ফুট পাহাড়ী মন রতিকলায় এবং উদরপূর্তিতে চরম আনন্দ পায়, পরিতৃপ্ত হয়। দৈহিক এবং মানসিক স্থূল ভোগের জন্য মদ-মাংস-খাদ্য, যে যে উপকরণ দরকার, সেগুলোর কথা বলবে সেঙাই। ভাবতে ভাবতে একান্ত অনিচ্ছুক পায়ে সামনের চড়াইটার দিকে উঠে গেল সে।
পাশের ঘরে একটা পেন্য কাঠের মশাল দপ করে জ্বলে উঠল।বুড়ো খাপেগা হুঙ্কার ছাড়ল, কি রে মেহেলী, এখনও কথা বলছিস না যে? কে এসেছে তোর ঘরে?
নির্জীব গলায় মেহেলী বলল, কই, কেউ আসেনি তো। তুই দেখে যা না ধরমবাপ।
তবে মানুষের গলা শুনলাম যে! বিড়বিড় করে বকতে শুরু করল বুড়ো খাপেগা, ভুল শুনলাম না কি? নাঃ, এমন মৌজের ঘুমটা ভেঙে গেল। গজর গজর করতে করতে বিরক্ত গলায় ধমকে উঠল, নে, এবার ঘুমো মেহেলী। শয়তানের বাচ্চারা যদি জ্বালায়, আমাকে ডাকিস।
আচ্ছা।
পেন্যু কাঠের মশালটা নিভে গেল। বাঁশের মাচান মচমচ শব্দ করে উঠল। মেহেলী বুঝল, বুড়ো খাপেগা ফিরে গিয়ে আবার শুয়ে পড়েছে।
আর উঁচু চড়াইয়ের মাথায় পৌঁছে চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল সেঙাই-এর। একটু আগে সালুয়ালা গ্রামের যে জোয়ানটাকে সে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে গিয়েছিল, এই ক্ষয়িত চাঁদের আলোতে তার চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। শুধু খানিকটা তাজা রক্ত পাথুরে মাটির ওপর সেঙাই এর আদিম হিংস্রতার সাক্ষী হয়ে জমাট বেঁধে রয়েছে।
৪০. কেম্ব্রিজ য়ুনিভার্সিটির কলোনেড
৪০.
কেম্ব্রিজ য়ুনিভার্সিটির কলোনেড কাঁপিয়ে পুরো সাড়ে ছ ফিট দীর্ঘ একটা দেহ একদিন হাঁটত। শিরদাঁড়াটা ঋজু হয়ে মাথার দিকে উঠে গিয়েছে। চওড়া, কঠিন একখানা ঘাড়। কাঁধ বুক-পিঠ এবং উরুতে রাশি রাশি পেশী, থরে থরে সাজান। গ্রেট ব্রিটেনের কোনো এক ডিউক পরিবারের ছেলে। সেদিনের সেই সাড়ে ছ ফিট ঋজু মানুষটা আকাশ ফাটিয়ে হো হো করে অট্টহাসি হেসে উঠতে পারত। সে-মানুষটা শখ করলে কাঁধের ওপর ধনুক আর তৃণীর নিয়ে, বুকের সামনে গণ্ডারের চামড়ার বর্ম বুলিয়ে, মধ্যযুগের কোনো লিজেণ্ডের নায়ক হতে পারত। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় সে পারত তুষারমেরুর দেশে পাড়ি জমাতে। ফলেন এঞ্জেলের মতো আলপসের চূড়া থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারত কোনো গভীর পাতালে। সে পারত উন্মাদ সমুদ্রে জীবনতরী ভাসিয়ে দিতে।
কী সে চেয়েছিল? রোমান্স না অ্যাডভেঞ্চার? কী সে হতে পারত? রবিন হুড না অডিসিয়স? লিজেণ্ড না এপিকের নায়ক?
কিছুই হল না, কিছুই হওয়া গেল না। বলা যায়, কিছুই হতে পারল না সে। শুধু বিপুল এক কৌতুকে সাড়ে ছ ফিট মানুষটা কেম্ব্রিজ য়ুনিভার্সিটির কলোনেড ডিঙিয়ে একদিন সরাসরি চার্চের পবিত্র চত্বরে চলে গেল। সেখানে সুনীতি এবং সংযমের পাঠ নিয়ে, শুদ্ধ জীবনের দীক্ষাকাল কাটিয়ে, কোহিমার পাহাড়ে এসে পড়ল।
রবিন হুড নয়, অডিসিয়সও নয়, লিজেণ্ড কি এপিকের নায়কও নয়। সে পরম আগ্রহে তুলে নিল নিরুত্তেজ শান্ত স্নিগ্ধ মিশনারির জীবন।
আশ্চর্য! কোহিমা শহর থেকে মাও-গামী পথের দিকে যেতে যেতে অতীত জীবনটাকে এখন একটা অলীক স্বপ্নের মতো মনে হয়। কী সে হতে চেয়েছিল, আর কী সে হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে পিয়ার্সনের মনে অতীত এবং বর্তমান জীবনের একটা তুলনামূলক বিচার চলছিল। বলা যায়, চাওয়া এবং পাওয়া, খেয়াল মর্জি স্বপ্ন এবং বাস্তবের মধ্যে তুমুল ধুন্ধুমার চলছিল। পিয়ার্সনের মনে যে পরিমাণে ভাবাবেগ রয়েছে সেই পরিমাণে বিশ্লেষণ করার প্রবণতা নেই। ভাবাবেগই তার চরিত্রের মূল লক্ষণ। কিন্তু আজকাল সে ভাবে, মোটামুটি বিশ্লেষণ করে, বিচার করে। একটু নিরালায় এলে কিংবা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লে আপনা থেকেই কতকগুলি সূক্ষ্ম এবং তীক্ষ্ণ চিন্তা মনের মধ্যে ভিড় জমায়। কোহিমা পাহাড়ে এই মিশনারি জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে এক-একসময় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।
নাগা পাহাড়ে আসার আগে কী ধারণা ছিল মিশনারিদের সম্বন্ধে? প্রেমে ক্ষমায় শুদ্ধাচারে পবিত্র এক জীবন। অন্তত সেই শিক্ষাদীক্ষাই সে দেশের চার্চে পেয়ে এসেছে। কিন্তু এখানে এসে বড় পাদ্রী ম্যাকেঞ্জিকে দেখতে দেখতে তার সেই সুন্দর ধারণাটাই ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গিয়েছে। সব মোহ, সব কল্পনা রঙিন বুদ্বুদের মতো ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
সাড়ে ছ’ ফিট দীর্ঘ দেহটার মধ্যে একটা জ্বালা, একটা আক্ষেপ অবিরাম ছুটে বেড়ায়। শিরায়-স্নায়ুতে, মেদে-মজ্জায়, ভাবনায়-চিন্তায় একটা অসহ্য বিক্ষোভ টগবগ করে ফোটে। পিয়ার্সন ভাবে, এই নাগা পাহাড়ে আসার আগে পাদ্রি ম্যাকেঞ্জিকে দেখার কথা সে কি কস্মিনকালেও ভাবতে পেরেছিল?
