না না। তোর আর আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তোর সঙ্গে এখন আমার দেখা হওয়া ঠিক না। টেটসে আনিজা খেপে যাবে। মাঝখানে তো মাত্র দুটো মাস। এই কটা দিন শিকার করে, ন পুড়িয়ে আর ঘুমিয়ে কাটা। তেলেঙ্গা সু মাসে বিয়ে তো হবেই। এখন যা। খাপেগা সদ্দার পাশের ঘরে শুয়ে আছে। তার ঘুম ভারি ঠুনকো।
টেমে নটুঙ। বেরিয়ে আয় মাগী। এত রাত্তিরে আরামের ঘুম ছেড়ে ইয়াখোনা (ধর্মকথা) শুনতে এলাম বুঝি! সেঙাই হুমকে উঠল। বলল, কদ্দিন তোকে দেখি না। বলছি, মেজাজটা বেয়াড়া হয়ে রয়েছে। চেহারাখানা ঠিক রেখেছিস তো? মনটা আবার খিঁচড়ে যাবে না তো
তোর দিকে তাকালে?
ইজা হুতা। মেহেলীর ক্ষীণ গলাটা এবার গর্জে উঠল, খুব যে চিল্লাচ্ছিস, আমার কি তোকে দেখতে ইচ্ছা করে না? খুব করে। আবার ভাবি, টেটসে আনিজা যদি আমাদের ওপর খারাপ নজর দেয়?
আহে ভু টেলো! আমি হুই টেটসে আনিজাকে মানি না। নিজের বউর সঙ্গে গল্প করব, হুই টেটসে আনিজা বাগড়া দেবে কেন? কথাগুলোর মধ্যে সেঙাইর মনের তীব্র অসন্তোষ ফুটে বেরুল।
কোহিমা থেকে ফিরে তোর কী হল–আনিজাকে মানছিস না! এমন কথা বলতে নেই রে সেঙাই। দুমাস পরে আমাদের বিয়ে হবে, ঘর বাঁধব, ছেলে হবে। টেটসে আনিজা আমাদের ওপর খেপে গেলে সব লোপাট হয়ে যাবে। দুটো মাস সবুর কর। ক্ষীণ অথচ মধুর গলায় আগামী দিনের একটি পরম সুন্দর স্বপ্নের কথা বলে যেতে লাগল মেহেলী, তখন আমাকে। তুই কত দেখবি, কত আদর করবি। আমি তোকে কত আদর করব। যা এবার, যা। খাপেগা সদ্দার টের পেলে কিন্তু আস্ত রাখবে না। খুন করে ফেলবে। একটু থেমে আবার বলল মেহেলী, আমার ব্যারাম হয়েছে। তামুন্যু (চিকিৎসক) কিছু খেতে দেয় না। শরীরটা বড় কাহিল লাগছে। একদম জোর পাচ্ছি না।
হু-হু, তোর ব্যারামের কথা ওঙলে বলেছে। এই নে, তোর জন্যে বন থেকে ফল এনেছি। আপেল আর বুনো কলা। খেয়ে গায়ে তাগদ কর।
কই? দে দে–পাটাতনের ফাঁক দিয়ে একটা নরম হাত বেরিয়ে এল। খুশি খুশি, ব্যগ্র গলায় মেহেলী বলল, বড় খিদে পেয়েছে রে সেঙাই, পেটটা জ্বলে যাচ্ছে।
নীলচে রঙের পাহাড়ী আপেল এবং একরাশ বুনো কলা মেহেলীর হাতে দিতে দিতে সেঙাই বলল, তোর ব্যারাম হয়েছে। রানী গাইডিলিওকে এনে একবার যদি তোকে ছুঁইয়ে দিতে পারতাম, সেরে যেত।
রানী গাইডিলিও। সে আবার কে?
হু-হু– জানবি, পরে সব জানবি। আমাদের বস্তিতে সে আসবে বলেছে। সায়েবদের সঙ্গে তার লড়াই বেধেছে। হু-হুরহস্যময় গলায় সেঙাই বলল। একটু পর বলার ভঙ্গিটা সহজ করে ফেলল, যাক সেকথা। আমি রোজ রত্তিরে তোকে খাবার দিয়ে যাব।
খুশি গলায় মেহেলী সায় দিল, দিয়ে যাস।
খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপর সেঙাই বলতে শুরু করল, জানিস মেহেলী, তোদের সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে তোকে চুরি করে নিয়ে যাবার জন্যে দুটো শয়তানের বাচ্চা এসেছিল। এই ঘরটার কাছেই ঘুরঘুর করছিল।
বলিস কী! মেহেলীর গলাটা চমকে উঠল। বেশ বোঝা যায়, ধড়মড় করে পাটাতনের ওপর উঠে বসেছে সে। উত্তেজনায় শঙ্কায় গলার স্বর কাঁপতে লাগল মেহেলীর, তারপর কী হল?
কী আবার হবে, বর্শা দিয়ে একটাকে ফুড়লাম। আর একটা জান নিয়ে জঙ্গলের দিকে পালাল। হু-হু। বলতে বলতে আক্ষেপের সুর ফুটল সেঙাই-এর, বড় আপশোশ হচ্ছে রে মেহেলী, ওটাকেও বর্শা হাড়ড়ে রাখতে পারলাম না।
এবার অনেকটা স্বস্তি পেল মেহেলী। বড় রকমের একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, আপশোশের কী আছে। একটাকে তো যুঁড়তে পেরেছিস। আমারও মনে হচ্ছিল, শয়তানের বাচ্চারা সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে আমার খোঁজে আসবে। অল্পক্ষণের জন্য থামল মেহেলী। তারপর বলতে শুরু করল, মেজাজটা বিগড়ে ছিল রে সেঙাই। আমি হলাম সালুয়ালাঙ বস্তির সেরা মেয়ে, আর তুই হলি কেলুরি বস্তির সেরা ছেলে। তোর আমার বিয়েতে একটু রক্ত ঝরবে না? আমার সোয়ামী দু-একটা শত্তুরকে বর্শা দিয়ে ফুঁড়বে না–এ কেমন কথা! তুই শয়তানদের কুঁড়েছিস। শুনে মেজাজটা খাসা হয়ে গেছে।
হাঃ-হাঃ-হাঃ–ক্ষয়িত চাঁদের রাতটাকে ভয়ঙ্করভাবে চমকে দিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল সেঙাই। বলল, হু-হু–বড় মজার কথা বলেছিস মেহেলী। তুই হলি এই পাহাড়ের সবচেয়ে সেরা মেয়ে। তোর জন্যে একটা নয়, আরো অনেক মানুষের কলিজা খুঁড়তে হবে। বুঝলি মেহেলী–
ওপাশের ঘরে বুড়ো খাপেগা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, কে? কোন রামখোর বাচ্চা এসেছে? আমার ধরম-মেয়ের ইজ্জত নিচ্ছে কে? এই মেহেলী, এই টেফঙের ছা, সুচেন্যু দিয়ে কুপিয়ে একেবারে সাবাড় করব। দাঁড়া, মশালটা ধরিয়ে আমি যাচ্ছি।
পাটাতনের নিচে হাসি থেমে গেল। বুকের মধ্যে নিশ্বাস আটকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সেঙাই। মেহেলীর বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা যেন হঠাৎ জমাট বেঁধে গেল। নিঝুম হয়ে সে-ও পাটাতনের ওপর পড়ে রইল। এই মুহূর্তে একটি পাহাড়ী জোয়ান এবং একটি জোয়ানীর শিরা স্নায়ু-ইন্দ্রিয় অথর্ব হয়ে গিয়েছে। দেহমনে কোনো সাড় নেই যেন।
পাশের ঘরে বুড়ো খাপেগা ভাঙা ফ্যাসফেসে এবং ঘুম-ঘুম গলায় সমানে চেঁচাচ্ছে, এই মেহেলী, কথা বলছিস না যে! কে এসেছে তোর ঘরে? কোন শয়তানের বাচ্চা? বল না মাগী
একেরারে নিথর পড়ে ছিল মেহেলী। মুখখানা পাটাতনের বাঁশে ঠেকিয়ে ফিসফিস করে সে বলল, এই সেঙাই, ভেগে যা। ধরমবাপ তোকে দেখলে খুন করবে। তোর সঙ্গে কথা বলছি দেখলে বিয়ে ভেঙে দেবে। যা এখন, কাল আবার আসিস।
