সেঙাই বলল, ‘বড় খিদে পেয়েছে। ওঙলেদের খবরটা জানিয়ে দিতে হবে।’
কোমরের গোপন গ্রন্থি থেকে বাঁশের চাচারি বার করে সেঙাইর হাতে দিল রেঙকিলান। চাচারিটা দুই ঠোঁটের ওপর আড়াআড়ি রেখে তীক্ষ্ণ শব্দ করে উঠল সেঙাই। একটু পরেই সে শব্দের উত্তর ভেসে এল। ওঙলেরা সাড়া দিয়েছে। উৎকর্ণ হয়ে সেঙাই শব্দটার উৎস লক্ষ করতে লাগল। পাহাড় যেখানে একটা খাড়াই বাঁক নিয়ে উত্তর দিকে নেমে গিয়েছে, ঠিক সেখান থেকেই শব্দটা বাতাসে তরঙ্গিত হতে হতে ভেসে আসছে।
সেঙাই বলল, উত্তরের পাহাড়ে রয়েছে ওঙলেরা। সেখানে চল।
চল। উঠে দাঁড়াল রেঙকিলান।
টিজু নদী পেছনে রেখে ঘন বনের মধ্যে দিয়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলল দুজনে। এক অপরিমেয় খুশিতে মনটা কানায় কানায় ভরে আছে সেঙাই-এর। ওদিকে অস্বাভাবিক আতঙ্কে নির্বাক হয়ে পথ চলছে রেঙকিলান। সামান্য একটু আওয়াজেই চমকে চমকে উঠছে সে। কখন কিভাবে যে আনিজার আবির্ভাব হবে কে বলতে পারে?
চড়াই-এর দিকে উঠতে উঠতে একটা অতিকায় ন্যাড়া পাথরের পাশে এসে থমকে দাঁড়াল সেঙাই। তার পেছনে রেঙকিলান। পাথরের চাইটার ঠিক পাশ দিয়েই একটা শান্ত, শব্দহীন ঝরনা। দু’পাশ থেকে বিশাল বিশাল গাছের নিবিড় ছায়া ঝুঁকে পড়েছে জলধারাটির বুকে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে সোনার তারের মতো দুএকটি রোদের রেখা এসে পড়েছে। যেখানে রোদ পড়েছে, জল সেখানে চিকচিক করছে।
হঠাৎ ঝরনার ঠিক পাশে এক অপরূপ পাহাড়ী যুবতাঁকে দেখল সেঙাই। একটি অপূর্ব নারীতনু। ওপরের দিকটা একেবারে অনাবৃত। সোনালি স্তন। তীক্ষ্ণ বৃন্তটি ঘিরে গাঢ় খয়েরি রঙের বৃত্ত। উজ্জ্বল তামাভ দেহ থেকে আলো ঠিকরে বেরুচ্ছে যেন। খাসেম ফুল আর কড়ির অলঙ্কার দিয়ে কেশসজ্জা করা হয়েছে। নাভিমূলের তলা থেকে জানুর ওপর পর্যন্ত লাল রঙের কুমারী কাপড়। চারিদিকে একবার তাকাল মেয়েটি। তারপর একটানে কাপড় খুলে ফেলল। একেবারে নগ্ন সৌন্দর্য। বন্য পাহাড়ের এক মাদক মাধুর্য। সুডৌল ঊরু, নিটোল নিতম্ব, ছোট ছোট পিঙ্গল চোখ। সোনার বাটির মতো যুগল বুকের মাঝখানে শঙ্খের হার। কিছুক্ষণ নিজের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল মেয়েটি। তারপর ঝরনার পাশে একটা সাদা পাথরের ওপর বসল।
চারপাশে নিবিড় বন। খাড়াই উপত্যকা থেকে বয়ে এসেছে নিঃশব্দ এক ঝরনা। পাহাড়, অরণ্য, নিঝর-এর পটভূমিতে নগ্ন নারীদেহটি বিস্ময়কর মনে হয়। অরণ্যময় এই পাহাড় যেন রমণীয় হয়ে উঠেছে। সেঙাই-এর বন্য মনও আবিষ্ট হয়ে রইল। বনকন্যার এই অনাবৃত দেহ তার মোহিত চেতনা থেকে সমস্ত পৃথিবীকে যেন মুছে নিয়ে গিয়েছে। একটু আগে খোনকেকে বর্শা দিয়ে কুঁড়ে এসেছে সে। হত্যার আদিম উল্লাসে মনটা তার পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সেই উল্লাসের ওপর অনাবরণ পাহাড়ী কুমারীর রূপ মদের নেশার মতো মিশে অপূর্ব মৌতাত ছড়িয়ে দিল দেহমনে।
টানডেনলা পাখির মতো জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে গায়ে দিচ্ছে মেয়েটি। ছপছপ শব্দে গানের ঝঙ্কার শুনতে পাচ্ছে সেঙাই। তার আঠারো বছরের যৌবন। সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন আচ্ছন্ন হয়ে আসতে লাগল সেঙাই-এর। তাদের কেলুরি গ্রামে অজস্র কুমারী মেয়ের নগ্ন শরীর সে দেখেছে। কিন্তু এমন করে তার স্নায়ু কোনোদিনই ব্যগ্র হয়ে ওঠেনি। কোনোদিনই তার কামনা এমন ভয়ঙ্কর হয়নি। এ মেয়েটি তার অজানা। একে সে আগে কখনও দেখেনি। তবু এক বিচিত্র উত্তেজনায় দেহটা ছিটকে যেতে চাইছে মেয়েটির কাছে। শিরায় শিরায় রক্তের মাতামাতি উদ্দাম হয়ে উঠেছে। নাকের মধ্যে নিশ্বাস গরম হয়ে উঠছে। টিজু নদীর মতো বুক তরঙ্গিত হচ্ছে। চোখের পিঙ্গল মণি দুটো অপলক হয়ে রয়েছে মেয়েটির দেহের ওপর।
সেঙাইর পাশ থেকে এবার রেঙকিলানও দেখে ফেলেছে, আরে, এ তো মেহেলী।
দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল সেঙাই। তার গলায় অসহ্য কৌতূহল, মেহেলী? সে কে? আমাদের বস্তির মেয়ে তো নয়।
না। ও সালুয়ালাঙ বস্তিতে থাকে। পোকরি বংশের মেয়ে।
পোকরি বংশের মেয়ে!
হু-হু, যে বংশ তোর ঠাকুরদার মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছিল।
পোকরি বংশ! আচমকা প্রচণ্ড রাগে সমস্ত দেহটা কেঁপে উঠল সেঙাই-এর। ভুলে গেল মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে তার কামনার প্রতিটি অগ্নিকণা দিয়ে মেয়েটির দেহ ঝলসে ঝলসে সে আস্বাদ নিতে চেয়েছিল।
প্রতিশোধ। সেঙাইর চোখ জ্বলে উঠল। কোনো ক্ষমা নেই, কোনোরকম করুণা নেই। এ তার কর্তব্য। পূর্বপুরুষের প্রতি উত্তরপুরুষের দায়িত্ব। শ্বাপদের মতো হাতের থাবা হিংস্র হয়ে উঠল সেঙাই-এর। তারপর পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সে।
এই, কে তুই? কঠিন হল সেঙাইর গলা।
পাহাড়ী ঝরনার পাশে এক রমণীর বিবস্ত্র সৌন্দর্য চমকে উঠল। মাথার অজস্র চুল থেকে কণায় কণায় জল ঝরছে। ছোট ছোট পিঙ্গল চোখে অসহায় দৃষ্টি।
মেয়েটি আশ্চর্য শান্ত গলায় বলল, আমি মেহেলী, পোকরিদের মেয়ে। নদীর ওপারে সালুয়ালাঙ বস্তিতে আমাদের ঘর। আমি রোজ বিকেলে এই ঝরনায় চান করতে আসি। কিন্তু তুই কে?
আমি কে? সেঙাই-এর হাতটা বর্শাসমেত আকাশের দিকে উঠে গেল। আর বর্শার ফলায় নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতিচ্ছায়া পড়ল, বর্শা দিয়ে তার জবাব দেব।
মাথার ওপর উদ্যত বর্শা। পলকে উঠে দাঁড়াল মেয়েটা। তারপর আখুশু ঝোঁপ থেকে একমুঠো পাতা ছিঁড়ে সেঙাই-এর দিকে ডান হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে দোলাল। অবশেষে সাদা পাথরের ওপর সেই পাতাগুলো বিছিয়ে বসে পড়ল।
