ক্ষয়িত চাঁদের রাত আরো নিবিড় হয়েছে। উত্তেজনায় সেঙাইর শিরায় শিরায় ঝা ঝা করে রক্ত ছুটছে। বুকটা তোলপাড় হচ্ছে। বিরাট থাবা দিয়ে বর্শার বাজুটা আরো প্রবলভাবে চেপে ধরেছে সে।
একটু চুপচাপ। জলপ্রপাতের আওয়াজ ছাড়া সমস্ত পাহাড় এবং বনভূমি একেবারেই নিস্তব্ধ।
তারপরই ওপাশ থেকে একটি জোয়ানের গলা ভেসে এল, নে, আর দেরি করিস না। আজ কদিন ধরে মেহেলীর তল্লাশে আসছি কেলুরি বস্তিতে। মাগীটাকে যে নিয়ে যাব, তেমন জুত করে উঠতে পারছি না। আজ যেমন করে পারি, নিয়ে যাবই। আয়, এই বস্তির খাপেগা সদ্দারটা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। খবর পেয়েছি হুই বুড়ো শয়তান সারা রাত ধরে মেহেলী হুঁড়িটাকে পাহারা দেয়। আজ মনে হয়, জেগে থাকতে পারেনি। শুনেছি, ওর বর্শার তাক নাকি মারাত্মক। কাছে ঘেঁষতে ভয় হয়। আয় আয়, আর দেরি করিস না। ভেতরের ঘরেই শুয়ে রয়েছে। মেহেলী–
ঘোঁত ঘোত করে খাপেগা সদ্দারের ভেতরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল জোয়ান দুটো।
রাগ, হিংস্রতা, উত্তেজনা–আদিম মনের সমস্ত বৃত্তিগুলিকে এতক্ষণ অতি কষ্টে লাগাম পরিয়ে রেখেছিল সেঙাই। এবার বাঁশের দেওয়ালের পাশ থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এল সে। তারপরেই তার হাতের মুঠি থেকে বর্শাটা ছুটে গেল নির্ভুল লক্ষ্যে। ফলাটা একটা পাহাড়ী জোয়ানের কোমরে গেঁথে গেল।
সেঙাই-এর চোয়াল কঠিন হল। দাঁতে দাঁত ঘষার শব্দ শোনা গেল। হিংস্র গলায় সে গর্জে উঠল, ইজা হুবতা, মেহেলীকে নিতে এসেছে! একেবারে খতম করে ফেলব।
আ-উ-উ-উ-উ–ক্ষয়িত চাঁদের রাতটাকে ভীষণভাবে চমকে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল সালয়ালাঙের জোয়ানটা। তার পরেই রুক্ষ ধারাল পাথুরে টিলাটার ওপর লুটিয়ে পড়ল। । আর অন্য জোয়ানটা নিজের প্রাণ বাঁচাবার আদিম এবং একমাত্র তাড়নায় সামনের উতরাইটার দিকে ছুটে গেল। সেখান থেকে বিরাট খাসেম কনটার মধ্যে নিমেষে মিলিয়ে গেল। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে টিলাবন চড়াই-উতরাই পার হয়ে যাচ্ছে সে। সালুয়ালা গ্রামের নিরাপদ সীমানায় না পৌঁছুনো পর্যন্ত এ-দৌড় বোধ হয় থামবে না।
আ-উ-উ–এদিকে আহত জোয়ান ছেলেটার চিৎকার থেমে গিয়েছে। এখন গোঙাচ্ছে সে। পী মঙ কাপড়ের ভাজ থেকে বুনো কলা আর নীলচে আপেলগুলো পড়ে গিয়েছিল। পাথুরে মাটির ওপর সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ফলগুলো কুড়িয়ে কোঁচড়ে ভরে জোয়ান ছেলেটার কাছে এসে দাঁড়াল সেঙাই। তাজা রক্তে পাথুরে মাটি লাল হয়ে গিয়েছে।
নিজের কীর্তি দেখে খুশিতে আনন্দে হিংস্রতায় চোখজোড়া জ্বলে উঠতে লাগল সেঙাই এর। একদলা থুতু জোয়ান ছেলেটার গায়ে ছুঁড়ে দিল সে। তারপর নিজের চোখেমুখে ঘৃণার ভঙ্গি ফুটিয়ে ধিক্কার দিয়ে বলল, থু–থু–আহে ভু টেলো! এই মুরাদ নিয়ে আমার বউকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিস? থু থু, চোরের মতো চুরি করে নিতে চাস! লড়াই করে ছিনিয়ে নেবার সাহস নেই?
জোয়ানটার দিকে আরেক দলা থুতু ছিটিয়ে, পায়ের নখ দিয়ে পাঁজরায় খোঁচা মেরে বুড়ো খাপেগার বাড়িটার দিকে চলে গেল সেঙাই।
ভেতরের ঘরটা পাথুরে মাটির চত্বর থেকে অনেক উঁচুতে। নিচে আস্ত বাঁশের পাটাতন। পাটাতনের তলায় এসে দাঁড়াল সেঙাই। বুকের ভেতরটা দুরু দুরু করে উঠল। বুড়ো খাপেগা কি জেগে আছে এখনও? রাত জেগে পাহাড়ী দুনিয়ার লালসা থেকে মেহেলীর কৌমার্যকে পাহারা দিচ্ছে? সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটা ভাবনা মনের মধ্যে ছটফট করতে লাগল। তাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। বিয়ের আগের দিনগুলিতে ভাবী বর বউর মেলামেশা সমাজ এবং ধর্মের চোখে মারাত্মক অপরাধের। এতে টেটসে আনিজার গোসা হয়। আশঙ্কায় শিরায় শিরায় কী একটা যেন ছোটাছুটি করতে লাগল। তারপরেই কর্তব্য ঠিক করে ফেলল সেঙাই। মাথার ওপর বাঁশের পাটান। সেখানে মাচানে শুয়ে রয়েছে মেহেলী। বাতাসে তার নিশ্বাস, তার দেহের গন্ধ মিশে আছে।
কী এক দুর্বোধ্য তাড়নায় দেহমন বিকল হয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে একবার সতর্ক চোখে তাকাল সেঙাই। পাটাতনের নিচে শুয়োরের খোঁয়াড়। শীতের আমেজ-লাগা রাত্তিরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়োরগুলো ঘুমুচ্ছে। গাদাগাদি করে ঘন হয়ে শুয়েছে গোটাকয়েক পোষা কুকুর। একটু উত্তাপের আশায় গায়ে গা লাগিয়ে দলা পাকিয়ে রয়েছে জানোয়ারগুলো।
টেটসে আনিজা! তার ক্রোধ! তার কোপ! সমস্ত শরীর থরথর কেঁপে উঠল সেঙাই-এর। তেলেঙ্গা সু মাসে মেহেলীকে নিয়ে সে ঘর বাঁধবে, গৃহস্থালি পাতবে। সমাজ তাদের সংসার ও বিবাহিত জীবনকে মেনে নেবে। যদি সেই ঘর-গৃহস্থালির ওপর টেটসে আনিজার কোপ এসে পড়ে! তার বিবাহিত জীবন যদি ছারখার হয়ে যায়! তার আর মেহেলীর পাহাড়ী কামনার মধ্যে যে স্বপ্নটা ফুটি ফুটি করছে তা যদি সাবাড় হয়!
এতদূর এসেও কী করবে, কী না করবে, স্থির এবং স্পষ্টভাবে কিছুই ভেবে উঠতে পারছে না সেঙাই। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে।
হঠাৎ বাঁশের পাটাতনের ওপাশে গোঙানি শোনা গেল, আ-উ-উ-উ—
চমকে উঠল সেঙাই। এ গোঙানি নির্ঘাত মেহেলীর। আচমকা, একান্তই আচমকা, নিজের অজান্তে সেঙাই ডেকে ফেলল, মেহেলী, এই মেহেলী–
কে? পাটাতনের ওপাশে মেহেলী চেঁচিয়ে উঠল, কে রে?
আমি সেঙাই। কতদিন তোকে দেখি না। মেজাজটা একেবারে বিগড়ে রয়েছে। একবার বাইরে আয় না। টিলায় বসে গল্প করব। ব্যাকুল সুরে সেঙাই বলল।
