খানিকটা সময় কাটল। আচমকা সেঙাই-এর মনে পড়ল রানী গাইডিলিওর কথা। চওড়া কপাল। দুটো টানা চোখে মধুর মমতা। তার ছোঁয়ায় রক্ত-মাংসের দেহ থেকে রোগ ব্যারাম। আধিব্যাধি নিমেষে উধাও হয়। রানী গাইডিলিওকে আজ বড় দরকার সেঙাই-এর। তার মন একটা স্থির এবং স্পষ্ট সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছে। কোহিমা পাহাড়ে যেদিন সাহেবদের নির্দেশে মণিপুরী, বাঙালি আর অসমীয়া পুলিশেরা বেয়নেট আর ব্যাটনের বাড়িতে তার দেহটা ফাটিয়ে কোহিমার হিমাক্ত পথে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সেদিন রানী গাইডিলিও তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
মেহেলীর ব্যারামের কথা শোনার আগে পর্যন্ত সেঙাই-এর মনটা কামনায় বাসনায় রঙদার হয়ে ছিল। ভবিষ্যতের কথা ভেবে, নিজের সংসারের কথা ভেবে, আবেগে খুশিতে সমস্ত চেতনা ঝুঁদ হয়ে ছিল। বনস্থলীর ছায়ায় তারা ঘর বাঁধবে। দু’টি সুখী জোয়ান-জোয়ানী আশায় আনন্দে সে-ঘর ভরে রাখবে। কিন্তু কোথায় লুকিয়ে ছিল এই ভয়ঙ্কর দুর্বিপাক? খোকের রোগের পরিণাম দেখেছে সেঙাই। সে ছবি তার মনে শিলালিপির মতো অক্ষয় হয়ে রয়েছে। মেহেলীও কি তবে খোনকের মতো খাদের নিচে পড়ে মরবে? নাঃ, মনটা কঠিন হয়ে গেল সেঙাই-এর। নিমেষে সমস্ত চেতনা একাগ্র হয়ে উঠল। স্নায়ুতে-শিরায়-মেদে-মজ্জায় আর রক্তে রক্তে একটা প্রতিজ্ঞা ঝনঝন করে বাজতে শুরু করল। মেহেলীকে কিছুতেই মরতে দেবে না সে। মেহেলীর মৃত্যুর মধ্যে নিজের যৌবনের স্বপ্নকে শেষ হতে দেবে না। দেহমনের সমস্ত শক্তি দিয়ে মেহেলীর মৃত্যুকে সে আটকাবে।
আপাতত রানী গাইডিলিওকে দরকার থাকলেও পাওয়া যাবে না। কিন্তু পাঁচটা টিলা পেরিয়ে এখনই বুড়ো খাপেগার ভেতরের ঘরে মেহেলীর কাছে তাকে যেতে হবে।
চারপাশের মাচানগুলোর ওপর চোখদুটো একবার ঘুরিয়ে আনল সেই। জোয়ান ছেলেরা নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। কানের কাছে বাজ পড়লেও এ ঘুম ভাঙবে না।
বাঁশের দেওয়াল থেকে একটা বর্শা টেনে নিল সেঙাই। তারপর বনবিড়ালের মতো সন্তর্পণে পা টিপে টিপে বাইরের উপত্যকায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
তিনটে টিলা পেরিয়ে এসে একটা উদ্দাম বুনো কলার বন আর পাহাড়ী আপেলের ঝাড় শুরু। এই উপত্যকার জলবাতাস-রোদ থেকে কণায় কণায় প্রাণ সঞ্চয় করে তারা উচ্ছ্বসিত হয়ে রয়েছে। এই ক্ষয়িত চাঁদের রাত্রিতেও পরিষ্কার নজরে আসে, অজস্র ফল পেকে আছে। বুনো কলা এবং আপেলের বন থেকে একরাশ ফল ছিঁড়ে নিল সেঙাই। তারপর আরো দুটো বড় টিলা পেরিয়ে বুড়ো খাপেগার কেসুঙের পাশে এসে দাঁড়াল।
সমস্ত উপত্যকাটা নিঝুম। চাঁদের আবছা আলোয় বন এবং পাহাড়ের মাথা এখন মাখামাখি। পেছনের উতরাই থেকে জলপ্রপাতের গর্জন আসছে। কোথায় একটা ডোরাকাটা হুমকে উঠল। পাশের খাসেম বনে ময়ালের ফোঁসফোসানি শোনা যাচ্ছে। সুখাই ঘাসের ওপর সরসর শব্দ করে কী একটা সরীসৃপ খাদের দিকে নেমে গেল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সেঙাই। তারপর সামনের পাথুরে চত্বরটা পেছনে ফেলে মেহেলীর ঘরখানার সামনে চলে এল। তক্ষুনি চমকে উঠল সে। ফিকে, অস্পষ্ট আলল। তবু ঠিক ঠিক দেখা গেল। বুড়ো খাপেগার কেসুঙের পাশে দুটো পাহাড়ী জোয়ান সতর্কভাবে পা।
ফেলে ফেলে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে।
চট করে বাঁশের দেওয়ালের পাশে সরে গেল সেঙাই। প্রখর থাবায় বর্শার বাজুটা চেপে ধরল। উত্তেজনায় ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। বুকটা তোলপাড় হচ্ছে। চোখের মণিতে শিকারের ছায়া পড়েছে। সে শিকার দুটো পাহাড়ী জোয়ান।
ওপাশ থেকে ফিসফিস গলা ভেসে আসছে।
হু-হু–খাঁটি কথা। আমদের বস্তির মেয়ে অন্য বস্তিতে লুকিয়ে থাকবে, এ কেমন ব্যাপার। এতগুলো জোয়ান ছোকরা রয়েছি আমরা, গায়ে রক্ত আছে, তবু বসে বসে দেখছি। ইজ্জত লোপাট হয়ে গেল সালুয়ালাঙ বক্তির। মান আর রইল না। গলার স্বর একটু থামল। তার পরেই আবার পর্দায় পর্দায় চড়তে লাগল, আশেপাশের সবাই জানতে পেরেছে। অঙ্গামীরা জেনেছে, সাঙটামরা জেনেছে। মেহেলী যে কেলুরি বস্তিতে পালিয়ে এসেছে, এ খবর জানতে কারো আর বাকি নেই।
কী করে বুঝলি ওরা জেনেছে? অপর জোয়ানটা কৌতূহলী হয়ে উঠল।
সেদিন বর্শা বদল করে অঙ্গামীদের বস্তি থেকে মাটির হাঁড়ি, কোদাল আর নীয়েঙ দুল আনতে গিয়েছিলাম। ওরা বদলে দিল । তারপর গেলাম সাঙটামদের বক্তি ইটিয়াগাতে। তারাও দিলে না।
কেন দিলে না? একেবারে বর্শা হাঁকড়ে সাবাড় করে ফেলব না রামখোর বাচ্চাদের। দ্বিতীয় জোয়ানটা ভয়ানক গলায় চেঁচিয়ে উঠল।
চুপ চুপ। খবদ্দার চিল্লাবি না। গলা টিপে ধরব। এটা সালুয়ালাঙ বস্তি। চাপা গলায় ইমটিটামজাক ধমক দিল।
চিল্লাব না কেন? সাঙটামরা অঙ্গামীরা আমাদের হাঁড়ি দেবে না, কোদাল দেবে না,নীয়ে দুল দেবে না। আমাদের কী করে চলবে তা হলে?
কী বলেছে অঙ্গামীরা? কেন জিনিস দিতে চায় না সাঙটামরা?
ওরা বললে, তোদের বস্তির মাগী পালিয়ে অন্য বস্তিতে গিয়ে থাকে। তোদের আবার ইজ্জত আছে নাকি। তোদের সঙ্গে আমরা কোনো কারবার করব না। সিধে কথা। সেই জন্যেই তো আমাদের সদ্দার মেহেলীকে কেলুরি বস্তি থেকে ছিনিয়ে নেবার জন্যে বলেছে। আজ সাঙটামরা আর অঙ্গামীরা জিনিস বদল করছে না। কাল যদি কোনিয়াকরা এ খবর জানতে পেরে ধান না দেয়, তা হলে না খেয়ে সবাইকে লোপাট হতে হবে। হু-হু, বস্তির মেয়েকে যদি বস্তির মধ্যেই আটকে না রাখতে পারি তাহলে কেমন পাহাড়ী মানুষ আমরা!
