সেঙাই-এর বাঁ পাশের মাচানে শুয়ে রয়েছে ওঙলে। নাক ডাকার প্রতিযোগিতায় সে-ই সবচেয়ে বেশি শব্দময়।
আচমকা ওঙলের নাকের আওয়াজ থেমে গেল। মাচানের ওপর আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল সে। ঢুলুঢুলু চোখে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে ঘুমজড়ানো গলায় ডাকল, সেঙাই, এই সেঙাই–কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। তারপর বলল, রাত জেগে বসে বসে কী করছিস?
ভাবছি। নির্বিকার ভঙ্গিতে সেঙাই বলল।
পাহাড়ী জোয়ান হয়ে রাত্তির জেগে ভাবছিস! এ তো বড় তাজ্জবের কথা। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল ওঙলে।
সেঙাই গলা চড়িয়ে বলল, মেহেলীর কথা ভাবছি।
তা-ই বল। এ তো ভাববারই কথা। দুমাস পর তোর বিয়ে হবে। বউ পাবি। তোর কী মজা। আমাদের তো বিয়ে হবে না। এই মোরাঙের মাচানে শুয়ে শুয়েই সারা জনম কাবার করতে হবে। বুকের হাড়গুলোকে মটমট করে গুঁড়িয়ে বড় রকমের একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওঙলের।
তোরও বিয়ে হবে। সদ্দার তোর বিয়েও ঠিক করে দেবে। সেঙাই সান্ত্বনা দিল।
না রে, না। হুই সদ্দার হল আস্ত একটা সাসুমেচু। ও কিছুতেই আমার বিয়ে দেবে না। আমার বিয়ে দিতে হলে ঘর থেকে যে নগদ বউপণ খসাতে হবে। জান থাকতে একটা বর্শা খরচ করবে হুই সদ্দার! হুঃ! নিরাশাব্যঞ্জক একটা শব্দ করে থেমে গেল ওঙলে। আবছা আলোতে তার চোখজোড়া জ্বলতে লাগল। সেঙাই-এর কাঁধে ঝকানি দিয়ে ওঙলে আবার বলল, দেখছিস না, মেহেলীর জন্যে তোদর কাছ থেকে কতগুলো খারে বর্শা বাগাল সদ্দার। মেহেলী তো ওর মেয়েই নয়। শরদের মেয়ে। তবু রেহাই দিলে না তোদের। হুঃ, ও দেবে আমার বিয়ে!
একটুক্ষণ চুপচাপ। একসময় শান্ত গলায় ওঙলে বলতে শুরু করল, আমার বিয়ের কথা চুলোয় যাক। যা বলছিলাম, মেহেলীর কথা কী ভাবছিলি রে সেঙাই?
দুমাস পরে বিয়ে হবে। এই দুটো মাস মাগীটার সঙ্গে দেখাও করতে পারব না। মনটা কেমন যেন করছে। চোখের সামনে ছুঁড়িটার মুখ খালি ভেসে উঠছে। একদম ঘুম আসছে না। কাতর মুখভঙ্গি করল সেঙাই।
মোটে তো দুটো মাস। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। তারপরেই তেলেঙ্গা সু মাসে তুই ঘর বানিয়ে বউ নিয়ে মোরাঙ থেকে ভাগবি। এর জন্য অত ভাবিস না। কোহিমা থেকে ফিরে তোর ভাবাভাবিটা বড্ড বেড়েছে রে সেঙাই। তাগড়া জোয়ান, রাক্ষসের মতো গিলবি। ভোস ভোস করে ঘুমুবি। ভেবে তো লাভ নেই। ওঙলে বলতে লাগল, ভাবাভাবি থামিয়ে এবার। ঘুমো দিকি। মাঝরাত পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বাঁশের মাচানে ফের টান টান শুয়ে পড়ল। ওঙলে। সঙ্গে সঙ্গে তার নাক ডাকা শুরু হল। ঘুমটাকে প্রচুর সাধনায় আয়ত্ত করেছে ওঙলে।
কিন্তু ঘুম আসছে না সেঙাই-এর। মাচানের ওপর বসেই আছে সে। ব্যগ্র গলায় ডাকল, এই ওঙলে–এই, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? এই তো কথা বলছিলি!
ওঙলে নিরুত্তর। নাকের গর্জন তার প্রমত্ত হয়ে উঠেছে। মাচান থেকে নেমে ওঙলের পাঁজরায় একটা ধারাল নখ বসিয়ে দিল সেঙাই, এই ওঙলে, এই–
আহে ভু টেলো! লাফিয়ে উঠল ওঙলে, টেফঙের বাচ্চাটা তো ঘুমুতে দেবে না দেখছি। বিরক্তিতে ভ্রুকুটি ফুটে বেরুল ওঙলের।
মোলায়েম গলায় সেঙাই বলল, থাম, থাম শয়তানের বাচ্চা। বেশি চেঁচামেচি করলে বর্শা হাঁকড়ে সাবাড় করে ফেলব। এই জম্মে আর ঘুমুতে হবে না। যা বলছি তার জবাব দে দিকি।
ভারি রগচটা মানুষ ওঙলে। ক্রুদ্ধ, রক্তাভ চোখে তাকাল সে।
দাঁতে দাঁত ঘষে সেঙাই বলল, তুই তো রোজ সদ্দারের বাড়ি যাস। মেহেলী কী বলে রে? তার কাছে যাওয়া আমার বারণ। সেই ফাঁকে মাগীটার সঙ্গে পিরিত টিরিত জমাসনি তো?
মাচানের পাশ থেকে সাঁ করে একটা বর্শা টেনে উঠে বসল ওঙলে। হুমকে উঠল, একেবারে লোপাট করে ফেলব। পরের মাগীর সঙ্গে আমি পিরিত টিরিত জমাই না।
তা তো জানি। তুই আমার আসাহোয়া (বন্ধু। তুই কি তা করতে পারিস? চেঁচামেচি করছিস কেন? বর্শাটা নামিয়ে রাখ। আপসে কথা বল।
মাথার ওপর উদ্যত বর্শার ফলা। অথচ গলাটা একটুও কাঁপছেনা সেঙাই-এর, ভয় পায়নি সে। বলতে লাগল, দুমাস ঘুড়িটার সঙ্গে দেখা হবে না। কী করি বল তো?
কী আবার করবি, মোরাঙে পড়ে পড়ে ঘুমুবি। আর যদি তা না পারিস লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করবি। নে, এবার ঘুমুতে দে। আবার যদি খুঁচিয়ে জাগাস তা হলে জানে বাঁচতে হবে না। ভয়ানক গলায় সেঙাইকে শাসিয়ে মাচানের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল ওঙলে। শুয়ে শুয়ে গজগজ করতে লাগল, কেসুঙে গেলে হুই মেহেলী যুঁড়িটা সেঙাই-এর কথা বলবে। আর মোরাঙে এলে এই শয়তানটা হুই মাগীটার কথা বলবে। টেফঙের বাচ্চা দুটো মেজাজটাকে খিঁচড়ে দিচ্ছে। ঘুড়িটাকে ব্যারামে ধরে ঘ্যানঘ্যানানি আরো বেড়েছে।
তরিবত করে শোওয়ার ফিকিরে ছিল সেঙাই। ওঙলের শেষ কথাগুলো শুনে ঘুরে বসল, কী ব্যারাম? কার ব্যারাম রে ওঙলে?
বিড়বিড় করে জড়িত গলায় ওঙলে বলল, কার আবার ব্যারাম, হুই সালয়ালাঙের মাগীটার। তোর বউ হবে যে, তারা চোখ লাল, গায়ে আগুন ছুটছে। সকালে তামুন্যু এসেছিল। খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। শুয়ে শুয়ে মাগীটা কী যেন বকে দিনরাত। বলতে বলতে থেমে গেল ওঙলে। নির্ঘাত ঘুমিয়ে পড়েছে সে।
চুপচাপ বসে রইল সেঙাই। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা হিমধারা ছুটল যেন তার। ব্যারাম হয়েছে মেহেলীর। চোখ লাল। শরীরে ভয়ানক তাপ। প্রলাপ বকছে। তবে কি খোনকের মতো তার বোন মেহেলীকেও আনিজাতে পেল? কেলুরি গ্রামের তামুন্যুও কি তাকে খাদে ফেলে দেবার বিধান দেবে? ভাবতে ভাবতে অস্ফুট বুনো মনটা কেমন যেন অসাড় হয়ে গেল সেঙাই-এর।
