পাথুরে ছাদটা আরো নেমে এল। আচমকা, একান্তই আচমকা, ডাইনি নাকপোলিবার মন্ত্র থেমে গেল। একটা ভয়ঙ্কর, আদিম প্রাণ চিরকালের জন্য স্তব্ধ হল।
.
৩৯.
উপত্যকায় ক্ষয়িত চাঁদের রাত্রি। ছায়া-ছায়া ফিকে জ্যোৎস্না। মোরাঙের এই মাচাগুলো থেকে দূরের বন এবং পাহাড়ের চূড়াকে বড়ই রহস্যময় মনে হয়। টিজু নদীর আঁকাবাঁকা নীল শরীরটাকে কেমন ঝাপসা দেখায়। পুব-পশ্চিম-উত্তর এবং দক্ষিণ পাহাড়ের মাথায় মাথায় বিবর্ণ চাঁদের আলো পাতলা পর্দার মতো জড়িয়ে রয়েছে।
বাঁশের মাচানে শুয়ে শুয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে দৃষ্টিটা ছড়িয়ে দিয়েছিল সেঙাই। কিন্তু কিছুই যেন দেখছিল না সে। শুধু ভাবছিল। তার মনে হচ্ছিল, সামনের বনে আরেলা ফুলের মতো একটি পরম রমণীয় মুখ ফুটে রয়েছে। সে মুখের রূপে এই পাহাড়ী পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠেছে। শুধু এই পাহাড়ই নয়, সেঙাই-এর অস্ফুট বুনো মনটাও আমোদিত হয়ে উঠেছে।
সেঙাই ভাবল, মাঝখানে আর দুটো মাত্র মাস। একটি মাত্র ঋতুর ব্যবধান, সে ঋতু। বর্ষার মরশুম। অশ্রান্ত বৃষ্টির দিনগুলো পেরিয়ে আসবে তেলেঙ্গা সু মাস। সেই মাসের শেষের দিকে তাদের বিয়ে। মেহেলী–এক অপরূপা জোয়ানী, এক পার্বতী মনোরমা। সালুয়ালাঙ গ্রামের মেয়ে সে, তাদের শত্রুপক্ষ। দুটো মাস পরে সে ঋতুর উৎসব শেষ হলে মেহেলী তার কাছে ধরা দেবে। দেহমন সঁপে দেবে, নিবিড় হবে, অন্তরঙ্গ হবে। এই মোরাঙের মাচানে শুয়ে শুয়ে তার যে পৌরুষ সমস্ত রাত্রি অতৃপ্ত এবং উত্তেজিত হয়ে থাকে সেগুলি তৃপ্ত, শান্ত এবং সার্থক করে তুলবে মেহেলী।
খাসেম বনের ঘন ছায়ায় একটি নিভৃত সংসার। খড়ের চাল আর বাঁশের দেওয়ালে ঢাকা সুন্দর ঘর। সামনে দুষ্ট আনিজা বিতাড়নের জন্য গোলাকার বিড়ুই পাথর পোঁতা হবে। ঘরের পাটাতনের নিচে বাঁশের খাটাল বানিয়ে শুয়োর আর বনমোরগ রাখা হবে। সুস্বাদু গৃহস্থালির কল্পনায় মনটা উদ্বেল হয়ে উঠল সেঙাই-এর। ধীরে ধীরে উঠে বসল সে।
বুড়ো খাপেগা আর বুড়ি বেঙসানু দুটো পাকা মাথা এক করে, রোহি মধু ভরা বাঁশের চোঙায় তারিয়ে তারিয়ে চুমুক দিতে দিতে তাদের বিয়ের দিন ঠিক করে দিয়েছিল। তেলেঙ্গা সু মাসে আকাশে যেদিন স্পষ্ট হয়ে ছায়াপথটা ফুটে উঠবে, তারায় তারায় আকাশ ছেয়ে যাবে, রুপোর থালার মতো চাঁদ উঠবে, সেই সুলু (শুক্ল) পক্ষে তাদের বিয়ে হবে।
উত্তর দিকে গোটা পাঁচেক পাহাড় পেরিয়ে গেলে ইটিয়াগা নামে একটা বড় রকমের গ্রাম রয়েছে। সেখানে আশেপাশের বিশটা গ্রামের বিয়ের পুরুত বুড়ো হিবুটাক থাকে। সকলের কাছে তার খুব খাতির। বুড়ো খাপেগা এবং বুড়ি বেঙসানু বিয়ের মন্ত্র পড়ার দরুন নগদ দশটা বর্শা, চাকভাঙা খাঁটি মধু আর খান দুই এরি কাপড় তাকে আগাম দিয়ে এসেছে।
বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে একটা হাহাকার যেন বেরিয়ে আসতে চায় সেঙাই-এর। দু দুটো মাসের ব্যবধান। ওঃ, কতদিন! শেষ পর্যন্ত অস্থির আর উত্তেজিত হয়ে উঠল সে। বিয়ের রীতি অনুযায়ী এই দুটো মাস তার সঙ্গে মেহেলীর কথাবার্তা বলা কিছুতেই সম্ভব নয়। যে তারিখে বিয়ের লগ্ন ধার্য হয় তার পর থেকে সেই লগ্ন না আসা পর্যন্ত পাত্রপাত্রী মুখোমুখি হলে, কিংবা একজন অপরকে দেখে ফেললে, সে বিয়ে অসিদ্ধ হয়। সে বিয়েতে পাপের স্পর্শ লাগে। কলঙ্ক লাগে স্বলনের, চরিত্রদোষের। পাহাড়ী প্রথা বড় নির্মম, নিষ্ঠুর।
দু’দুটো মাস। অথচ মাত্র পাঁচটা টিলা পেরিয়ে গেলে বুড়ো খাপেগার কেসুঙ পাওয়া যাবে। সেখানে ভেতরের ঘরে মেহেলী থাকে।
আচমকা সেঙাই-এর মনটা যেন কেমন করে উঠল। কোহিমা থেকে ফিরে আসার পর মনের মধ্যে নতুন এক ধরনের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। গুছিয়ে ভাবতে শিখেছে সে। শুয়ে, বসে কিংবা অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে বেশ লাগে। নিজের অজান্তেই ভাবনার ক্রিয়া চলে।
এতকাল প্রত্যক্ষ জগৎ, স্থল ইন্দ্রিয়গোচর বস্তুগুলো ছাড়া অন্য কোনো কথা ভাবতে পারত না সেঙাই। কিন্তু কোহিমায় গিয়ে তার চিন্তাধারার এবং ভাবনার জগতে তীব্র আলোড়ন লেগেছে। আজকাল দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তু ছাড়া আরো অনেক কিছু সে ভাবে, ভাবতে পারে। অন্তত ভাবতে চেষ্টা করে। ভাবনাগুলো হয়তো শৃঙ্খলাবদ্ধ হয় না। তবু ভাবতে ভালো লাগে।
এখন, এই মুহূর্তে মেহেলীর মনের কথা ভাবতে লাগল সেঙাই। মেহেলী কি তারই মতো ক্ষয়িত চাঁদের আকাশে দৃষ্টি ছড়িয়ে তার কথাই চিন্তা করছে? সেঙাই যেমন অস্থির ও উত্তেজিত হয়ে রয়েছে, ঠিক তেমনই কি মেহেলীর দেহ-মনে আলোড়ন চলছে?
চোখদুটো বাইরের আকাশ থেকে মোরাঙের মধ্যে নিয়ে এল সেঙাই। মোরাঙের দেওয়ালে বুনো মোষের মাথা, মানুষের করোটি, শুকনো কালো রক্তের নানা চিত্র এবং হরিণের মুণ্ডু গাঁথা রয়েছে। ক্ষয়িত চাঁদের আবছা আলোতে মোরাঙকে ভৌতিক দেখায়। এখন মাঝরাত। আকাশ, চারপাশের পাহাড় এবং বনস্থলী আশ্চর্য নিঝুম।
পাশের মাচানগুলোতে অঘোরে ঘুমোচ্ছে জোয়ান ছেলেরা। ভোস ভোঁস শব্দে নাক ডাকছে। নাক ডাকার আওয়াজটা কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে। জোয়ানদের মুখের উপর দৃষ্টিটাকে পাক খাইয়ে আনল সেঙাই। বুড়ো খাপেগা আজকাল মোরাঙে শুতে আসেনা। মেহেলী তাকে ধরমবাপ ডেকেছে। তার চরিত্র রক্ষার জন্য, বিয়ের আগে পর্যন্ত তার কৌমার্যকে অক্ষত রাখার কারণে, সমস্ত রাত জেগে বুড়ো খাপেগা তাকে পাহারা দেয়।
