পাহাড়ী ভূমিকম্প। ভয়াল এবং ভয়ঙ্কর। নাকপোলিবার গুহার ছাদ একটু একটু করে নেমে আসছে। ভাজে ভাজে পাথর ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। পেন্য কাঠের মশাল দুটো নিভে গিয়েছে। নিচ্ছেদ অন্ধকার। সেই কঠিন, জমাট বাঁধা আঁধারে এই গুহার একটা আদিম প্রাণকে খতম করে দেবার উল্লাসে পাহাড়টা নেমে আসছে মাথার ওপর।
বিকট গলায় আর্তনাদ করে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা, কিন্তু সেই আওয়াজ ধস নামা আর বন-ভাঙার শব্দের মধ্যে চাপা পড়ে গেল। নাকপোলিবা গোঙাতে গোঙাতে বলতে লাগল, আমি তোকে মারব না সালুনারু। তুই আমাকে বাঁচা। আমি–আমি পথ দেখতে পাচ্ছি না। সব অন্ধকার। ছাদটা যে নেমে আসছে। আ-উ-উ-উ–
এবড়োখেবড়ো ছাদটা ক্রমশ মাথার কাছে চলে এসেছে। হাত থেকে বুনো মোষের হাড়খানা খসে পড়ল ডাইনি নাকপোলিবার। কয়েকটা মাত্র মুহূর্ত, তারপরেই কর্কশ মেঝের ওপর দিয়ে বুকে হেঁটে হেঁটে সুড়ঙ্গমুখের দিকে এগুতে লাগল সে।
বাইরে বিরাট বিরাট পাথরের চাঙড় নামছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে খাসেম বন। অসংখ্য শিকড় মেলে পাথুরে মাটি আঁকড়ে যে পাহাড়ী আরণ্য উদ্দাম হয়ে উঠেছিল, ভূমিকম্পের এলোপাথাড়ি বাড়ি খেয়ে তারা লুটিয়ে পড়ছে।
বুক হেঁচড়ে সামনের দিকে এগুতে এগুতে আচমকা সমস্ত শরীরটা ঝংকার দিয়ে উঠল ডাইনি নাকপোলিবার। জীর্ণ বুকের মধ্যে যে নিথর হৃৎপিণ্ডটা ধুকধুক করত সেটাকে বঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে অদ্ভুত শিহরন খেলে গেল। শুকনো শরীরের শীর্ণ শিরায় শিরায় আচমকা রক্তের মাতামাতি শুরু হল। এগিয়ে আসতে আসতে থমকে গেল ডাইনি নাকপোলিবা। এতক্ষণে তার মাথাটা গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ধড়টা সুড়ঙ্গের মধ্যেই রয়ে গিয়েছে।
একটু আগে সে ভয় পেয়েছিল। পাহাড়ী ভূমিকম্প তাকে মৃত্যুর আতঙ্কে জর্জর করে তুলেছিল। ডাইনির জীবনে, তার দেহ-মন-বোধ কিংবা চেতনায় এবং ভাবনায় এসবের অস্তিত্ব নেই। ভয় নামে কোনো অনুভূতি, আতঙ্ক নামে কোনো শিহরন, মৃত্যু নামে কোনো বিভীষিকা ডাইনির মনে থাকতে নেই।
ডাইনি নাকপোলিবা। এই পাহাড়ী পৃথিবীর সমস্ত মন্ত্র-তন্ত্র, সমস্ত আদিমতা এবং হিংসাকে শ্রুতিতে, স্মৃতিতে, ভাবনায় ধারণ করে এই গুহায় নির্বাসিত হয়ে রয়েছে সে। সে নিজেই তো এক বিভীষিকা, ভয়ের জীবন্ত মূর্তি। এই পাহাড়ে সমস্ত মৃত্যু এবং অপঘাত তো তারই একটি ইঙ্গিতের অপেক্ষায় ওত পেতে থাকে। সে ডাইনি নাকপোলিবা, তবু সে ভয় পেয়েছে। তার শিক্ষাদীক্ষা এবং কর্তব্য সে ভুলে গিয়েছিল। ভীষণ এক অপরাধবোধে, মারাত্মক এক ধরনের পাপাঁচরণের অনুভূতিতে সমস্ত অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল নাকপোলিবার। ডাইনি হওয়ার যোগ্যতা তার নেই। রসিলটাকের মন্ত্রশিষ্য হওয়ার সামর্থ্যও না। রসিলটাকের নির্দেশগুলো সে ভুলে যাচ্ছে। ভুলে যাচ্ছে সমস্ত মন্ত্রতন্ত্র।
আচমকা বহুকাল আগের এক জোয়ানী মেয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল। বাঁজা হওয়ার অপরাধে এই পাহাড় তাকে আশ্রয় দেয় নি, সোয়মী স্বীকৃতি দেয়নি স্ত্রীর, বাপ স্বীকৃতি দেয়নি মেয়ের। সেদিন সেই যুবতী জনপদ থেকে অনেক, অনেক দূরে দক্ষিণ পাহাড়ের এই নির্জন উপত্যকায়, এই গুহায়, ডাইনি রসিলটাকের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। রসিলটাকের উত্তরকাল সে। সেই যৌবনবতী নারীর ভাবনা এই মুহূর্তে বড়ই অসত্য, বড়ই অবাস্তব এবং নিছক মনোবিলাস ছাড়া আর কিছু নয়। তবু নাকপোলিবা তার কথা ভাবল। কেন ভাবল, সে-ই জানে। আরো ভাবল সেদিনের তামাটে রঙের বাঁজা জোয়ানীর চেয়ে আরো একটা ভয়ানক সত্য আছে। সেই রঙে রসে ভরপুর যুবতী আজ মিথ্যে এবং অতীত। ডাইনি নাকপোলিবাই আজ সত্য, ভীষণ এবং সাআতিক সত্য।
ডাইনি নাকপোলিবা ভয় পেয়েছে। তবে কি এই পাহাড়ে অসংখ্য বছর কাটিয়ে জীবনের অন্তিম সময়ে আনিজার ক্রোধ এসে পড়ল তার ওপর! বুকের ভেতরটা কি ভয়ে ছমছম করে উঠছে ডাইনি নাকপোলিবার!
না, ভয় পেলে চলবে না। রসিলটাকের শিক্ষা এবং এই পাহাড়ের আদিম মন্ত্রতন্ত্রগুলিকে সে ব্যর্থ হতে দেবে না। রসিলটাক তাকে ভূমিকম্প থামানোর মন্ত্র শিখিয়েছিল। মন্ত্র পড়ে এই ভূমিকম্পকে দক্ষিণ পাহাড় থেকে চিরকালের জন্য খেদিয়ে দেবে নাকপোলিবা। গুহা থেকে সে বাইরে যাবে না। কিছুতেই এখান থেকে সে পালাবে না।
পাহাড়ের অন্তরাত্মা থরথর করে কাঁপছে। গুহাটা টলমল করছে। ওপর থেকে নিরেট ছাদ নেমে আসছে। না, কিছুতেই ছাদকে আর নামতে দেওয়া হবে না। সুড়ঙ্গের বাইরে মাথাটা এবং ভেতরে বাকি দেহটা পড়ে রয়েছে ডাইনি নাকপোলিবার।
নাকপোলিবা ভাবল, রসিলটাকের এই গুহাকে কিছুতেই ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না। আচমকা একটানা তীক্ষ্ণ গলায় মন্ত্র পড়তে শুরু করল সে :
ওহ-ই-য়ি–এ-য়ে–এ-এ
ওহ-ই-ই-য়ি–সুঙকেনি–ই-ই-ই–
আমহু লেখসু—সুঙকেনি–ই-ই-ই–
অমুকেবঙ সঙ—সুঙকেনি–ই-ই-ই–
ওহ-ই–ই-ই-য়ি –এ-হে-এ-এ
সঙ-সুঙকেনি-ই-ই-ই—
ছাদটা আরো নেমে আসছে। ডাইনি নাকপোলিবার পিঠে তার হিমাক্ত ছোঁয়া এসে লেগেছে।
বাইরে ধস নামার গর্জন, অরণ্য ধ্বংসের আর্তনাদ, জলপ্রপাতের তর্জন। সব মিলিয়ে একটা বিকট প্রলয়। সমস্ত কিছু ছাপিয়ে উঠেছে নাকপোলিবার গলা। অনেক, অনেক দিন পরে সে মন্ত্র পড়তে শুরু করেছে। একটু আগে ভয় পেয়ে শিক্ষা-দীক্ষা সব ভুলে গিয়েছিল ডাইনি নাকপোলিবা। এই মুহূর্তে প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে। আরো, আরো জোরে, দেহমনের সমস্ত উত্তেজনা ও শক্তি গলায় একত্র করে চিৎকার করতে লাগল নাকপোলিবা। না, রসিলটাকের। শিক্ষাকে এবং এই নাগা পাহাড়ের গুহায়-সুড়ঙ্গে-উপত্যকায়-মালভূমিতে আদিম জীবনের যে মন্ত্রগুলি ছড়ানো রয়েছে তার কিছুই বিফল হতে দেওয়া যাবে না। কিছুতেই নয়। এই ভূমিকম্পকে সে শাসন করবে।
