রসিলটাক আবার কে? অপরিসীম কৌতূহলে এবং গল্প শোনার নেশায় আরো ঘন হয়ে বসল সালুনারু।
এই গুহায় সে থাকত, সে-ও ডাইনি ছিল। আমাকে সব মন্ত্রতন্ত্র শেখাল সে, ওষুধ শেখাল, গুণতুক শেখাল। পোয়াতি মাগীর পেট খসাবার কায়দা শেখাল। সব শিখে সোয়ামীকে মারলাম আগে। তারপর বাপকে। বলতে বলতে ডাইনি নাকপোলিবা একটু থামল। উত্তেজনায় তার ছোট্ট, জীর্ণ বুকটা ওঠানামা করছে। ঘন ঘন, দ্রুত তালে বুক ভরে বারকয়েক বাতাস নিল নাকপোলিবা। বলল, একদিন রসিলটাক মরল। তার জায়গায় আমি রয়েছি। বাঁজা বলে সোয়ামী আর বাপ ঘরে থাকতে দিলে না। নইলে কি আর ডাইনি হতাম! যাক সে কথা। আমি মরলে আমার জায়গায় তুই থাকবি। তোর মরার সময় তোর জায়গায় নতুন ডাইনি বানিয়ে যাবি। যারা আমাদের বস্তিতে থাকতে দেয় না, তাদের শায়েস্তা করতে হবে। নিজেদের দোষ নেই, এই ধর আমি বাঁজা, তুই আনিজার নামে রুখে উঠেছিলি, অমনি আমাদের বস্তি থেকে ভাগিয়ে দিল। ওরাই তো আমাদের ডাইনি করে। যেমন আমাদের ডাইনি বানায় তেমনি তার ঠ্যালা সামলাক।
হু-হু, ঠিক বলেছিস। মাথা নেড়ে নেড়ে নাকপোলিবর কথায় সায় দিল সালুনারু। বলল, হুই রামখোর বাচ্চারাই তো আমাদের ডাইনি বানায়। একটু একটু করে তার শোধ তুলব। তোর কাছে ওষুধ শিখলাম, মন্তর শিখলাম। এবার কেলুরি আর সালুয়ালাঙ বস্তির সব শয়তানগুলোকে উজাড় করে ছাড়ব।
হু, সব লোপাট করে দে। এই পাহাড়ে একটা মানুষও জ্যান্ত রাখবি না। সবগুলোকে মেরে তাদের হাড়ের ওপর, মাংসের ওপর বসে, মজা করে খুলি বাজাবি। এই পাহাড়ী শয়তানগুলো আমাদের ঘর দেয়নি, একটু থাকবার জায়গা দেয়নি। একটু ভালোবাসেনি। তাদের সঙ্গে কোনো খাতির নেই। তুই আর আমি সব সাবাড় করে এই পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াব, কি বলিস? হিঃ হিঃ হিঃ–বীভৎস গলায় টেনে টেনে হেসে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা। সালুনারুর মনে হল, হাসির দমকে বুকের হাড়গুলো তার মটমট করে ভেঙে যাবে।
অবিরাম হাসি, খুরধার হাসি। সে হাসি গুহার ছমছমে আলোছায়ায় মিশে যেতে লাগল। একটু আগে ডাইনি নাকপোলিবার হিসাবহীন বয়সের অতল স্তর থেকে যে কোমল নারীমনটি, যে সুন্দর আকাঙ্ক্ষাগুলি উঁকি মেরেছিল, এই ভীষণ হাসির হুমকিতে তারা আবার উধাও হয়েছে।
কিছুদিন আগে হলেও ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠত সালুনারু, কিন্তু কমাস ধরে নাকপোলিবার শরীরে শরীর ঠেকিয়ে, একান্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে মন্ত্রতন্ত্র, গুণতুক, বশীকরণ শিখতে শিখতে ভয়ডর চলে গিয়েছে। আজকাল নাকপোলিবাকে তেমন ভয়ঙ্কর মনে হয় না। হয়তো মনেপ্রাণে নাকপোলিবার সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছে সালুনারু। নির্বিকার ভঙ্গিতে পাথরের ওপর বসে রইল সে। অপলক চোখে দেখতে লাগল, কেমন করে ডাইনি। নাকপোলিবার কোটরে-ঢোকা চোখে একজোড়া আগুনের গোলক জ্বলছে আর নিভছে।
একসময় হাসি থামল। আশ্চর্য সহজ গলায় নাকপোলিবা বলল, আচ্ছা সালুনারু, আমার সব বিদ্যে তো তোকে দিলাম। একেবারে প্রথমে কার ওপরে এই বিদ্যে হাঁকড়াবি, কি রে? অন্তরঙ্গতার সুর ফুটে উঠল কথাগুলোতে।
কার ওপর হাঁকড়াব? কঠিন চোখে তাকাল সালুনারু। তার তামাটে কোমল দেহটা একটু একটু করে শক্ত এবং নির্মম হয়ে উঠতে লাগল। মুখটা হিংস্র হয়ে উঠল। একটা আদিম এবং কুটিল প্রতিজ্ঞা জ্বলতে লাগল দুচোখে। দাঁতে দাঁত ঘষে, ভুরু কুঁচকে সালুনারু বলল, সবচেয়ে আগে হাঁকড়াব তোর ওপর। তুই আমার সোয়ামীকে খাদে ফেলে মেরেছিস। সোয়ামী মরেছে। বলে আমি বস্তিতে টিকতে পারলাম না। আমাকে ডাইনি হতে হল। তোকেই–
আহে ভু টোলো! সাঁ করে একপাশে সরে গেল ডাইনি নাকপোলিবা। বলল, আমাকে মারবার জন্যে এখানে এসে ডাইনি হয়েছিস! মাড়ি খিঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠল নাকপোলিবা। তারপরেই পাশ থেকে একটা বুনো মোষের হাড় বার করে আনল। হাড়টার দু’পাশ পাথরে ঘষে ঘষে রীতিমতো ধারাল করা হয়েছে। তীব্র গলায় গর্জে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা, আমাকে সাবাড় করতে এসেছিস! এই গুহার ভেতর থেকে জান নিয়ে ফিরতে হবে না। একেবারে টুকরো টুকরো করে কাটব তোকে। মোষের হাড়খানা সালুনারুর মাথার ওপর তুলে ধরল নাকপোলিবা।
ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে যেত, কিন্তু তার আগেই প্রবলভাবে গুহাটা কেঁপে উঠল। বাইরে বিরাট বিরাট পাথরের চাই গড়িয়ে পড়ার আওয়াজ হচ্ছে গুমগুম শব্দে।
কাতর গলায় চেঁচিয়ে উঠল ডাইনি নাকপোলিবা, ভূমিকম্প, ভূমিকম্প শুরু হয়েছে লো সালুনারু।
চমকে উঠল সালুনারু। একটি মাত্র মুহূর্ত। সঙ্গে সঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল একটা উলঙ্গ যুবতীদেহ। সামনের উপত্যকায় যে বন নিবিড় হয়ে রয়েছে, তার মধ্যে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল সালুনারু।
গুহার ভেতর একটা করুণ গলা শোনা গেল। ডাইনি নাকপোলিবা ককিয়ে উঠেছে, তুই একা যাস না সালুনারু। আমাকে বাঁচা, পাহাড়টা নেমে আসছে। আমি যে বেরুতে পারছি না।
বাইরে একটানা বিরাট বিরাট পাথর পড়ার শব্দ হয়েই চলেছে। বিকট আওয়াজে পাহাড়ী অরণ্য ধরাশায়ী হচ্ছে। এগুলোর সঙ্গে জলপ্রপাতের গর্জন একাকার হয়ে মিশে গিয়েছে। একটা ভয়াবহ প্রলয় এই পাহাড়কে গুঁড়িয়ে, চুরমার করে দেবার জন্য ধেয়ে আসছে। এই সব শব্দ ছাড়া উপত্যকা থেকে কোনো পশুপাখি বা মানুষের গলা শোনা গেল না। সালুনারু তো আগেই পালিয়ে গিয়েছে।
