হু-হু। মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সায় দিল সালুনারু। তারপর পলকহীন, ভয়ানক দৃষ্টিতে নাকপোলিবার দিকে তাকিয়ে রইল।
নাকপোলিবা আরো বলল, তুই তো এখন রীতিমতো ডাইনি হয়ে গেলি। কত বছর ধরে এই গুহায় বসে রয়েছি, তার কি হিসেব আছে! সেবার ভূমিকম্পের দাপটে টিজু নদীর মুখ ঘুরে গেল। আগে কি এখানে বন ছিল? ছিল না। সেই বন গজাতে দেখলাম। দক্ষিণ পাহাড়ের মাথায় অঙ্গামীদের বস্তি ঘেঁষে লাল রঙের একটা পাহাড় উঠল। তা দেখলাম। সেসব তিরিশ কি পঞ্চাশ বছর আগের কথা। তখন তো গুহা থেকে বার হতুম। পাহাড়ের ডগায় দাঁড়িয়ে দেখতুম অঙ্গামীদের বস্তিতে সাদা সাদা সব মানুষ আসতে লাগল। হুন্টসিঙ পাখির পালকের মতো ধবধবে রং। তাদের নাম নাকি সায়েব। কত দেখলাম রে সালুনারু। কত বছর ধরে এই পাহাড়ে বেঁচে রয়েছি। জীর্ণ, হাড়সার দেহটাকে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। নাকপোলিবা ডাইনির।
খানিকক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর আবার শুরু করল নাকপোলিবা, এতদিন তো এই পাহাড়ে রইলাম। এত মন্ত্র শিখলাম, এত গুণতুক শিখলাম। এত ওষুধ করা শিখলাম। সারাদিন এই গুহায় বসে থেকে ভাবতুম, কাকে এত সব মন্ত্র, এত ওষুধ শিখিয়ে যাই। তোকে এসব দিয়ে এবার ভাবনা দূর হল। অনেক কাল বাঁচলাম। এবার নির্ঘাত লোপাট হয়ে যাব।
এই কটা মাসের প্রতিটি মুহূর্ত পরম মনোযোগে, অখণ্ড একাগ্রতায় ডাইনি নাকপোলিবার কাছ থেকে পৃথিবীর আদিম মন্ত্রগুলির সন্ধান নিয়েছে সালুনারু। একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ নিয়েছে ভীষণের, ভয়ঙ্করের, মন্ত্রের, তন্ত্রের এবং ওষুধের। এই পাহাড়ের কোন অন্ধিসন্ধিতে, কোন গুহায় কি সুড়ঙ্গে, কোন উপত্যকায়, কোন জঙ্গলের আড়ালে-আবডালে রয়েছে গুণু পাতা, রয়েছে সাঙলিক লতা, রয়েছে খুঙা গাছ, কোন জলপ্রপাতের নিচে রয়েছে কমলারঙের পাথর, কোথায় রয়েছে সাদা পিঁপড়ের ঢিবি, রয়েছে তিনশো বছরের পুরনো মানুষের করোটি, রয়েছে মন্ত্রসিদ্ধির অসংখ্য উপকরণবানরের মেটলি, বাঘের হাড়, তাজা জোয়ানের হলদে মগজ, জোয়ানী মেয়ের কলিজা, সব–সবই জেনে নিয়েছে সালুনারু।
সালুনারু বলল, সবই তো শিখলাম। এবার এই মন্ত্র আর ওষুধ কেলুরি আর সালুয়ালাঙ বস্তির সব শয়তানগুলোর ওপর চাপাব। সব কটার রক্ত জল করে খতম করব। হু-হু, তবে আমি পাহাড়ী ডাইনি। চোখের মণিদুটো বনবন করে পাক খেতে লাগল সালুনারুর। এই মুহূর্তে তাকে একটা জখমী সাপিনীর মতো ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। গলার শিরাগুলো ফুলিয়ে সে চেঁচাতে লাগল, কেলুরি বস্তির সদ্দার আমাকে ভাগিয়ে দিল। সালুয়ালাঙ বস্তির উপকার করতে গেলাম। সেখানেও শয়তানরা আমাকে খুঁড়তে চায়। আমার মাংস দিয়ে কাবাব বানিয়ে বস্তিতে ভোজ দেবে বলেছে। দুটো বস্তির একটা কুত্তাকেও আমি জ্যান্ত রাখব না। হু-হু–উল্কি-আঁকা উত্তেজিত বুকখানা ফুলে ফুলে উঠতে লাগল সালুনারুর। ক্রোধে দাঁতে দাঁতে কড়মড় শব্দ হতে লাগল। বলল, একটা বস্তিতেও আমাকে টিকতে দিল না টেফঙের বাচ্চারা।
কোটরের মধ্যে দুটুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার। নাকপোলিবার চোখ। একটু একটু করে চোখজোড়া বুজে এল। মাথা নাড়তে নাড়তে সে বলল, হু-হু, আমাকেও একদিন বস্তিতে টিকতে দেয়নি শয়তানেরা।
কেন, তোর আবার কী হয়েছিল? তুই বস্তিতে ছিলি নাকি? লোকে বলে, জন্মের পর ডাইনি হয়ে তুই এই গুহার মধ্যে আছিস সারা জীবন। সালুনারুর গলাটা বিস্ময়ে কেঁপে গেল।
ইজা হুকুতা! দাঁতহীন মাড়িজোড়া বার করে খেঁকিয়ে উঠল নাকপোলিবা, জন্মেই কেউ ডাইনি হয় নাকি! আমি যখন জন্মেছিলাম তখন এই কেলুরি বস্তিও ছিল না, সালুয়ালাঙও নয়। দুটো মিলিয়ে একটা বড় বস্তি ছিল। তার নাম কুরগুলাঙ। সেই কুরগুলাঙে আমার জন্ম। সেই। সময়কার একটা মানুষও আজ বেঁচে নেই।
থাক ওসব কথা।অসহিষ্ণু গলায় সালুনারু বলে উঠল, তুই কেমন করে ডাইনি হয়েছিস সেই গল্পটাই বল দিকি। বড় মজা লাগছে সে কথা শুনতে। প্রবল ঔৎসুক্যে নাকপোলিবার কাছে এগিয়ে এল সালুনারু।
শোন তবে। আমিও এক কালে তোদের মতো জোয়ান মাগী ছিলাম। মনে সোয়ামী, পুত্তুর আর ঘরের জন্যে সাধ-আহ্লাদ ছিল।
আশ্চর্য! ডাইনি নাকপোলিবার চোখজোড়া এখন আর জ্বলছে না। কী এক কোমল আবেগে মনটা তার মাখামাখি হয়ে গেল। একটা কঙ্কালদেহ, নিখাদ হাড় আর চামড়ার কাঠামো। এতটুকু মাংস নেই নাকপোলিবার শরীরে। একটা ভয়ঙ্কর ডাইনি, একটা জীবন্ত প্রেতিনী। কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে একেবারে মন্দ দেখাচ্ছে না। তার জীর্ণ বুকের নিচে হৃৎপিণ্ডের ধুকধুকুনিতে এককালে যে আর দশটা কুমারী মেয়ের মতোই বাসনা এবং কামনা জলদ বাজনার মতো একযোগে বেজে উঠত তা যেন মিথ্যে নয়। ডাইনি না, এই মুহূর্তে নাকপোলিবার মধ্য থেকে চিরকালের এক তৃষাতুর নারীমন হাহাকার করে উঠেছে। সে নারীর সুঠাম দেহে রূপ ছিল, মনের পরতে পরতে রং ছিল। আশা ছিল ভোগের, বাসনা ছিল আর দশটা মেয়ের মতোই জীবনকে গড়ে তোলার। কামনা ছিল একটি বলিষ্ঠ পুরুষের, একটি প্রেমিক স্বামীর। তার নির্দয় পেষণের, নির্মম সোহাগের।
ভাঙা ভাঙা, কিছুটা বিষণ্ণ গলায় নাকপোলিবা বলে চলল, বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু তখনও কি জানতাম, আমি বাজা! এক বছর গেল, দুবছর গেল। তিন বছর সোয়ামীর সোহাগ ভোগ করেও একটা বাচ্চার জন্ম দিতে পারলাম না। বর্শা উঁচিয়ে সোয়ামী আমাকে ভাগালে। বাজা বউ ঘরে পুষলে নাকি আনিজার গোসা এসে পড়ে। চলে এলাম বাপের কাছে। বাপ লম্বা দা বাগিয়ে ধরলে। তিন বছর সোয়ামীর ঘর করে যে মাগী বাচ্চা বিয়য়াতে পারে না, নির্ঘাত তার ওপর আনিজার খারাপ নজর আছে। তাকে ঘরে জায়গা দিলে সব জানে সাবাড় হয়ে যাবে। ভয়ে এই দক্ষিণ পাহাড়ে পালিয়ে এলাম। তিন দিন, তিন রাত বনে বনে ঘুরে, আখুশি ফল খেয়ে কাটিয়ে দিলাম। তারপর দেখা হল রসিলটাকের সঙ্গে।
