কেলুরি গ্রামের একালের জোয়ানেরা এ গল্প অনেক বার শুনেছে। বার বার শুনেও তাদের অরুচি ধরে না। যতবার শোনে ততবারই আরো ভালো লাগে, নতুন লাগে।
সেঙাই বলল, সেসব কথা আদ্দিনে অঙ্গামীরা ভুলে গেছে।
আরে না, না। পাহাড়ী নাগা অত সহজে মাথা কাটার কথা ভোলে না। এক জন্মে না হোক আর এক জন্মে, বাপ না পারুক ছেলে, ছেলে না পারুক নাতি, তার শোধ তুলবেই। এই তো সালুয়ালাঙের খোনকেকে মেরে তোর ঠাকুরদাকে মারার শোধ তুলে এলি। অঙ্গামীরা লোপাট হোক। সায়েবদের সঙ্গে লড়াইটা তা হলে বাধছে? উল্লাসে বুড়ো খাপেগার চোখজোড়া চকচক করতে লাগল।
সেঙাই বলল, হু-হু, আসান্যুরা লড়াই বাধিয়ে দিয়েছে।
কে বললে? বাদামি পাথরখানায় খাড়া হয়ে বসল বুড়ো খাপেগা।
কোহিমা পাহাড়ের মাধোলাল বলছিল। আসাদের সদ্দারটার নাম গান্ধা–না কি যেন। আমার ঠিক মনে নেই। সারুয়ামারু জানে। সে বলতে পারবে।
সারুয়ামারু, এই সারুয়ামারু–তারস্বরে চিৎকার করে উঠল বুড়ো খাপেগা, আসাদের সদ্দারটার নাম জানা দরকার। লড়াই বাধলে তার কাছে লোক পাঠাতে হবে।
ওঙলে বলল, সারুয়ামারু মোরাঙে আসেনি।
আচ্ছা থাক, কাল সকালেই তার কাছ থেকে জেনে নেব।
আচমকা সেঙাই চেঁচিয়ে উঠল, নামটা মনে পড়েছে সে সদ্দার–গান্ধিজি। সে লড়াই বাধিয়ে দিয়েছে সায়েবদের সঙ্গে।
হু-হু, সাবাস দিতে হয় নোকটাকে। আমরা পাহাড়ী মানুষগুলো হুই সায়েবদের সঙ্গে এখনও লড়াই বাধাই নি। আর আসারা বাধিয়ে দিলে! আপশোশে হা-হুঁতাশ করতে লাগল বুড়ো খাপেগা।
আমরাও বাধিয়েছি। হু-হু। গম্ভীর গলায় সেঙাই বলল।
আমরা আবার কবে বাধালাম! বিস্ময়ে বুড়ো খাপেগার গলাটা কেমন যেন শোনায়।
হু-হু, রানী গাইডিলিও বাধিয়ে দিয়েছে। আমাদের বস্তিতে সে আসবে বলেছে। নতুন বিস্ময়কর একটা খবর দিয়ে, সেঙাই বলতে লাগল, আমি নিজেও আসতে বলেছি রানীকে। ঠিক করিনি? তুই আবার রাগ করে বর্শা হাঁকড়াবি না তো সদ্দার?
আরে, না না। এই কদিন শহরে থেকে তোর মগজটা একেবারে খুলে গেছে রে সেঙাই। যাক, অ্যাদ্দিনে রানীকে দেখা যাবে। ওর ছোঁয়ায় নাকি সব ব্যারাম সেরে যায়।
হু-হু। এই দ্যাখ না, আমাকে আর সারুয়ামারুকে কী মার দিলে সায়েবের লোকেরা। সারা গা ফেটে রক্তে মাখামাখি হয়েছিল। হুঁশ ছিল না। রানীই আমাদের বাঁচাল। তার ছোঁয়াতেই তো সেরে গেলাম। হু-হু–অসীম কৃতজ্ঞতায় সেঙাইর মনটা ভরে গেল।
বুড়ো খাপেগা বলল, রানী গাইডিলিও যখন সায়েবদের সঙ্গে লড়াই বাধিয়েছে তখন আমরা তার দলে। তোদের দুজনকে সে বাঁচিয়ে দিয়েছে; তার হয়েই আমরা লড়ব। হুই সায়েবরা পাহাড়ী জোয়ানদের ফুসলে পর করে দিচ্ছে। আমাদের সিজিটোটাকে কেমন বদলে দিয়েছে। সে আর বস্তিতেই ফেরে না। হুই সায়েবরা হল এক-একটা আনিজা, এক-একটা ডাইনি। একটু থেমে একদলা থুতু সামনের অগ্নিকুণ্ডটার দিকে ছুঁড়ে আবার সে বলল, আমাদের বস্তিতে রানী গাইডিলিও আসবে। কাল থেকে বর্শা, সুচেন্যু আর তীর-ধনুক বানাতে শুরু করে দে তোরা।
হো-ও-ও-ও-আ-আ–জোয়ানদের গলায় ঝড়। আসন্ন একটা লড়াইয়ের সূচনা। নাগা পাহাড়ের শিখরে শিখরে আছাড় খেতে খেতে তাদের হুঙ্কার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল। বাইরে যে অসহ্য রাত্রি স্তব্ধ হয়ে রয়েছে, তার হৃৎপিণ্ড শিউরে উঠল, চমকে উঠল।
.
৩৮.
ডাইনি নাকপোলিবার গুহা।
এখান থেকে দক্ষিণ পাহাড়ের ঢালু উপত্যকাটা অনেক নিচে নেমে সমতল হয়ে গিয়েছে। ওদিকে টিজু নদীর বাঁকা রেখাটা একটা নীল ঝিলিকের মতো দেখায়। খানিকটা হালকা সাদা কুয়াশা পাহাড়ের চূড়া ঘিরে ঝুলছে। চারপাশে তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠছে আউ পাখির ঝাক। খাসেম বনে ধারাল ঠোঁট দিয়ে ঠকঠক শব্দ করছে খারিমা পতঙ্গের দল। নাকপোলিবার গুহা থেকে যতদূর নজর ছড়ানো যায়, শুধু একটানা অবাধ এবং উদ্দাম বন। সেই বনে পৃথিবীর প্রাণশক্তির আদিম শ্যামায়িত প্রকাশ।
নাকপোলিবার গুহা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পাহাড়ী জনপদগুলি গড়ে উঠেছে।
একটু একটু করে অন্ধকার সরে যাচ্ছে। পুবের আকাশটা আবছা দেখাতে লাগল। সামনের বনভূমি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
গুহার মধ্যে চুপচাপ বসে রয়েছে দু’টি উলঙ্গ নারীদেহ। ডাইনি নাকপোলিবা আর সালুনারু। দুজোড়া চোখ সামনের দিকে পলকহীন তাকিয়ে রয়েছে।
পাথরের ভাঁজে ভাঁজে রক্তাভ আগুনের আভাস। একপাশে একটা অগ্নিকুণ্ড। সেটাতে খাটসঙ কাঠ পুড়ছে। রহস্যময় আলো ছড়িয়ে রয়েছে গুহার মধ্যে।
ডাইনি নাকপোলিবা শীর্ণ শরীরটাকে ঘষতে ঘষতে সালুনারুর কাছাকাছি টেনে আনল। এর মধ্যে সালুনারুর সমস্ত দেহে, গলায়, বুকে, পেটে, জানুতে, আরেলা পাতার রস দিয়ে অজস্র উল্কি আঁকা হয়েছে। পৃথিবীর আদিম শিল্প। কঙ্কাল, বুনো মোষের মাথা, বাঘের থাবা এবং বানরের চোখের ছবি।
সালুনারুর বুকের ওপর একটা কঙ্কালসার হাত বিছিয়ে দিল ডাইনি নাকপোলিবা। কিছুদিন আগে হলেও আতঙ্কে হৃৎপিণ্ডটা ধক করে উঠত সালুনারুর। কিন্তু এর মধ্যে দেহে মনে অনেকখানি সাহস সঞ্চয় করে নিয়েছে সে।
নিদাঁত দুটো মাড়ি খিঁচিয়ে নাকপালি বলল, এই কদিনে তুই সব মন্ত্রতন্ত্র শিখে নিলি। মাগী-মরদ বশ করার মন্ত্র। বুকের রক্ত জল করার মন্ত্র। আনিজা ডাকার মন্ত্র। ভূমিকম্প থামানোর মন্ত্র। ঝড়তুফান ডাকার মন্ত্র। বাঘ আর বুনো মোষ পোষ মানাবার মন্ত্র। বৃষ্টি থামাবার, বৃষ্টি নামাবার মন্ত্র। পাহাড়ের ধস থামাবার মন্ত্র। রক্ত বমি করাবার মন্ত্র। মাগীদের বিয়োবার সময় আসান্যু দেবার মন্ত্র।
