পাহাড়ী মনের উত্তেজনা। যে-কোনো মুহূর্তে যে-কোনো ঘটনায়, যে-কোনো কথায় দপ করে জ্বলে উঠতে পারে। কেলুরি গ্রামের এই মোরাঙে সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেত পারত। বর্শা নিয়ে দুদলে ভাগ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল জোয়ান ছেলেরা। কিন্তু তার আগেই মোরাঙের মধ্যে ঢুকে পড়ল বুড়ো খাপেগা।
খাপেগা হুমকে উঠল, এই শয়তানের বাচ্চারা, মোরাঙের ভেতর চিল্লাচিল্লি বাধিয়েছিস কেন? ঘোলাটে দৃষ্টিতে সকলকে দেখতে দেখতে চেঁচামেচির কারণটা খুঁজতে লাগল সে, কী হয়েছে? কী ব্যাপার?
ইজা হুবুতা! দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বিকট ভঙ্গি করল সেঙাই, হবে আবার কী? ওঙলেটাকে আমি খুন করব।
ওপাশ থেকে ওঙলের গলায় একই দাবি শোনা গেল, সেঙাইটাকে সাবাড় করব।
জানিস, এটা হল মোরাঙ। এখানে খুনখারাপির কথা হলে আনিজার গোসা এসে পড়ে। বেশি ফ্যাকর ফ্যাকর করলে দুটোকেই বর্শা দিয়ে কুঁড়ব। বুড়ো খাপেগা গর্জাতে লাগল।
কনুই দিয়ে গুতিয়ে পথ করে খাপেগার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল সেঙাই। বলল, হুই ওঙলেটা রানী গাইডিলিকেও আমার পিরিতের মেয়ে বলল। ওকে বর্শা হাঁকাব না? তুই একবার হুকুম দে সদ্দার।
ক্ষয়া, বদখত কয়েকটা দাঁত কড়মড় শব্দ করে বেজে উঠল। রক্তচোখে তাকাল বুড়ো খাপেগা, হু-হু, তাতে কী হয়েছে সেঙাই? গাইডিলিওকে তোর পিরিতের জোয়ানী বলতে অমন করে রুখে উঠলি কেন?
জানিস সদ্দার, হুই গাইডিলিও হল এই নাগা পাহাড়ের রানী। ওর দিকে তাকালে পিরিতের কথা মনে আসে না। কোহিমায় যখন আসান্যুরা আমাকে মারল তখন হুই গাইডিলিও আমাকে বাঁচাল। এই পাহাড়ের সব ব্যারামী মানুষ তার ছোঁয়ায় বেঁচে ওঠে। তার ইজ্জত নিয়ে কথা বলব, এমন খারাপ আমি না। একটু একটু করে সম্ভ্রম এবং অস্ফুট মনের সবটুকু আনুগত্য মিশিয়ে কোহিমা পাহাড়ের, রানী গাইডিলিওর, মাধোলাল ও পাদ্রী সাহেবদের গল্প নতুন করে বলল সেঙাই।
সব শুনে বুড়ো খাপেগা বলল, খবদ্দার ওঙলে, গাইডিলিও রানীকে নিয়ে আর কোনোদিন পিরিতের কথা বলবি না। বললে মাথা কেটে মোরাঙে ঝোলাব।
একটু পরে সকলে ফের বসে পড়ল।
সেঙাই-বলল, জানিস সলার, দুই সায়েরা মোটেও ভালো না।
কেন? কী করে বুঝলি? তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল বুড়ো খাপেগা।
ওদের জন্যেই তো আমাকে আর সারুয়ামারুকে মারল আসান্যুরা। তা ছাড়া মাথোলাল বললে, রানী গাইডিলিও বললে, হুই সায়েবরা অনেক দূর দেশ থেকে এসে আমাদের এখানে সদ্দারি করে চলেছে।
খানিক আগে মোরাঙের মধ্যে যে উত্তেজনা ছিল, এখন আর তা নেই। নতুন গল্পের নেশায় জোয়ানেরা আবার মেতে উঠেছে।
আচমকা বুড়ো খাপেগা চিৎকার করে উঠল, তোর বাপ সিজিটোটাকে আমি আগেই বলেছিলাম, সায়েবরা নোক ভালো নয়। শয়তানেরা এখানে সদ্দারি ফলাচ্ছে। সিধে কথা, হুই সব আমাদের পাহাড়ে চলবে না। পাথরের চাই মেরে মেরে সায়েবদের শেষ করব। একটু থেমে খাপেগা আবার বলল, তোকে মেরেছে, না রে সেঙাই?
হু-হু, এমন মেরেছে, হুঁশ ছিল না। হুই গাইডিলিও রানী আমাকে বাঁচিয়ে দিল। ও না থাকলে বস্তিতে আর ফিরে আসতে হত না।
বুড়ো খাপেগা হুঙ্কার ছাড়ল, তোকে মেরেছে সায়েরা! হুই সায়েবদের দশটা মাথা চাই। এর বদলা নিতে হবে। অনেক দিন বড় রকমের লড়াই বাধছে না। হাতটা নিশপিশ করছে। শয়তানদের মুণ্ডু এনে মোরাঙের সামনে বর্শার মাথায় গেঁথে রাখব। রক্ত দিয়ে দেয়াল চিত্তির করব। বুড়ো বয়েসে রক্তটা ঝিমিয়ে এসেছিল। আবার তাতে আগুন ধরে গেছে। মনে মনে ফের লড়াইয়ের তাগিদ পাচ্ছি রে সেঙাই। বলতে বলতে বুড়ো খাপেগা একটু থামল। দৃষ্টিটাকে মোরাঙের চালের ফোকর দিয়ে ঝাপসা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিল। তার ঘোলাটে চোখের সামনে যেন এই পাহাড় কিংবা জনপদ নেই। এই বনময় উপত্যকা, চড়াই-উতরাইয়ে দোল খাওয়া পাহাড়ী পৃথিবীর এক ভয়াল অতীতে সে ফিরে গেল। কেলুরি গ্রামের অতীত কাল সে। আবেগ-ভরা গলায় ফের পুরনো দিনের গল্প শুরু করল, এই পাহাড় থেকে সেসব দিন চলে যাচ্ছে রে। লড়াই বাধত অঙ্গামীদের সঙ্গে, কোনিয়াকদের সঙ্গে, সাঙটামদের সঙ্গে। পাহাড়ের মাথা আর টিজু নদী রক্তে লাল হয়ে যেত। সেই দিনকাল আর নেই, সেসব রেওয়াজও উঠে যাচ্ছে। আগে শরদের দুটো মাথা কেটে না আনলে জোয়ান ছেলেরা বিয়ের জন্যে মেয়ে পেত না। সেবার তো অঙ্গামীদের সঙ্গে লড়াই বাধল। শোন তবে সে গল্প।
ফেলে-আসা দিনগুলোর নানা তাজ্জব কাহিনী শুরু হল। সে কাহিনী পাহাড়ী মানুষের হৃৎপিণ্ড-ছেঁড়া রক্তে সিক্ত। বুড়ো খাপেগা বলতে লাগল, দক্ষিণ পাহাড়ের হুই দিকে অঙ্গামীদের বস্তি সাঞ্জুবট। একবার হল কি, ওদের এক পাল গরু এসে আমাদের সিঁড়িখেত থেকে পাকা ধান খেয়ে গেল। তখন আমার জোয়ান বয়েস। মোরাঙে বসে অন্য জোয়ানদের সঙ্গে জটলা করছিলাম। আমাদের বস্তির সদ্দার ছিল সিজিটোর ঠাকুরদা। সে বলল, ওদের গরু আমাদের ধান খেয়েছে। সাবট বস্তি থেকে দুটো মাথা কেটে আনতে হবে। অঙ্গামীদের বস্তিতে গিয়ে দেখি, একটা ঘরে শয়তানের বাচ্চারা মড়ার মতো ঘুমুচ্ছে। একটুও শব্দ করলাম না। সুচেন্যু দিয়ে কুপিয়ে চারটে মাথা চুলের ঝুঁটি ধরে নিয়ে এলাম। সদ্দার আমাকে খুব সাবাস। দিলে, রোহি মধু দিলে, কুকুরের মাংসের কাবাব দিলে গরম গরম, আর সেই সঙ্গে তার সুন্দর মেয়েটাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিলে। আমার বিয়ে তো হল। তার দিনকতক বাদেই নড্রিলোদের বাড়ি থেকে মড়াকান্না উঠল। রাত্তিরবেলা অঙ্গামীরা তাদের সাতটা মাথা নিয়ে গেছে। শোধ তুললাম দুবছর বাদে অঙ্গামীদের কুড়িটা মাথা এনে। এককুড়ি মাথার শোধ এখনও ওরা তুলতে পারেনি। কত বছর পার হল, অত হিসেব আর মনে নেই। তখন কাঁচা জোয়ান ছিলাম, এখন বুড়ো হয়েছি। যাক সে কথা। অঙ্গামী শয়তানেরা এখনও তাকে তাকে রয়েছে। বাগে পেলে ভীষণ বিপদ। খুব সাবধান।
