হো হো করে হেসে উঠল এটোঙা। বলল, তোরা সব এক একটা টেফঙের বাচ্চা। মগজে যদি একটু বুদ্ধিও তোদের থাকত! আমাকে মেরে ফেললে গাঁয়ে ফিরে এলুম কী করে?
হু-হু, ঠিক বলেছিস। মগজটা তোর খাসা। তারপর কী হল, তাই বল। সালুয়ালা গ্রামের সর্দার আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল। আমেজী গলায় বলল, গল্পটা বেড়ে জমেছে রে এটোঙা। অঙ্গামীরা তোকে যে এমন করে খুঁড়েছে তা তো জানতাম না। আমরাও তোকে খুঁড়তে গিয়েছিলাম। অঙ্গামী মাগীটাকে নিয়ে লুকিয়ে ছিলি, খুব রাগ হয়েছিল। তুই আমাদের বক্তির ছেলে। তোকে আমরা যা খুশি করব। মারব, কুঁড়ব, দরকার হলে সাবাড় করব। তাই বলে ভিন জাতের শয়তানেরা কোপাবে? টেমে নটুঙ! নাঃ, এর শোধ তুলতেই হবে। সাঞ্জুবট বস্তি থেকে তিনটে অঙ্গামীর মুড়ো চাই। হু-হু–উত্তেজনায় বুড়ো সর্দারের দেহটা থরথর কাঁপছে। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আগুনের ফুলকি ফুটছে।
হো-ও-ও-ও-আ-আ–অঙ্গামীদের তিনটে মুণ্ডু চাই। চারপাশ থেকে জোয়ান-জোয়ানীরা হট্টগোল করতে লাগল।
থাম এবার। এটোঙা বলতে শুরু করল, পুরোপুরি বেহুশ হয়ে গিয়েছিলাম। যখন জ্ঞান ফিরল, দেখি কোহিমায় শুয়ে আছি। চারপাশে সাদা সাদা অনেক মানুষ। পরে জেনেছিলাম, ওরা সায়েব। সারা গা কেটে কুটে একশা হয়ে গিয়েছিল। দিনকয়েক পর সায়েরা আমাকে ইম্ফলে চালান করে দিল। সেখানে চার বছর কাটিয়ে আজ বস্তিতে ফিরছি। একটু থেমে আবার বলল, অঙ্গামীরা আমাকে সায়েবদের হাতে তুলে দিয়েছিল, বলেছিল, আমি ওদের মেয়ের ইজ্জত নিয়েছি।
ইম্ফলে কোথায় ছিলি? সমস্বরে সকলে জিগ্যেস করল।
জেলখানায়। সারি সারি ঘর। সেখানে একটা মণিপুরী চোর ছিল। তার কাছে ছবি আঁকাটা ভালো করে শিখে এসেছি।
বুড়ো সর্দার বলল, জেলখানা কাকে বলে? সেখানে মানুষ থাকে কেন?
হুই সায়েবরা জেলখানা বানিয়েছে। চুরি করলে, খুন করলে, মেয়েমানুষের ইজ্জত নিলে হুইখানে আটক করে রাখে সায়েবরা। ভারি মজার জায়গা। জেলখানার গল্প আর একদিন বলব। চারপাশে একবার নজর বুলিয়ে নিল এটোঙা। বলল, কি রে সদ্দার, আমার বাপ-মা মরেছে, কেসুঙটাও লোপাট হয়েছে। তাই না?
হু-হু–মাথা ঝাঁকিয়ে জানালো বুড়ো সর্দার।
আমি তবে যাই।
কোথায় যাবি?
হুই দক্ষিণ পাহাড়ের মাথায়। দেখি, যদি হ্যাজাওকে পাই। চার চারটে বছর ওর সঙ্গে দেখা নেই। ওর পেটে আমার বাচ্চা ছিল। নিশ্চয়ই সে বাচ্চাটা অ্যাদ্দিনে বড়সড় হয়েছে। বলতে বলতে পা বাড়িয়ে দিল এটোঙা। পাহাড়ী মানুষগুলোকে অবাক করে দিয়ে টুপি-প্যান্ট-জুতো পরা এই অদ্ভুত মানুষটা সামনের উপত্যকায় অদৃশ্য হয়ে গেল। চার বছর আগের সেই জানাশোনা পাহাড়ী ছেলে কী এক ভোজবাজিতে দুর্বোধ্য এবং রহস্যময় হয়ে গিয়েছে। বুনো মানুষগুলো ভাবতে ভাবতে দিশেহারা হয়ে যেতে লাগল।
.
৩৭.
মোরাঙের মধ্যে একখানা তিনকোনা পাথরের ওপর বসে গল্প বলছে সেঙাই। কোহিমা শহরের গল্প, পাদ্রী ম্যাকেঞ্জি এবং পিয়ার্সনের গল্প। মাথোলালের গল্প, রানী গাইডিলিওর গল্প। অস্ফুট পাহাড়ী মনের সবটুকু কৌতুক এবং ব্যঙ্গ মিশিয়ে মিশিয়ে সেই গল্পকে রীতিমতো সরস করে তুলেছে সেঙাই। কখনও বিভীষিকার রং মিশিয়ে ভয়ানক করছে।
বুড়ো খাপেগা এখনও মোরাঙে আসেনি। পাহাড়ী জোয়ানেরা গল্পের মৌতাতে কুঁদ হয়ে সেঙাই-এর চারপাশে গোল হয়ে বসেছে। মাঝে মাঝে চুক চুক শব্দ করে রোহি মধু খাচ্ছে। অদ্ভুত, বিস্ময়কর সব কাহিনী। এমন গল্প এর আগে তারা কোনোদিনই শোনে নি। শুনতে শুনতে তাদের তামাটে মুখগুলোর ওপর দিয়ে কখনও কষ্টের ভঙ্গি ফুটে উঠছে। কখনও কপিশ চোখগুলো করুণ দেখাচ্ছে। কখনও ক্রুদ্ধ পেশীগুলো ফুলে ফুলে উঠছে। হাতের থাবাগুলো কঠিন হচ্ছে। আবার খুশিতে পাথুরে মুখে হাসি ফুটছে।
দু’দিকে পেন্য কাঠের মশাল জ্বলছে। বাইরের উপত্যকায় রাত্রি একটু একটু করে ঘন হচ্ছে। বাতাসে এখনও শীতের দাপট মিশে রয়েছে। চড়াই-উতরাই-এর ওপর দিয়ে জঙ্গলের মাথাগুলো এলোপাথাড়ি ঝাঁকিয়ে দিয়ে হু-হু–বাতাস ছুটছে। আছড়ে পড়ছে দূরের, আরো দূরের বনভূমিতে।
এখন সাঙসু ঋতুর শেষের দিক। কিছুদিন পরেই ঝুম আবাদের পার্বণ শুরু হবে। আসবে মরশুমি খেয়ালখুশির দিন।
সেঙাই-এর ডানপাশের মাচান থেকে ওঙলে বলল, হুই যে গাইডিলিওর কথা বললি–বেশ খাসা মেয়ে, না?
হু-হু–মাথা নেড়ে সায় দিল সেঙাই।
দেখতে কেমন?
খুব সুন্দর।
পিরিত টিরিত জমিয়ে এসেছিস নাকি রে? কোহিমায় গিয়ে আরো একটা ভালোবাসার জোয়ানী বাগিয়ে ফেললি? লোভর্ত, কুতকুতে চোখে পিটপিট করে তাকাতে লাগল ওঙলে।
কী বললি! আহে ভু টেলো! সেঙাই গর্জে উঠল, জানে খতম করে ফেলব তোকে। গাইডিলিওকে পিরিতের জোয়ানী বলছিস! জানিস, সে হল এই পাহাড়ের রানী। শয়তানের বাচ্চা–পাশ থেকে ধাঁ করে একটা বর্শা তুলে নিল সেঙাই। বলল, গাইডিলিওর ইজ্জত তুলে কথা বলছিস ধাড়ি টেফঙ!
মুহূর্তে মোরাঙের মধ্যে গল্পের আমেজটা ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে গেল। একটা খণ্ডযুদ্ধের সূচনা। ওপাশ থেকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছে ওঙলে। রক্তারক্তি করার উৎসাহে তার শিরাস্নায়ুগুলোও চনচন করে উঠেছে।
ঘটনার আকস্মিকতায় চারপাশের জোয়ানেরা হতবাক হয়ে গিয়েছে। কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র। চকিতে সকলে লাফিয়ে উঠল। তারপর মোরাঙ ফাটিয়ে হল্লা করতে লাগল, হো-ও-ও-ও-আ-আ–
