এটোঙা লুটিয়ে পড়েছিল। তার কণ্ঠার হাড়ের ফাঁকে খারে বর্শাটা বঁড়শির মতো আটকে রয়েছে।
আশ্চর্য! এতটুকু চিৎকার করে ওঠেনি হ্যাজাও। যে হাত দুটো দিয়ে তাকে ঘিরে রেখেছিল এটোঙা, বর্শামুখ থেকে বাঁচাচ্ছিল, সে দুটোও শিথিল হয়ে ঝুলে পড়েছে। সেদিকে বিন্দুমাত্র ক্ষেপ নেই। আচমকা ধক করে চোখ জ্বলে উঠেছে তার। পাশ থেকে একটা ধারাল সুচেন্যু হাতে তুলে নিয়েছিল হ্যাজাও। সুচের ফলাটা কী ভয়ানক! কী নিষ্ঠুর!
হ্যাজাও কিছু ভাবছিল। পাহাড়ী মানুষের ভাবনা সুষ্ঠু কিংবা শৃঙ্খলাবদ্ধ নয়। হ্যাজাওর তখনকার ভাবনাগুলি গুছিয়ে নিলে মোটামুটি এইরকম দাঁড়ায়। তার দেহের রক্তে-মাংসে একটি প্রাণকণা আলোড়ন তুলেছে। সেই প্রাণকে যে উপহার দিয়েছে, তার যৌবনকে যে প্রথম মাতৃত্ব দিয়েছে, সেই এটোঙাকে তার বাপ বর্শা দিয়ে খুঁড়েছে। হোক তার বাপ, তবু প্রতিশোধ চাই। নির্মম প্রতিশোধ। একটা জখমী বাঘিনীর মতো ফুঁসে ফুঁসে উঠছিল হ্যাজাও।
হাঃ-হাঃ-হাঃ–অঙ্গামী সর্দারের অট্টহাসি এবার আরো ভীষণ হয়ে উঠেছে। সেই হাসি উপত্যকা এবং চড়াই-উতরাইতে আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে টিজু নদীর দিকে মিলিয়ে গিয়েছিল, আমি হলাম অঙ্গামী সদ্দার। হু-হু, লোহটাদের সঙ্গে, সাঙটামদের সঙ্গে, ডাফলাদের সঙ্গে কত লড়াই আমি করেছি। আর আমার মেয়ে হুই শয়তানের বাচ্চাটা আমাকেই কোপাতে চায় সুচেন্যু দিয়ে! হাঃ-হাঃ-হাঃ–হাসতে হাসতেই সে ফের বর্শা ছুঁড়েদিল। এবার তার সঙ্গে হ্যাজাও।
বর্শার লম্বা বাজুদুটো বাইরে বেরিয়ে ছিল। সে দুটো ধরে অঙ্গামী জোয়ানেরা হেঁচড়ে হেঁচড়ে হ্যাজাও এবং এটোঙাকে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে বার করে এনেছিল। এটোঙার কণ্ঠার ফাঁকে আর হ্যাজাওর পাঁজরায় বাঁকা বঁড়শির মতো ফলা দুটো গাঁথা রয়েছে। দেহ রক্তে মাখামাখি। দুজনেরই জ্ঞান নেই। কিছুই শুনতে, বুঝতে বা দেখতে পাচ্ছিল না তারা।
অঙ্গামী সর্দার আবার আকাশ ফাটিয়ে হেসে উঠেছে। সাফল্যে উল্লাসে তার অস্ফুট বুনো মনটা উন্মাদ হয়ে গিয়েছে। সাত-সাতটা মাস ধরে যে শিকার দুটোর খোঁজে হিংস্র জানোয়ারের মতো পাহাড়ে পাহাড়ে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে, এইমাত্র তাদের অব্যর্থ লক্ষ্যভেদে যুঁড়তে পেরেছে।
অঙ্গামী সর্দার বলল, শয়তানের বাচ্চা, রেঙমা হয়ে অঙ্গামী মাগীর দিকে নজর দেয়। এই পাপ রাখব না। দুটোকেই সাবাড় করব।
না না, জানে মারিস না রে সদ্দার। সায়েবরা বারণ করে দিয়েছে। রেঙমা শয়তানটাকে ধরে সায়েবদের হাতে তুলে দেব। তারাই ওটাকে সাবাড় করবে। পাশ থেকে একটা জোয়ান ছেলে বলেছিল।
এতক্ষণ নিষ্পলক হ্যাজাওর সমস্ত দেহে তন্ন তন্ন করে কী যেন খুঁজছিল অঙ্গামী সর্দার। এবার সে হুঙ্কার দিয়ে উঠেছে, দ্যাখ দ্যাখ, হুই রেঙমা শয়তানটা আমার মেয়েটার পেটে বাচ্চা বানিয়েছে। খুনই করে ফেলে দিই। হু-হু–উত্তেজনায় রাগে রোষে একটা লোহার মেরিকেতসু ধাঁ করে এটোঙার মাথার ওপর তুলে ধরেছিল অঙ্গামী সর্দার। সঙ্গে সঙ্গে পাশের জোয়ান ছেলেটা হাতিয়ারসহ তার হাতটা ধরে ফেলেছে।
জোয়ান ছেলেটা বলেছিল, কী করছিস সদ্দার! জানিস না, মানুষ খুন করার জন্যে সায়েবরা সেদিন ইমপাঙ বস্তি থেকে দশটা পাহাড়ীকে ধরে নিয়ে গেছে। খবদ্দার ওকে মারিস না। তার চেয়ে ওকে বস্তিতে নিয়ে চল।
রক্তাভ, রুষ্ট চোখে জোয়ান ছেলেটির দিকে তাকিয়েছে অঙ্গামী সর্দার। লাল লাল দাঁতগুলো খিঁচিয়ে বদখত মুখভঙ্গি করে গর্জে উঠেছে, ইজা হুবুতা! নে, শয়তান দুটোকে টানতে টানতে বস্তিতে নিয়ে চল।বলতে বলতে উদ্যত মেরিকেতসুটা একান্ত অনিচ্ছায় নামিয়ে ফেলেছিল অঙ্গামী সর্দার।
কণ্ঠার হাডের ফাঁকে বাঁকা বঁড়শির মতো বর্শার ফলা। বাজু ধরে টানতে টানতে ঢালু উপত্যকার দিকে দৌড়তে শুরু করেছিল অঙ্গামী জোয়ানেরা। দুটো দেহ, দুটো পাহাড়ী প্রেম–হ্যাজাও এবং এটোঙা, বর্শার ফলায় বিদ্ধ হয়ে কর্কশ পাথুরে পথে আছাড় খেতে খেতে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল। সকলের আগে আগে বিরাট একটা বল্লম আকাশের দিকে বাগিয়ে ধরে সদর্পে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল অঙ্গামী সর্দার।
বিদ্রোহী পাহাড়ী প্রেম। এই পার্বতী পৃথিবীর মতোই আদিম। ভয়ঙ্কর এবং দুর্বার। এ প্রেম সমাজের শাসন, শান্তি এবং বিধান মানে না। এ প্রেম বর্শার ফলা কিংবা কোনোরকম প্রতিকূলতাকে পরোয়া করে না। রেঙমা এবং অঙ্গামী–এটোঙা আর হ্যাজাও নামে দুটো বুনো প্রেম সমাজের সমস্ত অনুশাসন উপেক্ষা করে দক্ষিণ পাহাড়ের সুড়ঙ্গে সংসার পেতেছিল। দুটো মানুষ-মানুষীর হৃদয়ের উত্তাপে সে সংসার বড় মধুময়। পরস্পরের ওপর নির্ভরতায় সে সংসার বড় সুন্দর।
কিন্তু পাহাড়ী পৃথিবী এবং তার সমাজ বড় নির্মম, বড় নিষ্ঠুর। সেখানে একটুকু ক্ষমা, বিন্দুমাত্র করুণা আশা করা যায় না। এইমাত্র একটা অসামাজিক এবং অসঙ্গত পিরিতকে হত্যা করে, সুড়ঙ্গ-গর্ভের সুখী অথচ অবৈধ দম্পতির সংসারকে একপাল দাঁতাল শুয়োরের মতো ছিন্নভিন্ন করে উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল এই পাহাড়, এই পাহাড়ের ভয়াবহ বিচারবোধ।…..
তারপর কী হল? অঙ্গামীরা তোকে সাবাড় করে ফেললে! চারপাশে জোয়ান ছেলেমেয়েরা রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে ছিল। এটোঙা থামলে সকলে সমস্বরে জিগ্যেস করল। সিঁড়িখেতে কেউ নেই। সবাই এটোঙাকে ঘিরে ধরেছে। এমনকি শিকারি কুকুর এবং পোষা শুয়োরগুলো পর্যন্ত খাদ্যের সন্ধান ছেড়ে ভিড় জমিয়েছে।
