অনেকদিন তুই পাথরের গায়ে দাগ কাটিস না এটোঙা। তোর দাগগুলো কিন্তু ভারি সুন্দর। সাঙস ঋতুর এক সকালে এটোঙাকে জড়িয়ে সোহাগ করতে করতে হ্যাজাও বলেছিল।
কেমন করে দাগ কাটব? তুই তো আমাকে এই সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে বেরুতেই দিস না।
হু, বেরুতে দিলে কেউ যদি তোকে সাবাড় করে। এখন ও-সব দাগ কাটা থাক; মেয়েটা। বিইয়ে নিই। তখন এই পাহাড় থেকে অন্য কোথাও চলে যাব। সেখানে যত পারিস দাগ কাটাকাটি করিস।
হু-হু, ঠিক বলেছিস। একটুক্ষণ নীরব থেকে আচমকা উৎসাহিত হয়ে উঠেছে এটোঙা, দ্যাখ হ্যাজাও, আমি একটা কথা ভাবছি। পাথর খুদে খুদে আমাদের বাচ্চাটাকে ফুটিয়ে তুলব। আমার কাছে একটা চোখা লোহা আছে। সেটা দিয়েই খোদাই করব।
হু-হু, খুব ভালো হবে। এটোঙার বুকের কাছে আরো নিবিড় হয়ে বসেছে হ্যাজাও।
ভালো হবে! ইজা হুবতা! সুড়ঙ্গমুখের সামনে হঠাৎ একটা গর্জন শোনা গিয়েছিল। সে গর্জনে মনে হয়েছে, এই পাহাড়টা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
সুড়ঙ্গের মধ্যে শিউরে উঠেছে হ্যাজাও। চমকে উঠেছে এটোঙা। তারপর দু’টি বিদ্রোহী পাহাড়ী প্রেম পরস্পরের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। তাদের শিরায় শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছিল। ভয়ে আতঙ্কে তখন দুজনেই কাঁপছে।
ফিসফিস গলায় এটোঙা জিগ্যেস করেছে, কি রে হ্যাজাও, ব্যাপারটা কী? আনিজার গলা নাকি?
বেশি ফ্যাকর ফ্যাকর করিস না শয়তান। ভাবগতিক বুঝতে দে। সুড়ঙ্গমুখের দিকে চোখ রেখে উৎকর্ণ হয়ে ছিল হ্যাজাও।
এবার অনেক গলায় শোরগোল শোনা যাচ্ছিল। প্রচণ্ড হইচই। উদ্দাম, বিশৃঙ্খল, ভয়ানক চিৎকার।
সামনের দিকে বিরাট একখণ্ড পাথর দিয়ে সুড়ঙ্গের মুখটা আটকানো। ভেতরে পেন্যু কাঠের মশাল জ্বলছে। অদ্ভুত রহস্যময় আলো পাথরের ভাঁজে ভাঁজে অস্থিরভাবে নড়ছে। হ্যাজাও এবং এটোঙার ছায়া সঙ্কীর্ণ, দম-চাপা সুড়ঙ্গে কাঁপছে।
মনে হচ্ছিল, পাহাড়ে ধস নামতে শুরু করেছে। সুড়ঙ্গমুখের কাছে গোলমাল আরো বেড়ে গিয়েছে।
হু-হু, সদ্দার, এই সুড়ঙ্গটার মধ্যেই দুটোতে রয়েছে। একটু আগে ওদের গলা শুনছিলাম।
রামখোর বাচ্চা! ভীষণ গর্জন শোনা গিয়েছিল এবার। সুড়ঙ্গের মধ্যে আতঙ্কে আশঙ্কায় বুকটা ছমছম করে উঠেছে হ্যাজাওর। এ গলা তার অত্যন্ত পরিচিত। এ গলা অঙ্গামী সর্দারের–তার বাপের।
বাপের চেহারাটা একবার ভাবার চেষ্টা করেছিল হ্যাজাও। চওড়া পুরু থাবায় লম্বা বর্শা। মোষের শিঙের মুকুটে আউ পাখির পালক গোঁজা। কোমর থেকে জানু পর্যন্ত ঢোলা আরি পী কাপড় ছাড়া সারা দেহে আর কিছু নেই। লাল লাল অসমান দাঁতের সারি। গলায় বুনো বাঘের গর্জন। কোমর থেকে বাঁশের খাপে ধারাল সুচেন্যু ঝুলছে। দুটো ঘোলাটে চোখ সব সময় জ্বলে। এই তার বাপ। না না, একটা মারাত্মক আনিজা!
সেই আনিজার গলা আবার হুমকে উঠেছিল। সুড়ঙ্গের ভেতর থেকেও পরিষ্কার বুঝতে পারা যাচ্ছিল, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে অঙ্গামী সর্দার চেঁচাচ্ছে, সুড়ঙ্গের মধ্যে থাকলে টেনে বার কর।
না, টেনে নয়, বর্শা দিয়ে শয়তান দুটোকে ছুঁড়ে বার কর। সাত মাস ধরে ওদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। এই পাপ আর সইব না।
হ্যাজাও আর এটোঙার হৃৎপিণ্ড ধক করে উঠেই থেমে গিয়েছে যেন। ততক্ষণে সুড়ঙ্গমুখ। থেকে পাথরের ঢাকনাটা সরিয়ে দিয়েছিল বাইরের মানুষগুলো। খানিকটা আবছা ফ্যাকাসে আলো এসে পড়েছিল গুহার ভেতর।
অঙ্গামীরা হিংস্র গলায় হট্টগোল করছিল। সাত-সাতটা মাস দক্ষিণ পাহাড়ের অন্ধিসন্ধি। তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাত্তা পায়নি। এতদিন পর বর্শার সীমানায় হ্যাজাও এবং এটোঙা নামে দুটো শিকারকে পেয়ে গিয়েছে তারা। আজ তাদের উল্লাসের দিন বৈকি।
হুই, হুই শয়তান দুটো জড়াজড়ি করে বসে রয়েছে।
রামখোর বাচ্চাদের খুঁড়ে ফেল তোরা। অঙ্গামী সর্দার হুমকে উঠেছিল।
সুড়ঙ্গের মধ্যে সেই আবছা, ঘেঁড়া-ছেঁড়া অন্ধকারে, ভয়ে আতঙ্কে সমস্ত শরীরটাকে দলা পাকিয়ে এটোঙার বুকের মধ্যে খুঁজে রেখেছিল হ্যাজাও। নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল। আর দুটো কঠিন হাত দিয়ে হ্যাজাওর দেহটাকে ঘিরে, বর্শার তীক্ষ্ণ ফলা থেকে আড়াল করে নির্নিমেষ সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল এটোঙা।
এটোঙার বুকের মধ্যে নিজের শরীরটাকে লুকিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল হ্যাজাও, আমাদের মারিস না বাপ, আমাদের মারিস না।
মারব না! দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চোখদুটো কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠেছিল অঙ্গামী সর্দার।
না, আমার পেটে তোর নাতি রয়েছে।
নাতি! হাঃ—হাঃ–হাঃ–বিরাট মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বিকট অট্টহাসি হেসেছিল অঙ্গামী সর্দার। সেই হাসিতে সামনের খাসেম বন থেকে ডানা ঝটপট করে এক ঝাঁক আউ পাখি উড়ে গিয়েছিল। ভয় পেয়ে গোটা কয়েক দাঁতাল শুয়োর চেঁচিয়ে উতরাই-এর দিকে ছুটে পালিয়েছিল।
মোটা মোটা, বেঢপ ঠোঁট দুটো ফাঁক করে লাল দাঁতের পাটি বেরিয়ে পড়েছিল অঙ্গামী সর্দারের, টেফঙের বাচ্চারা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস? দে আমাকে বর্শাটা। কেমন করে ফুড়তে হয়, দেখিয়ে দিচ্ছি।
সামনের একটা জোয়ান ছেলের হাত থেকে খারে বর্শা নিজের থাবার ছিনিয়ে নিয়েছিল অঙ্গামী সর্দার। এই পাহাড়ে করুণা নেই, মমতা নেই। সামাজিক বিচারে অন্যায় কিংবা পাপ সাব্যস্ত হলে তার একমাত্র শাস্তি হল মৃত্যু। এই অমোঘ বিধানের হেরফের হবার উপায় নাই। অঙ্গামী সর্দারও সমাজপতি। সবরকম দণ্ডমুণ্ডের অধিকর্তা। তার মুখখানা ভয়ানক হয়ে উঠেছে। অব্যর্থ লক্ষ্য। সঙ্গে সঙ্গে একটা অমানুষিক আর্তনাদ শোনা গিয়েছিল। সে আর্তনাদ সঙ্কীর্ণ সুড়ঙ্গের মধ্যে পাক খেয়ে খেয়ে গোঙাতে লাগল, আ-উ-উ-উ–
