সুড়ঙ্গের মধ্যে মা-গি কাঠ এল। পেন্য কাঠের মশাল এল। সমস্ত শীতকালটার জন্য খাবার জোগাড় করল হ্যাজাও। বুনো মোষের মাংস, সম্বরের মাংস, পাহাড়ী আপেল, নীলচে রঙের বুনো কলা। রাশি রাশি আখুশি আর তেরুঙা ফল। পাথরের খাঁজে খাঁজে আর মেঝের ওপর স্তূপাকার করে রাখা হল মোষের ছাল, বাঘের ছাল, হরিণের ছাল। রাতের অন্ধকারে অঙ্গামীদের গ্রাম থেকে লুকিয়ে কিছু খড় এনেছিল হ্যাজাও। সেগুলো বিছিয়ে অসহ্য শীতের জন্য বিছানাকে উত্তপ্ত করে রাখা হল।
রেমা সম্প্রদায় কি অঙ্গামী সমাজ, কেউ এটোঙা এবং হ্যাজাওর সংসারকে মেনে নেয়নি, স্বীকৃতি দেয়নি তাদের উষ্ণ আরামের যুগল শয্যাকে। তবু রেঙমা আর অঙ্গামীদের সমস্ত রোষ, রাগ এবং ভয়ঙ্কর বর্শাগুলিকে অগ্রাহ্য করে দু’টি মুগ্ধ পাহাড়ী যৌবন দক্ষিণ পাহাড়ের সুড়ঙ্গে নিজেদের অন্তরঙ্গ জগৎ সৃষ্টি করেছিল।
সাঙসু ঋতুর শেষে আকাশ থেকে বরফ ঝরার সমস্ত কারসাজি বানচাল করে আবার উজ্জ্বল রোদের দিন এল। এটোঙার রোমশ বুকে মুখ ঘষে সোহাগ করতে করতে সুন্দর একটা কথা বলেছিল হ্যাজাও, আমার বাচ্চা হবে রে এটোঙা। তুই বাপ হবি, আমি মা হব।
ঠিক বলছিস! বিস্ময়ে, খুশিতে চেঁচিয়ে উঠেছিল এটোঙা।
হু-হু– আবেগে চোখজোড়া বুজে এসেছিল হ্যাজাওর।
বিস্ময়টা থিতিয়ে এলে এটোঙার মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। বলেছে, কী করে বুঝলি তোর ছানা হবে?
শুধু শুধু কি বলি তুই একটা টেফঙের বাচ্চা। হু-হু, দেখছিস না, আমার পেট আর কোমরটা কেমন ফুলেছে।
হু-হু–বোকা বোকা, অবাক দৃষ্টিতে হ্যাজাওকে দেখতে লাগল এটোঙা। স্ফীত উদর, গুরুভার পাছা, টসটসে স্তন। তামাটে দেহটা ছাপাছাপি করে ভরে উঠেছে। অনেক সুন্দর হয়েছে হাজাও। চামড়া মসৃণ হয়েছে। আগে চঞ্চল ছিল; বিদ্যুতের মতো পাহাড়ে বনে চমক দিয়ে ছুটে বেড়াত। এখন দেহ থেকে বিদ্যুৎ মুছে গিয়েছে। মদিরতা এবং গাম্ভীর্য এসেছে। আলস্যের ভারে চোখের পাতা দুটো ভারী হয়েছে। অপলক চোখে তাকিয়ে ছিল এটোঙা। তাকিয়েই ছিল।
হ্যাজাও বলেছে, আমার মেয়ে হবে।
আরো খানিকটা ঘেঁষে বসেছে এটোঙা। বলেছে, কী করে বুঝলি?
কাল রাত্তিরে মজার স্বপ্ন দেখেছি। একটা ময়াল সাপ চিতি হরিণের মাথা গিলছে হাঁ করে।
হু-হু– অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে এটোঙা বলেছে, সবই তো বুঝলুম, তাতে হল কী?
আমার মা বলেছে, পোয়াতী মাগী স্বপ্নে যদি ময়াল সাপকে হরিণের মাথা গিলতে দেখে, তার মেয়ে হয়। কী মজা বল দিকি। মেয়ের জন্যে তুই অনেক পণ পাবি। আর–খুশি গলায় কথাগুলো বলতে বলতে মুখচোখ করুণ হয়ে এসেছে হ্যাজাওর। উজ্জ্বল মুখখানায় কালো ছায়া এসে পড়েছে। হঠাৎ একেবারে চুপ করে গিয়েছে সে।
কি রে, কথা বলতে বলতে থামলি কেন? কী হল তোর? ভুরু কুঁচকে দুচোখে সংশয় ফুটিয়ে এটোঙা জিগ্যেস করেছে।
মেয়ে তো হবে। কিন্তু তার বিয়ে দেব কেমন করে? আমরা এই সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রয়েছি। তোদের বস্তিতে যাবার উপায় নেই। আমাদের বাড়িতে ঢুকলেও বাপ টুকরো টুকরো করে কাটবে। তাহলে মেয়ের বিয়েতে পণ পাবি কী করে?
পণের দরকার নেই। বস্তিতে আমরা যাব না। ভিন জাত হয়ে পিরিত করেছি বলে সদ্দারেরা যখন আমাদের কোপাতে চায় তখন হুই সব শয়তানদের বস্তিতে গিয়ে কী হবে? আমাদের মেয়েটা এই সুড়ঙ্গেই বড় হবে। কেউ যদি পিরিত করে বিয়ে করতে চায় তাকেই দেব মেয়ে। তার বদলে একটা বর্শাও নেব না। বেশ জোর দিয়ে এটোঙা বলেছিল। সেই সঙ্গে খুব দ্রুত বারকয়েক শ্বাস টেনেছে। শান্ত, নির্লিপ্ত মানুষ এটোঙার চোখজোড়া তখন জ্বলছিল। .
কিছুক্ষণ চুপচাপ। তার পর আবার এটোঙা বলতে শুরু করেছে, তুই মা হবি, আমি বাপ হব। আয়, এবার আমরা একটা ঘর বানিয়ে নিই। খাদে বাঁশ আছে। সাঙলিয়া লতা আছে। রাত্তির বেলায় আমাদের হুই সালুয়ালাঙ বস্তি থেকে লুকিয়ে খড় নিয়ে আসব। একখানা খাসা ঘর হবে। সুড়ঙ্গের মধ্যে সাতটা মাস লুকিয়ে রয়েছি। আর ভালো লাগছে না হ্যাজাও। মেয়েটা জন্মাবে। এই সুড়ঙ্গের মধ্যে অন্ধকারেই হয়তো সাবাড় হয়ে যাবে।
টেমে নটুঙ! হ্যাজাও দাঁত খিঁচিয়ে হুমকে উঠেছে, এমনি এমনি বলি, তুই একটা টেফঙের বাচ্চা। সাত মাস এই সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে না থাকলে বেঁচে থাকতে পারতিস? কতবার দুই বস্তির শয়তানেরা আমাদের খোঁজে এসেছিল, মনে নেই? এই সুড়ঙ্গটা তারা খুঁজে বার করতে পারে নি। পারলে—
হু-হু, ঠিক বলেছিস। এটোঙা শিউরে উঠেছে। তার চোখের সামনে দিয়ে কতকগুলো ছায়া সরে গিয়েছিল। সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ওরা দেখেছে, যেদিন হ্যাজাওকে নিয়ে সে এই সুড়ঙ্গে র মধ্যে লুকিয়েছে, ঠিক তখন থেকেই সালুয়ালাঙ এবং অঙ্গামীদের গ্রাম সাঙুবট থেকে হাতের থাবায় বর্শা বাগিয়ে দলে দলে জোয়ান ছেলেরা এসেছে। বর্শা, সুচেন্যু, তীর, দা। ভীষণ, হিংস্র এবং সাঙ্ঘাতিক। একটি পাহাড়ী জোয়ানী আর একটি বুনো জোয়ান–এই দুটো মানুষের হৃৎপিণ্ড উপড়ে নেবার জন্য, এই দুটো অনাচারী প্রেমিক প্রেমিকাকে শিকার করে নিয়ে যাবার জন্য, বার বার দক্ষিণ পাহাড়ের চূড়ায় এসে তারা হানা দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত সতর্ক হয়ে পরস্পরকে পাহারা দিত হ্যাজাও আর এটোঙা। সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে চারপাশ ভালো করে দেখে, নিঃসন্দেহ হয়ে তারা খাবারের সন্ধানে উপত্যকায় নামত। বাঁশের চোঙা ভরে জল আনতে যেত দূরের টিজু নদীতে। এই সাতটা মাস ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ রেখে দু’টি পাহাড়ী জীবন পরস্পরকে নিরাপদ রেখেছে। দু’টি বিদ্রোহী বন্য প্রেম পরস্পরকে পাহারা দিয়েছে। দুই গ্রামের বর্শাগুলোর কথা মনে পড়তেই আতঙ্কে শরীরটা ছমছম করে।
