কেন রে হ্যাজাও, সাহস পাস না কেন? এক পা দু’পা করে হ্যাজাওর পাশে এসে দাঁড়াল এটোঙা।
ভয় হয়, হয়তো তোর কাছে বর্শা আছে। যদি হাঁকড়ে দিস, একেবারে জানে সাবাড় হয়ে যাব। সেই জন্যেই তো আসি না।
আরে না, না। সুচেন্যু বর্শা আমার ভালো লাগে না। রক্তারক্তি, খুনোখুনি, শিকার, এসবে মজাও পাই না। মেজাজও বিগড়ে যায়। একা একা এই পাহাড়ে এসে নুড়ি দিয়ে পাথরের গায়ে বন, পাহাড়, নদী আঁকতে বড় ভালো লাগে।
খুব ভালো। আমার হুই সব খুনখারাপি ভালো লাগে, আবার তোর এই দাগগুলোও ভালো লাগে। তোর দাগগুলো ভারি সুন্দর। এটা ঠিক চিতাবাঘের মতো হয়েছে। আরে, এটা ঠিক সম্বর হরিণের মতো। আর এটা, এটা কী? ময়াল নাকি? না আশুমি? হ্যাজাওর দৃষ্টিটা পাথরের দেওয়ালের গায়ে সারি সারি ছবির ওপর দিয়ে সরে সরে যেতে লাগল।
আরে না–না–একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল এটোঙা। ব্যস্ত হয়ে হ্যাজাওর ভুলটা শুধরে দিল, এটা ময়ালও নয়, আশুমিও নয়। এটা হল টিজু নদী।
হু-হু। পাথরের গায়ে এটোঙার ছবিগুলো দেখতে দেখতে অঙ্গামী সর্দারের মেয়ের চোখজোড়া বিভোর হয়ে গিয়েছিল। তার চোখমুখের ভঙ্গিতে প্রচুর মজা পাওয়ার আভাস রয়েছে, তুই কী সুন্দর দাগ কাটিস! ঠিক ঠিক চিতাবাঘ, ঠিক ঠিক হরিণ হয়ে যায়। কী মজার লোক তুই। আমি রোজ তোর কাছে আসব।
হু-হু, খুব ভালো। রোজ আসবি তুই। তোকে আমার মনে ধরেছে। তোতে আমাতে খুব মিল হবে, কি বলিস হ্যাজাও? অদ্ভুত চোখে হ্যাজাওর দিকে তাকিয়ে থেকেছে এটোঙা। তাকিয়েই থেকেছে।
হু-হু। হ্যাজাও মাথা নেড়ে সায় দিয়েছে, খুব মিল।
তারপর দক্ষিণ পাহাড়ের ওপর দিয়ে একটার পর একটা দিন উধাও হয়ে গেল। রোদের ঋতু সেন্যুঙ, বৃষ্টিঝরা মৌসুমি বাতাসের দিন, তুষারঝরা সাঙসু ঋতুর মাসগুলি একে একে চলে গেল।
অনেক ঘনিষ্ঠ হল এটোঙা এবং হ্যাজাও; অঙ্গামী আর রেঙমা সম্প্রদায়ের দু’টি মুগ্ধ পাহাড়ী যৌবন। বাদামি পাথরগুলো নুড়ির আঁকে আঁকে ভরে গেল। দেখতে দেখতে আরো মোহিত হল হ্যাজাও, আরো আবিষ্ট হল এটোঙা। দক্ষিণ পাহাড়ের বুনো চূড়াটা দুটো পাহাড়ী মানুষ-মানুষীর ভালোবাসার উত্তাপে মধুর হয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ের খাড়া গায়ে খেয়ালের ছবি আঁকতে আঁকতে কখন যে হ্যাজাওর মনে দুর্বার কামনার অব্যর্থ ছবিটা এঁকে ফেলেছিল এটোঙা, আজ আর মনে নেই।
একদিন সাঙসু ঋতুর এক হিমাক্ত দুপুরে বনের ছায়ায় চুপচাপ বসে ছিল এটোঙা। সামনের ঢালু উপত্যকাটা বেয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটে আসছিল হ্যাজাও। চমকে এটোঙা তাকিয়েছিল, কি রে হ্যাজাও, কী ব্যাপার?
সব্বনাশ হয়েছে। ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে হ্যাজাও হাঁপাতে লাগল।
কী সব্বনাশ হল? জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল এটোঙা।
ওরা সব জানতে পেরেছে। আমাদের বস্তির হুই হালুং শয়তানটা তোকে আর আমাকে একসঙ্গে দেখে বস্তিতে গিয়ে বলে দিয়েছে। হালুংটা আমাকে বিয়ে করতে চায়। আমি রাজি হইনি। তোকে বিয়ে করতে চাই; সেই রাগে লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের দেখে বাপের কাছে। লাগিয়েছে। আমার বাপ বস্তির সদ্দার। আমাকে পেলে সাবাড় করবে। বস্তির ছোঁড়ারা আমাকে খুঁজছে, তাই তোর কাছে পালিয়ে এলুম।
ঠিক করেছিস। হু-হু, আমাদের বস্তির সদ্দারও জানতে পেরেছে। তোর সঙ্গে আমার এই পিরিত তার দুচোখের বিষ। তোরা আমরা তো ভিন জাত। তোরা অঙ্গামী, আমরা রেঙমা। তাই সদ্দার আমাকে বস্তি থেকে ভাগিয়ে দিয়েছে। আমি শিকার করি না, বস্তির জোয়ান ছোকরাদের সঙ্গে মিশি না, জমিতে আবাদ করতে যাই না, সেই জন্যে সবাই আমার ওপর গোসা করে রয়েছে। আমি ঠিক করেছি, এখান থেকে আর যাব না।
আমিও যাব না। তোর কাছেই থাকব। তুই শিকার করতে পারিস না, আমি পারি। তুই পাথরের গায়ে নুড়ি ঘষে মজার মজার দাগ কাটবি। আমি বন থেকে হরিণ মেরে আনব, পাখি ফুঁড়ে আনব, ফলপাকুড় নিয়ে আসব। দুজনে ভাগ করে খাব। কেমন? গোল তামাটে ঘাড়খানা বাঁকিয়ে অদ্ভুত চোখে তাকিয়েছিল হ্যাজাও। বসবার ভঙ্গিটি বড়ই অন্তরঙ্গ। তার দু’টি কপিশ চোখের মণিতে তখন একটি অনুগত পাহাড়ী জোয়ানের ছায়া পড়েছে।
ভালো, হু-হু, খুব ভালো। আরো কাছাকাছি সরে এসেছিল এটোঙা। দ্বিধাভরা গলায় বলেছিল, কিন্তু এই খোলা পাহাড়ে কোথায় থাকব? যা শীত! রাত্তিরে আবার বরফ পড়ে।
খিলখিল শব্দ করে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিল হ্যাজাও, পাহাড়ী জোয়ান,না একটা বাড়ি টেফঙ তুই?
কেন? এটোঙার চোখজোড়া ধক করে জ্বলে উঠেছিল, ইজা হুবতা! খবদ্দার হ্যাজাও, খিস্তি খেউড় কবি না। একেবারে আছাড় মেরে খাদে ফেলে দেব।
খিস্তি করব না তো কী করব শুনি? বেশি ফ্যাকার ফ্যাকর করবি না এটোঙা। তোরা রেঙমারা, বড় বোকা। একটু যদি মগজ থাকত তোদের! এই পাহাড়ে কত সুড়ঙ্গ রয়েছে। তার মধ্যে ঢুকে আতামারী পাতা বিছিয়ে আমরা যোব।
ঠিক বলেছিস, ঠিক বলেছিস। হু-হু, তোদের অঙ্গামীদের বুদ্ধি বড় সাফ। মাথা নেড়ে তারিফ করেছে এটোঙা, জানিস হ্যাজাও, হুই পাথরের গায়ে নুড়ির দাগ কাটা ছাড়া অন্য কিছু আমার মাথায় ঢোকে না। হু-হু– মাথাটা এত ঝাঁকিয়েছে এটোঙা, মনে হয়েছিল, এ ঝাঁকানি আর থামবে না।
এরপর দক্ষিণের পাহাড় চূড়ায় দু’টি পাহাড়ী মানুষ-মানুষী সংসার পাতল। অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে আদিম মানুষের সংসার। ওপরে নিরেট পাথরের ছাদ, নিচে রুক্ষ মেঝে। সামনের দিকে সুড়ঙ্গের মুখ। হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়।
