এটোঙার বাপ রিজিমাখুঙ দাঁতমুখ খিঁচিয়ে গর্জে উঠত, তুই কী হয়েছিস বল দিকি? শিকারে যাবি না, সিঁড়িখেতে বীজদানা বুনবি না, মোষ বলির সময় মোরাঙে থাকবি না, কারো বাড়ি ভোজ খেতে যাবি না, আবাদ করবি না। তা হলে চলবে কী করে? আমাদের এতবড় নগুসোরি বংশ! দুচারটে শত্রর মুণ্ডু কেটে না আনলে ইজ্জত থাকে না। একটা ব্যাঙ মারতে পারিস না তো শত্রুর মুণ্ডু! আমাদের সব ইজ্জত তুই ডোবাবি।
আমি ও-সব পারব না। বলেই চক্ষের পলকে সামনে থেকে উধাও হয়ে যেত এটোঙা।
একটা টেফঙের বাচ্চা। আহে ভু টেলো। চাপা চাপা চোখদুটো জ্বলে উঠত রিজিমাখুঙের, শয়তানটাকে পেলে কুপিয়ে কুপিয়ে সাবাড় করব। হু-হু। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বর্শা বাগিয়ে এটোঙাকে ধাওয়া করত রিজিমাখুঙ।
তিনটে ঢেউখেলানো চড়াই আর ছোট ছোট দুটো পাহাড় পেরিয়ে রোজ সকালে দক্ষিণের পাহাড়ে চলে যেত এটোঙা। একখানা বাদামি রঙের পাথরের ওপর বসে দুচোখের দৃষ্টি দিয়ে পাহাড়ের বড় ভয়ঙ্কর অথচ সুন্দর রূপটি শুষে নিত। নিচে, অনেক নিচে আঁকাবাঁকা টিজু নদী গর্জে গর্জে বইত। আকাশে খণ্ড ছিন্ন সোনামুখি মেঘ ভেসে বেড়াত। আতামারী ঝোঁপের ফকে হরিণের চোখ দেখা যেত। কোথাও উতরোল প্রস্রবণ। কোথাও নিঃশব্দ ঝরনা। এই পাহাড়, এই নদী ঝরনা বন-উপত্যকা, সব মিলিয়ে এই নিসর্গ এটোঙার অধস্ফুট বন্য চেতনায় দুর্বার আবেগে রিমঝিম করত। দক্ষিণের ওই পাহাড়চূড়া প্রতিদিন কী এক অদ্ভুত নেশায় মাতিয়ে তাকে টেনে আনত।
একসময় সকাল পেরিয়ে যেত। রোদ ঝকঝকে হত। সামনের বন থেকে বুনো কলা আর টক টক আখুশি ফল ছিঁড়ে খেতে শুরু করত এটোঙা। পাহাড় থেকে যখন দিনের রং মুছে যেত, আবছা অন্ধকারে ঢেকে যেত নাগা পাহাড়, তখন গ্রামে ফিরত এটোঙা। এ একেবারে নিয়মিত। এ নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না।
খাড়া খাড়া বাদামি পাথরের দেওয়াল। আশ্চর্য, একদিন নিজের অজান্তেই সেই পাথরের দেওয়ালে এক টুকরো নুড়ি দিয়ে দাগ কেটে কেটে টিজু নদী আঁকল সে, আঁকল সম্বরের মাথা, : আতামারী বন। তারপর ছবিগুলোর দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল।
নিজের উদাস মনটার মধ্যে শিল্পের যে আবেগ সঙ্গোপনে লুকিয়ে ছিল তার প্রকাশ দেখতে পেয়ে মোহিত হয়ে গেল এটোঙা।
এরপর থেকে বিচিত্র নেশায় পেয়ে বসল এটোঙাকে। খাড়া খাড়া পাহাড়ের গায়ে নরম নুড়ি দিয়ে দেগে দেগে নদীবন-পশু-পাখি আঁকতে লাগল। রাশি রাশি ছবির অক্ষরে নিজের আবেগকে মূর্তি দিল এটোঙা।
এই সব ছবি, নিজের মধ্যে শিল্পীকে খুঁজে পাওয়ার আমোদ, সুন্দর আকাশ-পাহাড়, এগুলো বাদ দিয়ে আরো একটা বিস্ময় ছিল। আজও সেই চমকপ্রদ বিকেলটা স্নায়ুতে এবং রক্তে রক্তে দোল খায় এটোঙারভালো লাগে, খুব ভালো। মন এবং এই সতেজ শরীর ঝিমঝিম করে।
দক্ষিণ পাহাড়ের চড়াইতে অঙ্গামীদের বিরাট গ্রাম সাঞ্জুবট। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এবং টক আখুশি ফল খেতে খেতে সাজুবট গ্রামের বুড়ো সর্দারের মেয়ে একদিন। পাহাড়ের চূড়ায় এসে পড়েছিল। মুগ্ধ চোখে খাড়া পাথরের গায়ে নদীবন ঝরনার ছবি দেখছিল।
বিশাল উপত্যকাটা বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে এটোঙার ছোট ছোট চাপা চোখজোড়া মোহিত হয়ে গিয়েছিল। দক্ষিণ পাহাড়ের চূড়ায় শেষ বেলার আমেজী রোদে উজ্জ্বল তামাটে। রঙের একটি যুবতী দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেদিনের সেই বিকেল এমন একটা সুন্দর মোহ নিয়ে তার জন্য যে অপেক্ষা করছিল, তা কি আগেভাগে জানত এটোঙা? অবাক, নির্নিমেষ কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে রইল সে। একটু পরে এই আবেশের ভাবটা কেটে গেলে মনের মধ্যে সন্দেহ। উঁকি মারল। মেয়েটা কে? তাদের সালুয়ালাঙ বস্তিতে কোনোদিন একে তো দেখে নি! কী মতলব নিয়ে এসেছে মেয়েটা, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
নিমেষে মন থেকে সন্দেহটা ঝেড়ে সামনের বড় টিলা বেয়ে চূড়ায় উঠে এল এটোঙা। মেয়েটার কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। বলল, কে তুই?
চমকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটা। তীক্ষ্ণ, অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে এটোঙার সমস্ত দেহ খুঁড়ে হাড়-মজ্জা-স্নায়ু, এমনকি তার ভাবনা এবং চিন্তাগুলিকেও যেন তন্নতন্ন করে দেখে নিয়েছিল। ছোট, চাপা কপালটা গভীর সন্দেহে কুঁচকে গিয়েছিল।
অনেকক্ষণ দুজনে পরস্পরকে যাচাই করে নিল। একসময় সন্দেহ ঘুচল, সংশয় চুকল।
দুটো ছোট পিঙ্গল চোখের মণিতে প্রশ্রয়ের হাসি ঝিকঝিক করে উঠেছিল মেয়েটার। আউপাখির মতো সুডৌল ঘাড়খানা বাঁকিয়ে, কানের লতায় নীয়েঙ গয়নায় দোলন দিয়ে, সুঠাম। দেহটিকে বাঁকা ছাঁদে ঘুরিয়ে সে বলেছিল, আমার নাম হ্যাজাও, অঙ্গামী সদ্দারের মেয়ে। হুই সাজুবট বস্তিটা আমাদের।
এটোঙা বলেছিল, আমাদের বস্তি হল সালুয়ালাঙ। আমরা রেঙমা। নগুসোরি বংশ। আমার নাম এটোঙা।
এপারে সালুয়ালাঙ, ওপারে চড়াই উপত্যকায় অঙ্গামীদের বড় গ্রাম সাজুবট। মাঝখান দিয়ে বিশাল একটা বর্শামুখের মতো উঠে গিয়েছে দক্ষিণের পাহাড় চূড়া। ভিন সম্প্রদায়ের একটি ছেলে আর একটি মেয়ে মুখোমুখি হয়েছিল দুই গ্রামের মাঝামাঝি জায়গায়।
হ্যাজাও বলেছিল, রোজ দেখি এই পাহাড়ে আসিস। আমি হুই আখুশি ঝোপে দাঁড়িয়ে তোকে আসতে দেখি। নুড়ি দিয়ে পাথরের গায়ে কী সব দাগ কাটিস। খালি ভাবি, এসে দেখব, কী করিস তুই, কিন্তু সাহস পাই না।
