পাঁজরটা চুরমার করে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল বুড়ো সর্দারের, তোদের কেসুঙ কি আর আছে! সেবার পাহাড়ে সুঙকেনি (ভূমিকম্প) হল। পাথর চাপা পড়ে তোদের ঘর গুঁড়ো গুড়ো হয়ে গেল। একটা খাসেম গাছে তলায় পড়ে তোর বাপ-মা চ্যাপ্টা হল। সবই বরাত। তোদের অত বড় বনেদি নগুসোর বংশটা একেবারে লোপাট হয়ে গেল। আর তোরও কোনো পাত্তা ছিল না।
হু-হু, ভালোই হল। দুনিয়ার সব লোপাট হয়ে যাওয়াই ভালো। বল দিকি, বাপ-মা কেমন করে চ্যাপ্টা হয়েছিল। ছবিটা এঁকে নিই। ক্ষিপ্র হাত চালিয়ে মণিপুরী ঝোলা থেকে খানকয়েক সাদা কাগজ আর সরু পেন্সিল বার করল এটোঙা।
ছবি! ছবি কী হবে! কৌতূহলে এবং আগ্রহে আরো কাছে এগিয়ে এল বুড়ো সর্দার।
হু-হু, সব দেখতে পাবি। গম্ভীর মুখে এটোঙা বলল।
চারপাশ থেকে জোয়ান-জোয়ানীরা আরো ঘন হয়ে এসেছে। সকলে সমস্বরে চেঁচামেচি শুরু করে দিল, তোর হাতে ওগুলো কি রে এটোঙা?
এগুলোর নাম হল কাগজ আর এটার নাম পেন্সিল। এইবার দ্যাখ কী করি। আমার বাপ মা আতামারী গাছ চাপা পড়ে মরেছিল তো? দ্যাখ, দ্যাখ–সাদা কাগজের ওপর কালো পেন্সিলের দাগে একটা গাছ-চাপা বিধ্বস্ত পুরুষ এবং নারীর ছবি ফুটিয়ে তুলল এটোঙা। সামনের দিকে কাগজটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, কি রে সদ্দার, অনেকটা এইরকম না?
হু-হু–মাথা দুলিয়ে, সমস্ত দেহ ঝাঁকিয়ে ছবিটার তারিফ করল বুড়ো সর্দার। সাদা কাগজ এবং পেন্সিলের কয়েকটি নগণ্য টানেটোনে এমন ভেলকি যে লুকিয়ে থাকতে পারে, চোখের সামনে তা দেখে একেবারে তাজ্জব বনে গেল। সালুয়ালা গ্রামের সবচেয়ে পুরনো মানুষ সে। সুদীর্ঘ জীবনে অনেক কিছুই দেখেছে, কিন্তু এমনটি আগে আর তার চোখে পড়েনি। সম্ভ্রমে, বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল বুড়ো সর্দার।
কিন্তু একটু পরেই ঘোর কাটল। ভুরু দুটো কুঁচকে সন্দেহ-ভরা দৃষ্টি দিয়ে এটোঙার দেহটা কুঁড়ে তন্ন তন্ন করে কী যেন খুঁজল সে। ভাবতে লাগল, এই চারটে বছরে কোনো ডাইনির কাছ থেকে এই ভোজাবাজি শিখে এল নাকি এটোঙা!
চারপাশের জোয়ান ছেলেমেয়েরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। লো শি মাসের এই উজ্জ্বল রোদের দিন এমন একটা মজাকে তাদের সালুয়ালা গ্রামে নিয়ে আসবে, তা কি তারা জানত?
হু-হু, হুই ইম্ফলের জেলখানায় একটা মণিপুরীর কাছ থেকে এই ছবি আঁকা ভালো করে শিখেছি রে সদ্দার। মণিপুরীটার নাম থাম্বাল সিং। আমার চেয়ে থাম্বাল অনেক ভালো ছবি। আঁকে।
অদ্ভুত এক কাহিনী শুরু হল। এটোঙা আরম্ভ করল এভাবে। ইম্ফলের জেলখানায় চার চারটে বছর বাদ দিয়েও একুশ বছরের একটা বিপুল অতীত আছে এটোঙার। সালয়ালা গ্রামের মানুষদের সেই একুশ বছরের অতীত সম্বন্ধে যতটা ধারণা আছে, তার চেয়ে রয়েছে। অনেক বেশি বিস্ময়। অনেক বেশি ঔৎসুক্য। এই রহস্যময় মানুষটা সম্বন্ধে তারা বিশেষ কিছুই জানে না। এই না-জানার ফাঁকটুকু বুনো মনের অস্ফুট কল্পনা দিয়ে ভরিয়ে তুলতে না পেরে তারা হিমসিম খায়।
এখন যেখানে খোখিকেসারি কেসুঙ, ঠিক তার পাশ থেকে পাটকিলে রঙের বিরাট একখণ্ড পাথর খাড়া উঠে গিয়েছে। সেই পাথরের মাথাটা যেখানে সমতল সেখানে ঘন ওক বন ছিল এক কালে। জায়গাটা নিঝুম, শান্ত। ওক বনের ঠাণ্ডা ছায়ায় ছিল নগুসোরি বংশের বাড়ি। সোনালি খড়ের চাল, মোটা মোটা ইজুম বাঁশের দেওয়াল, এবড়োখেবড়ো মেঝে। ওই ঘরে একদিন বুনো মায়ের কামনা এবং পাহাড়ী বাপের আদিম পৌরুষ রক্তে মিশিয়ে জন্ম নিয়েছিল এটোঙা।
কবে, কখন এই পাহাড়ী পৃথিবীর ছোঁয়া প্রথম পেয়েছিল, বুক ভরে এর বাতাস নিয়েছিল, সে কথা অন্য দশটা জোয়ানের মতো তারও মনে নেই।
মায়ের কোল থেকে একদিন মাটিতে নামল এটোঙা। একটু একটু করে তার বিচরণের সীমানা বড় হতে লাগল। এই পাহাড়ের আলোবাতাস-রোদ, কনঝরনা-উপত্যকা থেকে কণায় কণায় প্রাণরস গ্রাস করতে লাগল।
শিশু এটোঙা থেকে কিশোর এটোঙা। তারপর যৌবন এল। পেশী সবল হল। চামড়ায়। চিকন আভা ফুটল। মনের মধ্যে বয়সের ধর্ম তার কতকগুলো স্থল দাবির জানান দিয়ে গেল। এটোঙার দেহমনের কোষে কোষে জন্ম নিল এক রূপময় বুনো জোয়ান।
কিন্তু আশ্চর্য! সালুয়ালা গ্রামের অন্য জোয়ানদের থেকে সে আলাদা। একেবারেই স্বতন্ত্র। মোরাঙের বাঁশের মাচানে সকলের সঙ্গে সে-ও অবশ্য পাশাপাশি শোয়। অবিবাহিত জোয়ান ছেলের অবশ্য পালনীয় প্রথাগুলিকে মেনে চলে। দেহমনকে পাপের গ্রাস থেকে বাঁচাতে, নারীর লালসা এবং রিপু থেকে রক্ষা করতে, মোরাঙ হল সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। অন্যান্য ছেলেরা পাশাপাশি শুয়েছে, তাদের গরম নিশ্বাস পড়েছে গায়ে। তবু ভুল করেও কোনোদিন তাদের সঙ্গে রসরঙ্গ কি তামাশার কথা বলত না। পারতপক্ষে মোরাঙে রাত্রি কাটাবার সময় ছাড়া তাদের কাছে ঘেঁষত না। মোট কথা, সকলকে এড়িয়ে চলত এটোঙা। নিজের চারপাশে একটা দুয়ে রহস্য সৃষ্টি করে রাখত।
এই বন্য জীবনের আশা-নিরাশা, এই পাহাড়ী পৃথিবীর ভীষণতা সম্পর্কে কোনো মোহই ছিল না এটোঙার মনে। কৌতূহলও নয়। লম্বা বর্শা বাগিয়ে ঘন বনে বাঘ কি হরিণ শিকার করতে কোনোদিন সে যেত না। মোরাঙের সামনে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে বুনো মোষ ঝলসে সকলের সঙ্গে আধপোড়া মাংস খাবার উৎসাহ ছিল না তার। শত্রুর মুণ্ডু কেটে আনার পর সমস্ত গ্রামে যে আদিম উল্লাস জাগত, হুল্লোড় হত, তার মধ্যে কোনদিন নিজেকে একাকার। করে মিলিয়ে দিতে পারে নি এটোঙা।
