ডাইনি গাইডিলিও। বিড় বিড় করে শব্দ দুটো উচ্চারণ করল রাঙসুঙ। তারপর চেঁচিয়ে বলল, তাই করব। বস্তিতে বস্তিতে গিয়ে দুই কোহিমা পাহাড়ের গাইডিলিও ডাইনির নাম রটিয়ে দেব।
ভালো, খুব ভালো। পরম খুশির আবেশে গলাটা জড়িয়ে জড়িয়ে আসছে বুড়ো সর্দারের।
বাইরে আকাশ, দূর পাহাড়ের উপত্যকা আর বুনো মালভুমি জুড়ে এখন সন্ধ্যা নিবিড় হয়ে নামছে। ঘন হচ্ছে পার্বত্য অন্ধকার। পোকরি কেসুরে এই ছোট্ট ঘরখানায় ফ্যাকাসে আলোটুকু নিভে গিয়েছে। তিনটি মানুষ বড় ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছে।
হিংস্র আনন্দে একজোড়া ঘোলাটে চোখ ময়ালের চোখের মতো জ্বলছে। এইমাত্র রাসুঙ নামে এক সরল পাহাড়ী মানুষের মনে লোভ উসকে দিয়ে তাকে শিকার করে ফেলেছে বুড়ো সর্দার।
.
৩৬.
উপত্যকা আর মালভূমি। চড়াই আর উতরাইয়ে তরঙ্গিত এই নাগা পাহাড়। সেই পাহাড়ের ওপর কয়েক দিনের মধ্যেই নেমে এল লো শি মাস। এল ফসল বোনার ঋতু। এই শিলাময় পৃথিবীর কঠিন আবরণের নিচে জীবনরসের ধারা বয়ে চলেছে। সে খবর জানা আছে নাগা কৃষাণদের। তারা জানে, সেই প্রাণরস লক্ষ শিকড়ের জিভ দিয়ে শুষে শুষে বীজদানা থেকে সবুজ ফসল জন্ম নেবে। প্রাণের মহিমায় পুলকময়ী হয়ে উঠবে পার্বতী মৃত্তিকা।
লো শি মাস। বীজ বোনার মরশুম, পরিশ্রমের মরশুম। লো শি মাসের এই বীজদানা লো ফুঁ মাসে বিশাল নাগা পাহাড়কে সোনালি লাবণ্যে ভরে দেবে। সেই ফসলের প্রত্যাশায়, অদ্ভুত খুশির মৌতাতে পাহাড়ী মানুষগুলো ঝুঁদ হয়ে থাকে।
সালুয়ালা গ্রামেও বীজ বোনার ধুম পড়েছে। উপত্যকায় উপত্যকায় শোরগোল শোনা যাচ্ছে। জোয়ান ছেলেরা, যুবতী মেয়েরা ধাপে ধাপে কাটা সিঁড়িখেতে বিউলা ধানের বীজ বুনছে।
লো শি মাসের রোদ আশ্চর্য উজ্জ্বল। বর্শার ফলার মতো ঝকমকে, দীপ্ত। পাহাড়ে পাহাড়ে সেই রোদ ছড়িয়ে পড়েছে।
একসময় সিঁড়িখেতে গানের সুর শোনা গেল। একই গানে সকলে সুর মিলিয়েছে। পাহাড়ী গান, পাহাড়ী সুর, পাহাড়ী গমক। সুরটা বাতাসে দোল খেতে খেতে দক্ষিণ পাহাড় পেরিয়ে সুদূর আকাশের দিকে উধাও হয়ে যাচ্ছে।
ম্যুখে রেনি মুকেশে লে হো,
সুলে ফুফুলুগি।
এল হো নায়েঙ কোহালুগি লে হো,
আমহু রেমিন্যু!
কয়েকটি যুবতী পরস্পরের কাঁধ ছুঁয়ে নাচের ভঙ্গিতে পা ছুঁড়ে ঘুড়ে আলপথ ধরে এগিয়ে এল। তাদের সুরেলা গলায় গানের ধুয়ো :
সুলে ফুচুলুগি।
সুলে ফুচুলুগি।
একপাশে একখণ্ড বড় পাথরের ওপর জাঁকিয়ে বসে রয়েছে বুড়ো সর্দার। কোঁচকানো মুখে খুশির ভঙ্গি। মাথা ঝাঁকিয়ে, বিরাট বর্শাটা হাত দিয়ে দুলিয়ে, কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বসে গানটার তারিফ করতে লাগল।
এদিকে সেদিকে গোটাকয়েক পোষা শুয়োর ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে চরে বেড়াচ্ছে। ধারাল ঠোঁটের ঘায়ে মাটি চিরে বীজদানা খুঁজছে লালকুঁটি মোরগের ঝক। কিছু খাদ্যের আশায় পাথরের ভাঁজে ভাঁজে হন্যে হয়ে শুঁকে বেড়াচ্ছে পোষা কুকুরেরা।
হা-আ-আ-হু-ও কে? কে রে? গানের তারিফ থামিয়ে চিৎকার করে উঠল বুড়ো সর্দার।
সঙ্গে সঙ্গে ফসল বোনার গানটা ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গেল। সকলে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
একটা জোয়ান বলল, এটোঙা বলেই তো মনে হচ্ছে রে সদ্দার।
এটোঙা! তড়াক করে বাদামি পাথরখানা থেকে লাফিয়ে উঠল বুড়ো সর্দার। এতক্ষণ দক্ষিণ পাহাড়ের চূড়ায় একটা চলমান বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল, একটু একটু করে সেই বিন্দুটা স্পষ্ট হল। সিঁড়িখেতে এসে একটা পরিচিত মানুষের রূপ নিল–এটোঙা।
এটোঙার চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়াল সালুয়ালা গ্রামের জোয়ান ছেলেমেয়েরা। সকলের চোখেমুখে বিস্ময়, কৌতূহল এবং কিছুটা ভয় মেশানো কৌতুক ফুটে বেরিয়েছে।
এটোঙার সমস্ত দেহে অদ্ভুত সাজপোশাক ঝলমল করছে। নীলচে হাফ প্যান্ট, মাথায় সাহেবি টুপি, সবুজ জামা, কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত ঝোলানো একটা মণিপুরী ঝোলা। পায়ে পাঁশুটে রঙের বুট জুতো। প্যান্ট, টুপি, শার্ট, জুতো–পাহাড়ী মানুষের জ্ঞানে অভিজ্ঞতায় এই রহস্যময় বস্তুগুলোর অস্তিত্ব নেই। পাহাড় বন ঝরনা-সিঁড়িখেত ছাড়া এই সব অদ্ভুত জিনিস তারা কোনোদিনই দেখে নি। কেউ কেউ এটোঙার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার অনেকেই সসম্ভ্রম দূরত্ব বজায় রেখে নির্নিমেষে তাকে দেখছে।
বুড়ো সর্দার জোয়ান ছেলেমেয়েদের জটলাটা কনুই দিয়ে গুতিয়ে ভেঙেচুরে সামনে এগিয়ে এল। সালুয়ালা গ্রামের সে-ই সবচেয়ে প্রাচীন মানুষ। প্রাজ্ঞও বটে। জীবনে তার অনেক অভিজ্ঞতা। অনেক কিছু দেখেছে সে। অজস্র ভূয়োদর্শন হয়েছে তার।
কোহিমা শহরে, জুনোবট, মোককচঙ এবং আঙুনেটিতে এমন সব সাজপোশাকের বাহার সে অসংখ্য বার দেখেছে।
বুড়ো সর্দার এটোঙার বুকে একখানা হাত রেখে বলল, হু-হু, অ্যাদ্দিন তুই কোথায় ছিলি
মৃদু হাসল এটোঙা। বলল, তা অনেক বছর হল বস্তি থেকে ভেগেছিলুম, কি বলিস সদার? কতদিন হবে বল দিকি?
অত হিসেব জানি না। তবে অনেক বছর তুই বস্তিতে ছিল না। ছিলি কোথায়? যে অঙ্গামী মাগীটাকে নিয়ে দক্ষিণের পাহাড়ে সাত মাস কাটিয়েছিলি সেটা গেল কোথায়? :
চার বছর ইম্ফলের জেলখানায় কাটালাম। অঙ্গামী মেয়েটাকে তার বাপ নিয়ে গেছে তাদের বস্তিতে। পরে সব বলব। সে অনেক কেচ্ছা। এটোঙা বলতে লাগল, আমার বাপ-মা কোথায়? আমাদের কেসুঙটা কোন দিকে? চার বছরে বস্তির অনেক কিছু বদলে গেছে, দেখছি। আমাদের কেসুঙের খবর বল। বাপ-মায়ের খবর দে।
