সাঞ্চামখাবা বলল, আউ পাখি নেই, বনমোরগ আছে।
খুব ভালো, খুব ভালো। শিগগির নিয়ে আয়। লোভে খুশিতে ঘোলাটে চোখজোড়া জ্বলতে লাগল বুড়ো সর্দারের।
সাঞ্চামখাবা ভেতরের ঘরে চলে গেল। খানিক পর বাঁশের তিনটে চোঙা রোহি মধুতে টইটম্বুর করে এবং কাঠের বাসনে কাবাব আর বনমোরগের মাংসের স্তূপ সাজিয়ে বাইরের ঘরে চলে এল। সদ্য ঝলসানো বনমোরগ। ধোঁয়া উড়ছে, লালচে রং। রোহি মধুর মাদক গন্ধে সমস্ত পোকরি কেসুঙটা ভরে উঠেছে। তর সইছেনা আর, বুড়ো সর্দার লাফিয়ে উঠল। সাঞ্চামখাবার হাত থেকে মাংস আর রোহি মধু ছিনিয়ে নিতে নিতে অস্ফুট লুব্ধ গলায় বলল, হু-হু, ভালো, খুব ভালো।
নানকোয়া বস্তি থেকে জনকয়েক জোয়ান ছেলে এসেছিল রাঙসুঙের সঙ্গে। তারা জঙ্গলের দিকে বেড়াতে গিয়েছে। রাঙসুঙ বলল, খাবারগুলো শিগগির সাবাড় করে ফেলি। নইলে
শয়তানরা এসে ভাগ বসাবে।
তিনজনে তরিবত করে রোহি মধু খেতে শুরু করল। সেই সঙ্গে কন মোরগের মাংস।
ধারাল নখ দিয়ে একখণ্ড মাংস ছিঁড়তে ছিঁড়তে বুড়ো সর্দার বলল, মেহেলীকে এবার কেলুরি বস্তি থেকে ছিনিয়ে আনতে পারব রে সাঞ্চামখাবা।
কেমন করে? উত্তেজনায় সাঞ্চামখাবার হাতের চোঙা থেকে খানিকটা রাহি মধু চলকে পড়ল।
হু-হু, কোহিমা শহর থেকে ফাদার আসবে, ফাদারের লোক আসবে, বন্দুক আসবে। হু-হু, হুই কেলুরি বস্তির ফুটুনি একেবারে খতম করে দেব না! আমাদের বস্তির মেয়ে ভাগিয়ে আটক করে রাখে!নখ দিয়ে কলিজা ফেঁড়ে রক্ত খাব।বুড়ো সর্দার দরজার কাছে ছুটে গেল। কেলুরি বস্তির দিকে মুখ করে দাঁত খিঁচিয়ে কুৎসিত ভঙ্গি করে চেঁচাতে লাগল, আসছি টেফঙের বাচ্চারা, তোদের সব কটাকে ফুড়ব। সব কটার মাথা নিয়ে আসব।
ফাদার আবার কে রে সদ্দার? রাঙসুঙের দুচোখে অপার বিস্ময়, বন্দুক কী জিনিস?
ফাদার, বন্দুক–অপরিচিত দু’টি শব্দ, রহস্যময় দু’টি নাম। এই মুহূর্তে অদ্ভুত বিস্ময়কর শব্দ দুটো রাঙসুঙের অস্ফুট পাহাড়ী চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
নিজের জায়গায় ফিরে বুড়ো সর্দার বলল, হু-হু, সব বুঝতে পারবি। আগে তো আমাদের বস্তিতে ফাদারকে নিয়ে আসি। তারপর মেহেলীটাকে কেড়ে আনি কেলুরি বস্তি থেকে। তখন টের পাবি, ফাদার কে, বন্দুক কী। বলতে বলতে সহসা গলাটা করুণ এবং শিথিল হয়ে গেল, আমার মেয়েটা তো বেপাত্তা হয়েই রইল। বাঘের পেটে গেল, না বুনো মোষের গুঁতোয় সাবাড় হল, কিছুই বুঝতে পারলাম না। থাক, লিজোমুর কথা এখন থাক। লিজোমু যখন নেই, মেহেলীই আমার মেয়ে। কেলুরি বস্তি থেকে ওকে এনে বিয়েটা দিতে পারলে হয়। একটা তপ্ত, লম্বা নিশ্বাস বুড়ো সর্দারের বুকটাকে মুচড়ে বেরিয়ে এল।
এবার দস্তুরমত উৎসাহিত হয়ে উঠেছে রাঙসুঙ। কর্কশ মেঝের ওপর দিয়ে ভারী দেহটাকে টানতে টানতে বুড়ো সর্দারের কাছে ঘন হয়ে বসল। বলল, হু, খুব ভালো হবে। এই তো সেদিন আমার ছেলেটার সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্যে সাঞ্চামখাবাকে বউপণ পাঠিয়ে দিলুম। খারে বর্শা, এরি কাপড়, আরুখা, কড়ি আর শঙ্খের কত গয়না দিলুম। তুই ফাদার না কী, তাকে এনে মেহেলীকে ছিনিয়ে নিয়ে আয় কেলুরি বস্তি থেকে। কেলুরি বস্তির সঙ্গে লড়াই বাধলে আমরা তোদের দলে থাকব।
হু-হু। গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল বুড়ো সর্দার। বলল, ঠিক, ঠিক বলেছিস। তোরা আমাদের দলে থাকবি। আমরা তোদের বন্ধু।
হু-হু, বন্ধু। একশো বার বন্ধু। তড়াক করে লাফিয়ে উঠল রাঙসুঙ, তা ছাড়া, তোরা আমাদের কুটুম হতে যাচ্ছিস।
ভালো কথা বলেছিস রাঙসুঙ, বড় খুশির কথা। মেহেলীকে তোর ছেলের সঙ্গে নির্ঘাত বিয়ে দেব। সাঞ্চামখাবা বউপণ নিয়েছে। কথার খেলাপ করা কিছুতেই চলবে না। তবে আমার একটা কথা তোকে রাখতে হবে রাঙসুঙ। ভুরু দুটো কুঁচকে, ঘোলাটে চোখে কুটিল দৃষ্টি ফুটিয়ে বুড়ো সর্দার তাকাল।
কী কথা? ফাদারকে তোদের বস্তিতে যেতে দিবি তো?
নির্ঘাত দেব। ফাদার আমার ছেলের বউকে কেলুরি বস্তি থেকে এনে দেবে, আর তাকে যেতে দেব না? তেমন বেইমান আমরা পাহাড়ীরা নই রে সদ্দার।
বেশ, বেশ। ভালো কথা বলেছিস। দেখিস, তোদের বস্তির কেউ যেন ফাদারকে বর্শা হাঁকড়ে না বসে।
কে হাঁকড়াবে? একেবারে জানে খেয়ে ফেলব না তাকে। আমি হলাম নানকোয়া বস্তির সদ্দার। আমার ছেলে মেজিচিজুও বাঘমানুষ। সবাই আমাদের ভয় করে। আমরা যা বলব তাই। হবে। কেউ ওস্তাদি করতে গেলে মোষের মতো ছাল উপড়ে ফেলব।কুদ্ধ জানোয়ারের মতো গর্জে উঠল রাঙসুঙ।
ভালো বলেছিস। আরো একটা কথা আছে। সে কথাটাও তোকে রাখতে হবে। তা না হলে ছেলের সঙ্গে মেহেলীর বিয়ে দেব না।
আবার কী কথা! চোখেমুখে এবার ভীষণ বিরক্তি ফুটে উঠল রাঙসুঙের।
তোদের বক্তির পাশে তো অনেক বক্তি আছে। তাদের সঙ্গে খাতির রেখেছিস তো?
হু-হু, সব বক্তির সঙ্গেই আমাদের খাতির আছে। জুকুসিমা বস্তি, পেরুমা বস্তি, ইটিলাক বস্তি, এ ছাড়া আরো অনেক আছে। এ কথা জানতে চাইছিস কেন রে সদ্দার?
শোন তবে। যেমন করে গোপন মন্ত্র দেওয়া হয়, ঠিক তেমনই সতর্ক ভঙ্গিতে রাঙসুঙের কানের কাছে মুখটাকে নামিয়ে আনল বুড়ো সর্দার। বলল,কোহিমা পাহাড়ে এক ডাইনি আছে, তার নাম হল গাইডিলিও। খবদ্দার, তার কাছে কেউ যেন না যায়। এই কথাটা খাতিরের লোকদের মধ্যে রটিয়ে দিবি। বস্তিতে বস্তিতে গিয়ে বলে আসবি। যদি এই কাজটা করতে পারিস, তা হলে তোদের বরাতে অনেক মজা আছে। ফাদারের কাছ থেকে অনেক কিছু পাবি। খাবার পাবি, কাপড় পাবি, টাকা পাবি।
