যুবকেরা উত্তর দিল না। তাদের মাথা আর-একটু নুয়ে পড়ল শুধু।
খবরটা তা হলে ঠিক প্রসাদ বলতে লাগলেন, বাকি লাইফটা রকে গুলতানি করেই কাটিয়ে। দিতে চাস? নিজেদের এভাবে ওয়েস্ট করছিস কেন?
শ্যামবর্ণ ছেলেটি ঢোক গিলে বলল, কী করুম? কলেজে ছয় মাসের মাইনা বাকি। আমাগো নাম কাইটা দিছে।
গলার স্বর সামান্য উঁচুতে তুলে প্রসাদ বললেন, মাইনে বাকি পড়েছে তো আমায় বলিসনি কেন?
ফর্সা ছেলেটি বলল, কতবার আর আপনের কাছে হাত পাতুম?
প্রসাদ হালকা ধমকের সুরে বললেন, টাকা নিতে সম্মানে বাধে– না?
আপনের কাছে সম্মান-অসম্মানের কিছু আছে নিকি?
তাহলে?
একটু ভেবে দ্বিধাভরে ছেলেটি বলল, আমাগো ফেমিলির হাল তো সগলই জানেন। রোজগার পত্তর না করলে আর চলতে আছে না। কলেজ থিকা নাম কাটাইয়া দিছে। পড়াশুনা বন্ধ। দুইজনে চাকরি বাকরির লেইগা এইখানে ওইখানে ঘুরি। এরে-ওরে ধরি। বাকি সময়টা কী করুম? বাসায় জাগা নাই। তাই চায়ের দোকানে কি কারও বাড়ির বোয়াকে বইয়া কাটাইয়া দেই।
প্রসাদ গুম হয়ে বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, চাকরির জন্যে ঘোরাঘুরি করছিস! কই আমাকে জানাসনি তো?
জানাইলে আপনে রাইগা যাইতেন।
আরে আহাম্মকেরা, চেষ্টাচরিত্র করলে রিফিউজি কোটায় ছোটখাটো কিছু একটা পেয়ে যাবি। কিন্তু ম্যাট্রিকে, ইন্টারমিডিয়েটে ভাল রেজাল্ট করেছিস। থার্ড ইয়ারেও কিছুদিন ক্লাস করলি। গ্র্যাজুয়েটটা হতে পারলে কত ভাল চাকরি পাবি বল তো?
ছেলে দুটো চুপ করে থাকে।
প্রসাদ সদয় সুরে এবার বললেন, তোদের অবস্থা সবই জানি। পাকিস্তান থেকে আসার পর অনেক কষ্ট করেছিস। আর বছর দেড়েক দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে দে। বি এটা তোদর পাস করতেই হবে।
ফর্সা ছেলেটি বলল, কিন্তুক,
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রসাদ বললেন, কাল সকালে দুজনে তিন মাসের মতো মাইনের টাকা আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবি। কালই কলেজে গিয়ে নাম তোলার ব্যবস্থা কর। বাকি মাইনে পরের মাসে দিয়ে দেব। এখন যাও। সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মন দাও—
ছেলেদুটোর চোখ বাষ্পে ভরে গেছে। ধীরে ধীরে তারা উঠে পড়ে। কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে একবার প্রসাদকে দেখে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
প্রসাদের দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিল বিনয়। এই মানুষটিকে যত দেখছে ততই আপ্লুত হচ্ছে সে।
প্রসাদ তাকে লক্ষ করছিলেন না। গেলাসে এখনও খানিকটা চা রয়েছে। ছোট একটা চুমুক দিয়ে বললেন, ওই ফর্সা ছেলেটা হল হারু, কালো ছেলেটার নাম দুলাল। মুন্সিগঞ্জের কাছে কমলাপুর বলে একটা ছোট শহর আছে, জানো?
বিনয়ের মনে পড়ল, যে অল্পবয়সী ছেলেমেয়ের দঙ্গলটা পাউরুটি নিতে এসেছিল, প্রসাদ তাদের হারু আর দুলালকে খুঁজে বার করে তার কাছে পাঠিয়ে দিতে বলেছিলেন। খানিক আগে ভয়ে ভয়ে দুজনে যখন দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল তখনই আন্দাজ করা গেছে ওরা কারা।
বিনয় জানায়, কমলাপুরের নাম সে শুনেছে, তবে দেশে থাকতে কখনও সেখানে তার যাওয়া, হয়নি।
প্রসাদ বলতে লাগলেন, হারু আর দুলাল ওই শহরেরই ছেলে। একই সঙ্গে বড় হয়ে উঠেছে। লেখাপড়াও করেছে একসঙ্গে। দেশে থাকতেই ম্যাট্রিক আর ইন্টারমিডিয়েটটা পাশ করেছিল। দুটো পরীক্ষাতেই তাদের রেজাল্ট বেশ ভাল, ফাস্ট ডিভিসন, সঙ্গে দু-একটা লেটার।
প্ৰসাদ আরও জানালেন, দেশে হারুদের বিরাট অবস্থা ছিল। কমলাপুরের বাজারে ওর বাবা হরিপদ সরকারের ছিল মস্ত ধানচালের আড়ত। প্রচুর পয়সা। হারুদের মতো অতটা না হলেও দুলালদের ফ্যামিলিও যথেষ্ট সচ্ছল। ওদের ষাট কানির মতো জমি ছিল। বছরে তিনবার ফসল হতো। তাছাড়া অনেকটা জায়গা জুড়ে বসত-বাড়ি, পুকুর, নানারকম ফলের বাগান।
প্রসাদ বলতে লাগলেন, সব ফেলে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর মতো একদিন ওদেরও চলে আসতে– হল ইন্ডিয়ায়। দুলালের দূর সম্পর্কের এক মামা কলকাতায় পার্টিশানের অনেক আগে থেকেই ছিল। ওই যে দেখছ– আঙুল বাড়িয়ে রাস্তার ওধারের একটা বাড়ি দেখিয়ে দিলেন তিনি।
পাতলা ইটের গাঁথনি, মাথায় টিনের চাল, লোহার শিক বসানো ছোট ছোট জানালা-এইসব নিয়ে সারি সারি ঘর। বাইরে থেকে এটুকুই চোখে পড়ছে। বিনয়ের মনে হল, একটু ভাল ধরনের বস্তি। প্রচুর লোকজন ওই বাড়িটায় থাকে।
প্রসাদ বললেন, দুলালের মামা ওখানে হারু আর দুলালদের জন্য ঘরভাড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ধানচালের আড়তদার হারুর বাবা কালীঘাটে একটা ছোট কাপড়ের দোকান দিয়েছে। আর দুলালের বাবা জমিজমার মালিক পরিতোষ বণিক এখন ট্রেনে ট্রেনে হকারি করে বেড়াচ্ছে। চরম অভাব। তবু ছেলেদের নিয়ে দুই বাপের কিছু অ্যাম্বিশান ছিল। হারুকে আর দুলালকে চারুচন্দ্র কলেজে বি এতে ভর্তি করে দিয়েছিল তারা। ছেলেরা মানুষ হয়ে তাদের পেছনে দাঁড়াবে। সংসারের হাল ধরবে। এমনটাই ছিল তাদের আশা। তারপর কী হয়েছে, নিজের কানেই তো সব শুনলে
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়।
প্রসাদ চুপচাপ খানিকক্ষণ বসে থাকেন। কেমন যেন আত্মগত। কী ভাবছিলেন, কে জানে। তারপর হঠাৎ যেন সচেতন হয়ে উঠলেন, অনেক বেলা হয়ে গেছে। আর তোমাকে আটকে রাখব না। অফিসে দেখা হবে। দুটো নাগাদ চলে এস
আচ্ছা।
বিনয় ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে লক্ষ করল, শান্তিনিবাস জুড়ে এখন প্রচণ্ড ব্যস্ততা। সকালের সেই গড়িমসি ভাবটা নেই। নেই আলস্যের লেশমাত্র। সে যখন প্রসাদের সঙ্গে কথা বলছে তার মধ্যে কখন যে বোর্ডাররা কাজে বেরুবার জন্য তৈরি হতে শুরু করেছিল, টের পাওয়া যায়নি। সারিবদ্ধ ঘরগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বিনয়ের নজরে পড়ল, কেউ চুল আঁচড়াচ্ছে, কেউ ইস্তিরি-করা জামাকাপড় ভেঙে পরছে, কেউ হাত-ব্যাগে দরকারী কাগজপত্র গোছগাছ করে ভরে নিচ্ছে।
