সবে চাকরিতে জয়েন করেছে বিনয়। কবে সুধাদের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে উঠবে, স্পষ্ট করে ভাবেনি সে। যাবে যে, সেটাই শুধু ঠিক হয়ে আছে। এই শহরের রাস্তাঘাট অনেকটাই তার জানা। কিন্তু কোথায় গেলে নিরাপদ এবং নিঝাট একটা আস্তানা মিলবে, সে-সম্বন্ধে তার ধারণা নেই।
আজ শান্তিনিবাস-এ এসে মেসটাকে বেশ ভাল লেগে গেল বিনয়ের। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে প্রসাদ লাহিড়ি থাকেন। হৃদয়বান একটি মানুষ।
বিনয় জিজ্ঞেস করল, এই মেসে আপনি ছাড়া আর কারা থাকে?
লুচি চিবোতে চিবোতে বিনয়ের দিকে তাকালেন প্রসাদ, কেন বল তো?
এমনি। জানতে ইচ্ছে করল, তাই
প্রসাদ জানিয়ে দিলেন। নানা ধরনের বোর্ডার রয়েছে শান্তিনিবাস-এ। সরকারি অফিসের কেরানি, মার্চেন্ট অফিসের লেজার কিপার, কারখানার কর্মী স্কুল-মাস্টার, দুজন এম এ ক্লাসের ছাত্র, ইত্যাদি। সবাই খুব ভদ্র। এদের অনেকেরই বাড়ি হুগলি, চব্বিশ পরগনা, মেদিনীপুর কি বর্ধমান ডিস্ট্রিক্টের দূর দূর গ্রামে। শনিবার হাফ-ডে অফিস করে চাকুরেরা ট্রেন ধরতে শিয়ালদা কি হাওড়ায় ছোটে। অন্য কাজটাজ যারা করে তারাও তা-ই। ফেরে সেই সোমবার। তবে দুচারজন মেসে থেকে যায়। তারা বাড়ি যায় একমাস কি দুমাস বাদে।
প্রসাদ বললেন, শনিবার নটার পর থেকে সোমবার সন্ধে অব্দি শান্তিনিবাস প্রায় ফাঁকা। এই সময়টা আমরা কজন ঘাঁটি আগলে পড়ে থাকি। আমার তো আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। এই শান্তিনিবাস-ই আমার দেশ। বলে একটু হাসলেন।
এখানে বোর্ডারদের কীরকম খরচ পড়ে?
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিনয় কেন এত সব জানতে চাইছে, সে সম্বন্ধে প্রসাদের হয়তো কৌতূহল হচ্ছিল, কিন্তু তিনি কোনও প্রশ্ন করলেন না। বললেন, পুরো একটা ঘর নিয়ে থাকলে মাসে ভাড়া পঁচিশ টাকা। অন্যের সঙ্গে শেয়ার করলে সিট রেন্ট পনেরো টাকা। আর দুবেলা মিলের জন্যে কুড়ি টাকা। তবে চা আর সকাল বিকেলের জলখাবার দেওয়া হয় না। সেটা নিজেদের আলাদা কিনে খেতে হয়।
একটা আধবয়সী লোক–মাথায় কাঁচাপাকা চুল, ক্ষয়াটে চেহারা, ভাঙা গাল, পরনে খাটো ধুতি ফতুয়া আর চাদর–দুগেলাস চা দিয়ে গেল। নিশ্চয়ই শোভা কাফে থেকে পাঠানো হয়েছে তাকে।
লুচি-সন্দেশ খাওয়া হয়ে গেছে। জল খেয়ে চায়ের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে বিনয় ভাবছিল এজমালি ঘরে থাকলে খাওয়া দাওয়া মিলে মাসে সবসুদ্ধ পঁয়ত্রিশ টাকা। খুব একটা বেশি নয়। তার মনে হয়েছিল, মেসের খরচ কম করে এর দু-আড়াই গুণ পড়বে।
প্ৰসাদ কী একটু ভেবে বললেন, স্বাধীনতার আগে আমার এই ঘরটার জন্যে মান্থলি দিতে হতো সাত টাকা, আর দুবেলা মিলের জন্যে বারো টাকা। কবছরে খরচ অনেক গুণ বেড়ে গেছে।
বিনয় উত্তর দিল না। চুপচাপ শুনে যেতে লাগল।
প্রসাদ থামেননি, মেস মালিকের আর কী দোষ? জিনিসপত্রের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে চড়ছে, চার্জ না বাড়িয়ে সে-ই বা কী করবে? না পোষালে মেস চালিয়ে কী লাভ?
বিনয় মাথা হেলিয়ে সায় দিল, হ্যাঁ
প্রসাদ বললেন, আগে চল্লিশ টাকায় চার পাঁচজনেব একটা ফ্যামিলির দিব্যি হেসে খেলে চলে যেত। এখন দিনকাল যা পড়েছে, সাধারণ মানুষ কী করে যে টিকে থাকবে, কে জানে। চাল ডাল মাছ মাংস জামা কাপড়–সব আগুন। ছেলেমেয়ে থাকলে পড়ার খরচ, অসুখ বিসুখ হলে চিকিৎসার খরচ, বাড়ি ভাড়া–সমস্ত কিছু ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে।
প্রসাদের দুশ্চিন্তা এবং আক্ষেপের মধ্যেই ভেতর দিকের বারান্দা থেকে একটা গলা শোনা গেল, আমাগো ডাকছিলেন প্রসাদকাকা?
বিনয় লক্ষ করল, দুটি যুবক, বয়স উনিশ কি কুড়ি, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। একজন শ্যামবর্ণ, আর-একজনের রং ফর্সা। একজনের পরনে পাজামা আর শার্টের ওপর হাফ-হাতা সোয়েটার। অন্য যুবকটি পরেছে সস্তা ঢোলা ফুলপ্যান্ট আর একটা মোটা খদ্দরের জামা। এই ঠাণ্ডাতেও তার সোয়েটার বা চাদর টাদর কিছু নেই। দুজনের পোশাকআশাক খুবই খেলো। চেহারায় চরম দুর্দশা আর অভাবের ছাপ।
প্রসাদ ঘুরে বসে ছেলে দুটিকে এক পলক দেখেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। গলার শির ছিঁড়ে চিৎকার করে উঠলেন, হারামজাদা রাসকেল, জুতোর বাড়ি মেরে তোমাদের ছাল তুলে ফেলব। রাগে গনগন করছে মুখ। উত্তেজনায় কাঁপছে গলার স্বর।
প্রসাদের দিকে তাকিয়ে হকচকিয়ে গেল বিনয়। চোখের পলকে একটা মানুষ যে এতখানি বদলে যেতে পারে, সে কল্পনাও করতে পারেনি।
মাথা নিচু করে ছেলে দুটো নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। পাংশু মুখ। ভয়ে কাঁচুমাচু।
আরও কিছুক্ষণ তোড়ে বকাবকি করলেন প্রসাদ। দুই যুবকের মুখ থেকে টু শব্দটিও বেরুলো না। নতচোখে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। যেন দুটো কাঠের পুতুল।
ওদের অপরাধ যে কী, প্রসাদ তাদের দেখামাত্র কেন যে এমন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন, কিছুই আঁচ করা যাচ্ছে না। ভীষণ অস্বস্তি বোধ করতে থাকে বিনয়।
একটানা অগ্ন্যুৎপাতের পর একসময় শান্ত হলেন প্রসাদ। সেই আগেকার মানুষ। নরম, মৃদুভাষী, স্নেহপ্রবণ। ছেলেদুটোকে কোমল গলায় বললেন, দয়া করে ভেতরে এস
ঘরে ঢুকে ওরা দাঁড়িয়ে থাকে। প্রসাদ বললেন, কী রে, বসতে বলতে হবে নাকি?
ছেলেদুটো ঘরের কোণ থেকে মোড়া এনে জড়সড় হয়ে বসে পড়ে। প্রসাদ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, কী শুনছি তোদের সম্বন্ধে? পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে দিনরাত্রি নাকি চায়ের দোকানে আর রকে বসে আড্ডা দিচ্ছিস? সত্যি?
