নিচে এসে দেখা গেল, সেই বড় চৌকো চাতালটায় চার পাঁচজন চৌবাচ্চা থেকে মগে জল তুলে ঝপাঝপ মাথায় ঢালছে। ওধারের কিচেনের গা ঘেঁষে যে একটা খাওয়ার ঘর রয়েছে, তখন লক্ষ করেনি বিনয়। জায়গাটা ঘুপচিমতো। তাই দিনের বেলাতেই আলো জ্বালতে হয়েছে। দেখা গেল, ওই ঘরের মেঝেতে আসনে বসে চার পাঁচজন খাচ্ছে। কাজের লোকেদের ত্বরিত পায়ে ছোটাছুটি, বোর্ডারদের হাঁকডাকে মেস-বাড়ি সরগরম।
.
২৯.
শান্তিনিবাস থেকে বেরিয়ে, মহেশ হালদার লেন পেছনে ফেলে বড় রাস্তায় চলে এল বিনয়। হরিশ পার্কের পাশের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রসাদ লাহিড়ির মুখ বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে। রোগা, খেতে না পাওয়া রিফিউজি ছেলেমেয়েদের হাতে সযত্নে পাউরুটি তুলে দেওয়া, তাদের প্রতি তার অসীম মমতা, হারু আর দুলালকে দেখে রাগে ফেটে পড়া–সমস্ত কিছু চোখের সামনে ভাসছে। ছবির মতো। তার কথাগুলো কানে বেজে চলেছে একটানা।
কাল অফিসে প্রসাদ বলেছিলেন, নানা জায়গার খবরের কাগজ ঘেঁটে চমকদার ঘটনা বা বিস্ময়কর কোনও মানুষের সন্ধান পাওয়া গেলে তা নিয়ে নতুন ভারত-এর জন্য যেন স্টোরি তৈরি করে বিনয়। অন্য বিষয় নয়, তাকে শুধু ইস্ট আর ওয়েস্ট পাকিস্তানের শরণার্থীদের, বা তাদের সঙ্গে জড়িত অন্য সব মানুষ সম্পর্কে লিখতে বলা হয়েছে। বানানো গল্প নয়, রিয়েল লাইফ স্টোরি। এই মুহূর্তে হঠাৎ বিনয়ের মনে হল, প্রসাদ লাহিড়ির মতো একজন মানুষকে নিয়ে লেখা একান্ত উচিত। ভাবল, শেষ পর্যন্ত যদি লিখেও ফেলে সেটা তার হাতেই তুলে দিতে হবে। ব্যাপারটা কীভাবে। নেবেন প্রসাদ?
হরিশ পার্ক, মিত্র ইনস্টিটিউশন পেরিয়ে বাঁ পাশের গলি দিয়ে আশুতোষ মুখার্জি রোডে চলে এল বিনয়। অফিস টাইম শুরু হয়ে গেছে। এসপ্ল্যানেড আর ডালহৌসির দিকের ট্রাম-বাসগুলো ভিড়ে ঠাসা। সেগুলোর ভেতর মাছি গলার উপায় নেই। তবু এক-একটা স্টপেজে গাড়ি থামলেই অদ্ভুত কসরতে অফিসের বাবুরা ঠেলেঠুলে ওই বাদুড়ঝোলা ভিড়ের মধ্যেই উঠে পড়ছে।
রাস্তা পেরিয়ে বিনয় ওধারের ফুটপাথে চলে গেল। বালিগঞ্জ টালিগঞ্জের গাড়িগুলো এ-সময় ফাঁকা থাকে। জনস্রোত এখন শুধু ডালহৌসির অফিসপাড়ার দিকে।
টালিগঞ্জের বাস দু-একটা আসছে ঠিকই, তবে ট্রামের পাত্তা নেই। টিনের লম্বা লম্বা বাক্সের মতো কলকাতার বাসগুলো মোটেই পছন্দ করে না বিনয়। ঝকর ঝকর করে থামতে থামতে যায়। ঝাঁকুনিতে হাড়-মাংস আলগা হবার উপক্রম। সেই তুলনায় ট্রামে চড়াটা অনেক আরামের। বোগির ভেতর যথেষ্ট জায়গা। দাঁড়িয়ে গেলেও অসুবিধে হয় না। কোনওরকম ঝকিটাকি নেই। গতিও খুব মসৃণ।
ট্রামের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বিনয়ের চোখে পড়ল, ফুটপাথের একধারে মোটা চট বিছিয়ে একটি এগারো বারো বছরের মেয়ে দোকান সাজিয়ে বসেছে। রকমারি জিনিস। খাতা, পেন্সিল, কালি, রাবার, বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়, লক্ষ্মীর পাঁচালি, সরল হোমিওপ্যাথি শিক্ষা, ধারাপাত, কাঠের স্কেল, ধূপকাঠির প্যাকেট, পঞ্জিকা, ম্যাজিক শেখার বই, রান্নার বই ইত্যাদি।
বিনয় লক্ষ করল, মেয়েটির গা ঘেঁষে একটা মলিন কাপড়ের ব্যাগ। সেটার ওপর ব্রাউন পেপারের মলাট দেওয়া কটি বই। লোকজন এসে পঞ্জিকা কি খাতাটাতা কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তবে সবসময় তো খদ্দের থাকে না। বিকিকিনির ফাঁকে একটা মুহূর্তও মেয়েটা নষ্ট করছে না। খদ্দের চলে গেলেই পাশ থেকে মলাট লাগানো বই তুলে নিয়ে একমনে পড়ে যায়। কী পড়ছে সে? ভীষণ কৌতূহল হল বিনয়ের। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সে। মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল কিন্তু কী বই বোঝ যায় না। রাস্তায় বসে কে কী পড়ছে না-পড়ছে সেটা জানা এমন কিছু জরুরি ব্যাপার নয়। তবু ছেলেমানুষী কৌতূহলটা কিছুতেই কাটানো যাচ্ছে না। আবার সরাসরি জিজ্ঞেস করতেও বাধছে।
বিনয়ের মাথায় আচমকা একটা ফন্দি এসে গেল। দরকার নেই, তবু একটা মোটা খাতা, পেন্সিল আর রাবার তুলে নিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, এগুলোর দাম কত?
বিনয় যখন খাতাটাতা বাছাবাছি করছে, হাতের বই বন্ধ করে পাশে রেখে দিয়েছিল মেয়েটি। মনে মনে হিসেব করে বলল, চৌদ্দ পয়সা–
পকেট থেকে মানি ব্যাগ বার করতে করতে মেয়েটিকে ভাল করে লক্ষ করল বিনয়। গায়ের রং মাজা মাজা। পাতলা গড়ন। কৃশই বলা যায়। তবে মুখখানা বেশ ঢলঢলে। পরমাশ্চর্য তার দুই চোখ। টানা টানা, উজ্জ্বল। সমস্ত চেহারায় ঝকঝকে বুদ্ধির ছাপ।
মেয়েটির হাতে দাম দিতে দিতে বিনয় জিজ্ঞেস করে, রোজই তুমি এখানে দোকান খুলে বসো?
কোনও জড়সড় ভাব নেই। সোজাসুজি বিনয়ের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি বলল, হ।
তোমার কী নাম?
আরতি পাল।
বন্ধ বইটা দেখিয়ে বিনয় বলে, ওটা পড়ছিলে না?
আস্তে মাথাটা হেলিয়ে দেয় আরতি, হ।
কী বই ওটা?
ভূগোল।
বেশ অবাক হল বিনয়, তুমি কি পড়াশোনা কর?
আরতি বলল, হ। দেশবন্ধু বালিকা বিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ি।
হঠাৎ কী খেয়াল হতে বিনয় বলল, তোমার স্কুল কটায় বসে?
আরতি বলল, দশটায়।
খানিক দূরে একটা মস্ত ঘড়ির দোকানের মাথায় গোলাকার প্রকাণ্ড ঘড়ি আটকানো রয়েছে। এক ঝলক সেটা দেখে বিনয় বলল, এখন নটা বেজে সাতচল্লিশ। স্কুলে কখন যাবে? তাকে চিন্তিত দেখাল।
