আচ্ছা ।
কথা বলতে বলতে প্রসাদের দেওয়া কাগজটার ভাজ খুলে চোখ বুলোতে থাকে বিনয়। দেশ নেতাদের নামে কলোনিগুলোর নাম। নেতাজি সুভাষ কলোনি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন কলোনি। মহাত্মা গান্ধি কলোনি ইত্যাদি। সরকারি ত্রাণশিবিরগুলোর কোনও নাম নেই। তবে সেগুলোর ঠিকানা কলকাতার আশেপাশে।
প্রসাদ বললেন, তুমি কি জানো, সেকেন্ড গ্রেট ওয়ারের সময় কলকাতা আমেরিকান আর ব্রিটিশ টমিতে ছেয়ে গিয়েছিল?
শুনেছি।
সিটিতে তো বটেই, আউটস্কার্টে মিলিটারি থাকার জন্যে অনেক ব্যারাক তৈরি করা হয়েছিল। যুদ্ধ থামলে টমিরা যে-যার দেশে ফিরে যায়। তারপর বেশির ভাগ ব্যারাক ভেঙে ফেলা হয়। যে কটা আস্ত রয়েছে এখন রিফিউজিদের রিলিফ ক্যাম্প।
বিনয় বলল, আপনি ক্যাম্পগুলোর যে অ্যাড্রেস দিয়েছেন তার মধ্যে ঢাকুরিয়া লেকের একটা ব্যারাকও রয়েছে। কিন্তু
কী?
আমি ওই লেকে একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম। একটা ভাঙাচোরা ব্যারাকও দেখেছি। সেটা রিলিফ ক্যাম্প নয়। কোনও রিফিউজিও চোখে পড়েনি। একদম ফাঁকা।
তুমি যে ব্যারাকটার কথা বললে সেটা বাচ্চাদের সুইমিং পুলের কাছাকাছি তো?
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়, হ্যাঁ
প্রসাদ বললেন, ওটা ছাড়াও আরও একটা ব্যারাক আছে। সেটা ভাঙা হয়নি। ওখানে ক্যাম্প বসানো হয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি সাদার্ন অ্যাভেনিউতে একটা হাসপাতাল দেখেছ?
বিনয় জানে, যুদ্ধের সময় শুধুমাত্র মিলিটারির জন্য ওই হাসপাতালটা করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর অবশ্য সবার জন্য ওটা খুলে দেওয়া হয়। মুকুন্দপুর থেকে এসে যুগল ওখানে পা ড্রেস করিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন আগে হিরণদের সঙ্গে সে লেকে বেড়াতে গিয়েছিল, হাসপাতালটা তখন তার চোখে পড়েছে।
বিনয় বলল, দেখেছি।
প্রসাদ বললেন, আমি যে ব্যারাকটার কথা বলছি সেটা হাসপাতালটার উলটো দিকে, একটু কোনাকুনি, লেকের ভেতরে। চারপাশে এত গাছপালা যে হঠাৎ চোখে পড়ে না।
বিনয় ভাবল, প্রসাদের কথাই হয়তো ঠিক। সেদিন লেকে প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছিল কিন্তু রিলিফ ক্যাম্পটা তার নজর এড়িয়ে গেছে।
প্রসাদ বললেন, আমার লিস্টটায় দেখ, লেকের কাছাকাছি আরও কটা রিলিফ ক্যাম্পের অ্যাড্রেস আছে। লেকের ক্যাম্পটায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা নিশ্চয়ই অন্যগুলো দেখিয়ে দেবে।
একটা ঢ্যাঙা মতো ছেলে ঘরে এসে ঢুকল। বয়স ষোল সতেরো। সবে কৈশোর পেরিয়েছে। ঠোঁটে খুব মিহি গোঁফের রেখা। মুখেচোখে সারল্য মাখানো। ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল। পরনে আধময়লা পাজামা, ছিটের হাফ শার্ট। শার্টের ওপর সস্তা আলোয়ান। পায়ে পুরানো, খেলো চটি। ছেলেটার একটা হাতে শালপাতার বড় ঠোঙা, মাটির ভাঁড়। আর-এক হাতে কাগজের চৌকো একটা বাক্স।
বিনয় আন্দাজ করে নিল–সুবল।
প্ৰসাদ এক পলক সুবলকে দেখে বললেন, এসে গেছিস? ভেরি গুড। এক কাজ কর, ওখান থেকে কাপ আর গেলাস এনে ভাল করে ধুয়ে লুচি টুচি আর খাবার জল আমাদের দুজনকে দে বলে ঘরের কোণের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলেন। সেখানে একটা নিচু জলচৌকির ওপর কয়েকটা কাপ প্লেট আর কাঁচের গেলাস রয়েছে।
হাতের ঠোঙা, ভাড়টাড় লেখার টেবলে রেখে প্লেট গেলাস নিয়ে বেরিয়ে গেল সুবল। সেগুলো পরিষ্কার করে ধুয়ে এনে চটপট খাদ্যবস্তুগুলো দুভাগ করে বিনয় এবং প্রসাদকে দিয়ে, জিজ্ঞেস করল, আর কিছু করন লাগব?
না। নিজের প্লেট থেকে দুটো লুচি, খানিকটা ডাল এবং একটা সন্দেশ সুবলের হাতে দিয়ে প্রসাদ বললেন, যা–
মাথা নিচু করে সুবল বলল, যহনই কিছু আনি আমারে হেইর থিকা দ্যান
প্রসাদ ধমকে ওঠেন, পাকামি করতে হবে না। যাও
সুবল নিঃশব্দে চলে গেল।
বিনয় বলল, কথা শুনে মনে হল সুবল ইস্ট বেঙ্গলের ছেলে
হ্যাঁ। রিফিউজি। কয়েক মাস হল পাকিস্তান থেকে চলে এসেছে। প্রসাদ বলতে লাগলেন, ভাল ফ্যামিলির ছেলে। ব্রাহ্মণ। ফরিদপুরে বাড়ি। বেশ কিছু জমিজমা ছিল। ফর্টি সিক্সের রায়টে ওর বাবা খুন হয়ে যায়। তারপরও দেশেই মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে। একসময় আর পারল না। সর্বস্ব ফেলে মা আর বোনকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে আসতে হল। লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু টাকা আনতে পেরেছিল। শিয়ালদা স্টেশনে দিন পনেরো কাটিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করে শেষ পর্যন্ত আমাদের পাড়ার এক বস্তিতে ঘর ভাড়া নিয়ে উঠে এসেছে। বাঁচতে তো হবে। তাই ছেলেটা এই মেসের চাকরগিরি করছে। কী হতে পারত আর কী হয়ে গেল! এরকম হাজার হাজার ইয়ং বয় তুমি দেখতে পাবে, পার্টিশান তাদের ফিউচার ধ্বংস করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ নিঝুম বসে রইলেন তিনি। তারপর হঠাৎ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, এ কি, হাত গুটিয়ে বসে আছ যে? খাও–খাও-লুচি ঠাণ্ডা হলে জুতোর চামড়া হয়ে যায়।
খেতে খেতে কয়েক দিন আগের একটা পুরানো ভাবনা আচমকা বিনয়ের মাথায় ফিরে এল। সে ঠিক করে রেখেছিল, চাকরি বাকরি কিছু একটা হলে আর সুধাদের কাছে থাকবে না। অন্য কোথাও নিজের ব্যবস্থা করে নেবে। বিনয় জানে, এই কথাটা তার মুখ থেকে খসার সঙ্গে সঙ্গে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে যাবে। হিরণ, দ্বারিক দত্ত বা সরস্বতী, কেউ রাজি হবেন না। বরং শতভাবে তাকে নিজেদের কাছে ধরে রাখতে চেষ্টা করবেন। আর সুধা তো কেঁদে কেটে জগৎ সংসার ভাসিয়ে দেবে। হিরণদের কাছে তার আদরযত্নের ত্রুটি নেই। ওরা তাকে মাথায় করে রেখেছে। সবই ঠিক। তবু ওটা তার ছোটদির শ্বশুরবাড়ি। আসলে দ্বিধাটা রয়েছে তার নিজের মধ্যে। বাধাটা আসছে ভেতর থেকে। সারা জীবন বোনের শ্বশুরবাড়িতে পড়ে থাকার কথা ভাবা যায় না। তার পৌরুষ, তার আত্মসম্মানবোধ কোনও ভাবেই তা মেনে নেবে না।
