বিনয় গুনে গুনে দেখল সবসুদ্ধ তেরোটি ছেলেমেয়ে। বোগা নোগা চেহারা। গর্তে-বসা চোখ। শুকনো, ফাটা ফাটা চামড়া থেকে খড়ি উড়ছে। সারা গায়ে অপুষ্টির ছাপ। আচ্ছাদন বলতে ময়লা, তালিমারা ইজের আর ছিটের জামার ওপর ছেঁড়াখোঁড়া সোয়েটার বা চাদর। কারও চাদর টাদর কিছুই জোটেনি। দুহাতে বুক চেপে ধরে শীতে কাঁপছে।
ছেলেমেয়েগুলো সমানে কলবল করে চলেছে, আমরা আইয়া গ্যাছি, আমরা আইয়া গ্যাছি।
প্রসাদ হেসে হেসে বললেন, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। একজন একজন করে এসে নিয়ে যা।
এতটুকু হুড়োহুড়ি নেই। প্রসাদ যেমনটি বললেন ঠিক তেমনি সুশৃঙ্খলভাবে এক এক করে ছেলেমেয়েগুলো ঘরে ঢুকে তার হাত থেকে দুপিস করে চিনি আর মাখন লাগানো রুটি নিয়ে ফের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে লাগল। রুটি বিলি শেষ হলে তিনি ওদের জিজ্ঞেস করলেন, আসার সময় দুলাল আর হারুকে তোরা দেখেছিস?
দরজার মুখ থেকে ছেলেমেয়েগুলো সমস্বরে জানালো, দেখেনি।
প্রসাদ বললেন, এখন যা। ওদের খুঁজে বার করে বলবি, আমি ডেকেছি। এক্ষুনি যেন চলে আসে।
আইচ্ছা—
নিমেষে দরজার কাছ থেকে বাচ্চাগুলো উধাও। তাদের পায়ের আওয়াজ সামনের বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে মিলিয়ে যেতে লাগল।
প্রসাদের কার্যধারার তল খুঁজে পাচ্ছিল না বিনয়। এতক্ষণ অপার বিস্ময়ে সে তাকে দেখে যাচ্ছিল। এবার জিজ্ঞেস করল, ওই ছেলেমেয়েগুলো কারা? মনে হল ইষ্ট বেঙ্গলে ওদের বাড়ি ছিল—
হ্যাঁ– প্রসাদ মাথা নাড়লেন, ওরা রিফিউজি। রিসেন্টলি পাকিস্তান থেকে এসেছে। এই পাড়ারই। বস্তি টাইপের বাড়িতে থাকে।
বিনয়ের মনে পড়ল, খানিকক্ষণ আগে পাউরুটি কাটতে কাটতে নিউট্রিশনের কথা বলছিলেন প্রসাদ। খুব সম্ভব তাঁর মাথায় এই বাচ্চাগুলোর চিন্তাই ঘুরছিল। সে বলল, রোজই ওরা এসে রুটি নিয়ে যায়?
বেশির ভাগ দিনই। তবে রোজ এক খাবার কি ভাল লাগে? মাঝে মাঝে বদলে দিই। কোনও দিন হয়তো দিলাম মুড়ি মুড়কি কি চিড়ে গুড়।
– একটু চুপচাপ।
তারপর প্রসাদ ফের শুরু করেন, ওরা কেউ এসেছে খুলনা থেকে, কেউ বরিশাল থেকে, কেউ ঢাকা কিংবা ফরিদপুর থেকে। ওদের বাবা-মায়েরা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে শিয়ালদা স্টেশনে পড়ে থাকেনি, রিলিফ ক্যাম্পে গিয়ে ভিড় বাড়ায়নি। দেশ থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু পয়সাকড়ি আনতে পেরেছিল। তার কিছুটা দিয়ে এখানকার বস্তিতে ঘরভাড়া নিয়েছে। বাকিটা দিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা বা অন্য কিছু করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। গভর্নমেন্টের খয়রাতির আশায় ভিখিরির মতো বসে থাকার এতটুকু ইচ্ছে নেই। ওদের আত্মসম্মান বোধ আর ফাইটিং স্পিরিটকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু প্রসাদ বিশদভাবে আরও জানালেন, এখন যা রোজগার করে তাতে দুবেলা পেট ভরে বউ-বাচ্চাদের খাওয়াতে পারে না। তাই ওই ছেলেমেয়ে কটার সকালের খাবার আমি দিই।
কাল এই মানুষটিকে নতুন ভারত-এর অফিসে গম্ভীর আর স্বল্পভাষী মনে হয়েছিল। খবরের কাগজের কাজকর্মের বাইরে একটি কথাও বলেননি। নতুন ভারত বেরুবার পর কীভাবে তার সার্কুলেশন বাড়ানো যাবে, পাঠক টানতে কোন কোন বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হবে, এই নিয়েই মগ্ন ছিলেন। কিন্তু আজ অন্য এক প্রসাদ লাহিড়িকে দেখতে পেল বিনয়। কোমল। সহৃদয়। মমতাময়। একই মানুষের ভেতর গোপনে কতরকম মানুষ যে থাকে! খুব কাছাকাছি না এলে টেরই পাওয়া। যায় না।
প্রসাদ লাহিড়ি মলিন মুখে বলতে লাগলেন, এই পাড়াতেই আরও অনেক রিফিউজি ছেলেমেয়ে রয়েছে। সবার জন্যে তো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি না। আমার আর কতটুকু ক্ষমতা! হঠাৎ কী খেয়াল হতে ধড়মড় করে ইজিচেয়ার থেকে উঠে পড়লেন, ওই দেখ, এতক্ষণ এসেছ। এখনও চাটা কিছু দেওয়া হয়নি।
বিনয় বিব্রতভাবে কী বলতে যাচ্ছিল, বলা হল না। ততক্ষণে ভেতর দিকের বারান্দায় চলে গেছেন প্রসাদ। গলা চড়িয়ে ডাকতে লাগলেন, সুবল-সুবল–একতলা থেকে সাড়া দিতেই তাকে চেঁচিয়ে বললেন, গৌরাঙ্গ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে আটখানা লুচি, ছোলার ডাল আর চারটে নলেন গুড়ের সন্দেশ নিয়ে আয়। ঠাণ্ডা লুচি থাকলে নিবি না। গরম গরম ভাজিয়ে আনবি। আসার সময় শোভা কাফেতে বলবি দুগেলাস স্পেশাল চা যেন দিয়ে যায়। দুজায়গায় আমার নামে খাতায় লিখে রাখতে বলিস। চটপট চলে আসবি। বাইরে গিয়ে আবার আড্ডায় জমে যেও না।
খাতায় লিখে রাখার ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল না বিনয়ের।
আপ্যায়নের বন্দোবস্ত করে ঘরে ফিরে এলেন প্রসাদ। লেখার টেবলের ওপর ভাজকরা এক তা ফুলস্ক্যাপ কাগজ পেপার ওয়েট চাপা দেওয়া ছিল। সেটা এনে বিনয়ের হাতে দিয়ে ইজিচেয়ারে বসে পড়তে পড়তে বললেন, এটায় কলকাতার কাছাকাছি নটা রিফিউজি কলোনি আর পাঁচটা সরকারি রিলিফ ক্যাম্পের ঠিকানা রয়েছে। আপাতত এগুলো দিয়েই কাজ শুরু কর। পরে আরও লিস্ট দেব। তাতে দূরের ক্যাম্প ট্যাম্পের অ্যাড্রেস থাকবে। তাছাড়া
উৎসুক চোখে প্রসাদের দিকে তাকায় বিনয়। তাছাড়া কী?
এখন ফাঁকা পোড়ো জমি, জলা জায়গা টায়গা পেলেই রিফিউজিরা বসে পড়ছে। নতুন নতুন এত জবরদখল কলোনি মাথা তুলছে যে সবগুলোর হদিস পাওয়া মুশকিল। তোমাকে তত চারদিকে ঘোরাঘুরি করতে হবে। নতুনগুলোর খোঁজ নিও
