পেছন দিকের মতো ঘরটার সামনেও রাস্তার দিকে বারান্দা। ওধারের দরজা জানালাও খোলা রয়েছে। তার ফাঁক দিয়ে ঝলমলে রোদ এসে পড়েছে ঘরের ভেতর।
বিনয় লক্ষ করল, প্রসাদের হাতে একটা লম্বা ছুরি। তার ইজিচেয়ারের সামনে একটা বড়সড় নিচু টেবল। টেবলটার ওপর একধারে পাউরুটির টুকরোর স্থপ। তা ছাড়া দুটো এক পাউন্ড ওজনের রুটি এখনও আস্ত রয়েছে। পেছন থেকে দেখা যায়নি, এখন বোঝা গেল, তিনি রুটি কাটছিলেন। সাঁ সাঁ আওয়াজের কারণটাও জানা গেল। নিচু টেবলটার কাছেই একটা কেরোসিনের স্টোভ জ্বলছে। তবে সেটার তেজ কমিয়ে রাখা হয়েছে। স্টোভটার মাথায় একটা পলসন বাটারের মুখ কাটা কৌটো বসানো। শীতে মাখন জমে শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আগুনের তাপে অল্প অল্প গলতে শুরু করেছে।
ঘরের একধারে কটা মোড়া পর পর দাঁড় করিয়ে রাখা আছে। সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে প্রসাদ বললেন, একটা মোড়া এনে আমার কাছে বোসা।
এই পাহাড়প্রমাণ পাউরুটি দিয়ে প্রসাদ কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিল না বিনয়। অবাক চোখে তাকে দেখতে দেখতে একটা মোড়া নিয়ে এসে বসে পড়ল সে।
রুটি কাটা চলছেই প্রসাদের। প্রতিটি স্লাইস ইঞ্চি খানেকের মতো পুরু। কাটতে কাটতে এক পলক পড়ার টেবলের ঘড়িটা দেখে নিয়ে বললেন, তোমার সাড়ে-আটটা পৌনে নটায় আসার কথা ছিল। এখন সবে আটটা বেজে সাত। এত আগে না এলেই হতো।
বিনয় থতমত খেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি চলে আসায় প্রসাদ বিরক্ত হয়েছেন কি না, বোঝা যাচ্ছে না। ভয়ে ভয়ে সে বলল, আমি আর্লি-রাইজার। সাড়ে-পাঁচটা ছটার ভেতর ঘুম ভেঙে যায়। ভাবলাম, বাড়িতে বসে থেকে কী করব? তাই চলে এলাম। একটু থেমে ফের বলে, আপনার হয়তো অসুবিধে হল–
মাথা নাড়তে নাড়তে প্রসাদ বললেন, একেবারেই না। শীতের দিনে সকাল সকাল উঠে এতটা আসতে কষ্ট হবে, তাই একটু দেরি করে আসতে বলেছিলাম। সে যাক, আগে আগে এসেছ। ভালই হয়েছে। খানিকক্ষণ বেশি গল্প করা যাবে।
প্রসাদ অসন্তুষ্ট হননি। অস্বস্তি কেটে গেল বিনয়ের। প্রসাদ বলতে লাগলেন, কাল রাতে অফিস থেকে ফিরে কলকাতার চারপাশের রিফিউজি কলোনি আর রিলিফ ক্যাম্পের অ্যাড্রেস–যতগুলো আমার কাছে রয়েছে–সব একটা কাগজে তোমার জন্যে লিখে রেখেছি। হাতের কাজটা সেরে তোমাকে সেটা দিচ্ছি। তা আমাকে একটু হেল্প কর না। তাহলে কাজটা কুইকলি হয়ে যাবে।
বিনয় বলল, কী করতে হবে বলুন
টেবলের ওপর শুধু পাউরুটিই না, একটা বড় টিনের কৌটো এবং আরও একটা ছুরি রয়েছে। ছুরিটা বিনয়কে দিয়ে, কৌটোটা দেখিয়ে প্রসাদ বললেন, এটার ভেতর চিনি আছে। স্টোভের আঁচে মাখন গলে গেছে। তুমি রুটির স্লাইসগুলোতে ছুরি দিয়ে মাখন লাগিয়ে তার ওপর চিনি ছড়িয়ে দাও
প্রসাদ লাহিড়ি মানুষটাকে অদ্ভুত লাগছিল। এইসব মাখন রুটির সদ্গতি কীভাবে হবে, কে জানে। রুটিতে মাখন মাখাতে মাখাতে এবং সেগুলোর ওপর চিনি ছড়াতে ছড়াতে নিজের অজান্তেই ফস করে বিনয় জিজ্ঞেস করল, এত রুটি কে খাবে?
প্রসাদ বললেন, আমার পাওনাদারেরা।
পাওনাদার!
হ্যাঁ। একটু ওয়েট কর। দশ পনেরো মিনিটের ভেতর তারা চলে আসবে।
বিনয় তাকিয়ে থাকে।
প্রসাদ থামেননি, নিউট্রিশনের জন্যে মাখনটা খুব দরকার, তাই না?
নতুন ভারত-এর এই চিফ রিপোর্টারটির কথাবার্তার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কার তার পাওনাদার, কাদের নিউট্রিশন দরকার, কে বলবে। সবই ধাঁধার মতো। বিনয় আস্তে আস্তে ঘাড়টা কাত করে শুধু।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। দুজনের হাত ত্বরিত গতিতে চলছে।
একসময় প্রসাদ বললেন, তুমি কিছুদিন হল পাকিস্তান থেকে চলে এসেছ। টালিগঞ্জে এক দিদির কাছে থাক। আর কে কে আছেন তোমার?
বিনয় আন্দাজ করে নিল, তার সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে চান প্রসাদ। ঝিনুককে বাদ দিয়ে বাকি সবার কথা বলে গেল সে।
প্রসাদ বিষণ্ণ সুরে বললেন পাকিস্তান থেকে চলে এসে ভাল করেছ। তোমার দাদুকেও খবর পাঠাও, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন ইন্ডিয়ায় চলে আসেন।
অনেক বুঝিয়েছি। লোক দিয়ে চিঠিও পাঠিয়েছি। তিনি আসবেন না।
আবার নীরবতা।
শান্তিনিবাস-এর বাসিন্দা সাংবাদিকটি সম্পর্কে ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল বিনয়ের। সে বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করব প্রসাদদা?
নির্ভয়ে।
আপনি এই মেসে কতদিন আছেন?
অ্যাবাউট টোয়েন্টি ইয়ার্স।
চোখ গোল হয়ে যায় বিনয়ের। কুড়ি বছর!
প্রসাদ হাসলেন।
বিনয় বলল, আপনার বাড়ির আর সবাই?
কেউ নেই আমার। রাজশাহী ডিস্ট্রিক্টে আমাদের দেশ ছিল। এখন পাকিস্তান। আমি নাইনটিন টোয়েন্টিতে কলকাতায় চলে আসি। লেখাপড়া, চাকরি, সব এখানে। শুরু থেকে মেসেই আছি। এক মেস থেকে আর-এক মেস। এইভাবে সাত আটবার আস্তানা পালটে শেষ পর্যন্ত শান্তিনিবাস-এর পার্মানেন্ট বোর্ডার। মা-বাবা দেশে থাকতেন। পার্টিশানের আগে মারা গেছেন। আমাকে মুক্ত-পুরুষ বলতে পার। রাজশাহী পাকিস্তানে পড়লেও আমি তোমাদের মতো রিফিউজি নই। বয়স পঞ্চাশ হতে চলল। বাকি দিনগুলো এই মেসেই কেটে যাবে।
প্রসাদের কথা শেষ হতে না-হতেই ভেতর দিকের বারান্দায় দুদ্দাড় পায়ের আওয়াজ। পরক্ষণে দরজার কাছে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ের মুখ দেখা দিল। বয়স সাত-আট থেকে এগারো-বারো। ঘুরে বসে প্রসাদ হাসতে হাসতে বললেন, এরাই হল আমার পাওনাদার–
