তবু কলকাতার কত রহস্যই যে জানতে বাকি। কোনও এলাকা ঝকঝকে নতুন। চোখ একেবারে ধাঁধিয়ে যায়। আবার কোথাও এক শদেড় শ বছর আগের সময়, অনড় দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারা, তার গন্ধ, তার ঠাট, তার জীবনযাপনের চাল–সমস্ত কিছু হুবহু সেকালের মতো। এতটুকু হেরফের না ঘটিয়ে কলকাতার আদিকালটাকে অবিকল বজায় রেখেছে। লেশমাত্র পরিবর্তন নেই। যেমন এই মহেশ হালদার লেন।
এখানে বেশির ভাগ বাড়িরই সদর দরজার মাথায় কি পাশের দেওয়ালে বাড়ির নম্বর লেখা আছে। সেগুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিল বিনয়। খানিক আগে ঝিনুকের জন্য বুকের ভেতরটা উতরোল হয়ে উঠেছিল; সেটা অনেকখানি শান্ত হয়ে এসেছে।
মিনিট তিন-চার হাঁটার পর তেইশ নম্বর বাড়িটা পাওয়া গেল। বেঢপ চেহারার মস্ত তেতলা। ছাদেও দুখানা ঘর চোখে পড়ে। সে-দুটোর মাথায় অ্যাসবেস্টসের চাল।
বাড়িটার দেওয়াল থেকে জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে ইট বেরিয়ে পড়েছে। ছাদের কার্নিসও পুরোটা অটুট নেই। জং-ধরা রেনওয়াটার পাইপে বেশ কটা বড় গর্ত।
খোলা দরজার মাথায় সাইন বোর্ডে লেখা : শান্তিনিবাস। প্রতিষ্ঠা : বাং সন ১৩০২। বহু বছর রোদে পুড়ে জলে ধুয়ে রং ফিকে হয়ে গেলেও লেখাগুলো পড়া যায়।
বাড়িটা ভাল করে এবার লক্ষ করল বিনয়। একতলা বাদ দিয়ে দোতলা এবং তেতলায় রাস্তার দিকে রেলিং-বসানো টানা বারান্দা। বারান্দার গা ঘেঁষে সারি সারি ঘর। সেগুলোর দরজা জানালা খোলা। কয়েকজনকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করতে দেখা যাচ্ছে। খুব সম্ভব ওরা এই মেসের বোর্ডার।
কখন কুয়াশা পুরোপুরি কেটে গেছে, খেয়াল নেই বিনয়ের। পুবদিকে উঁচুনিচু বাড়িগুলোর ছাদ টপকে সূর্য মাথা তুলতে শুরু করেছে। শীতের সোনালি রোদ ছড়িয়ে যাচ্ছে মহেশ হালদার লেনে।
বিনয় আর দাঁড়াল না। শান্তিনিবাস-এর ভেতর চলে এল। ঢুকেই একটা প্যাসেজের ডানপাশে। একখানা মাঝারি ঘর। কাঠের ভারী ভারী টেবল চেয়ার আলমারি দিয়ে সাজানো। সেখানে রোঁয়াওলা, পুরু আলোয়ান জড়িয়ে মাঝবয়সী একটি লোক টেবলের ওপর হুমড়ি খেয়ে মস্ত খাতায় কী সব লেখালেখি করছিল। মাথাজোড়া বিশাল টাক। চোখে নিকেলের গোল চশমা।
কলকাতার মেস সম্পর্কে বিশেষ কোনও ধারণা নেই বিনয়ের। যেটুকু জানে সবই বাংলা উপন্যাস আর গল্পটল্প পড়ে। অবশ্য রাজদিয়া এবং তার আশেপাশের গ্রামগুলোর কিছু লোকজন কলকাতার মেসে থেকে চাকরি বাকরি করত। পুজোর লম্বা ছুটি পড়লে দেশে এসে পনেরো বিশ দিন কাটিয়ে যেত। তাদের মুখে মেসের কিছু কিছু গল্প শুনেছে সে।
বিনয়ের মনে হল, ওই লোকটা শান্তিনিবাস-এর ম্যানেজার কিংবা মালিক। তবে তা না-ও হতে পারে। খানিক ইতস্তত করে সে বলল, একটু শুনবেন?
লোকটি টেবল থেকে মুখ তুলে তাকাল। বলুন
আমি প্রসাদ লাহিড়ির সঙ্গে দেখা করব। কোন ঘরে উনি থাকেন?
লোকটি বুঝিয়ে দিল। যে প্যাসেজে বিনয় দাঁড়িয়ে আছে সেটা ধরে কপা এগুলেই লম্বা বারান্দা। বাঁধারে, বারান্দাটার শেষ মাথায় ওপরে ওঠার সিঁড়ি। তেতলায় গিয়ে বাঁ দিকের কোণের ঘরখানা প্রসাদ লাহিড়ির।
কথা শেষ করে ফের খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ল লোকটি। তার কথামতো ভেতরে যেতেই একটা চৌকো, বড় চাতাল চোখে পড়ল বিনয়ের। সেটার একধারে দুটো বড় বড় চৌবাচ্চা। জলে বোঝাই। চৌবাচ্চার পাশে কর্পোরেশনের দুটো জলের কল। তার একটা গঙ্গাজলের, আরেকটা টালার জলের। চাতালটা ভীষণ সঁতসেঁতে। এখানে ওখানে শ্যাওলা জমে আছে। বহুকাল ওটা সাফ টাফ করা হয়নি।
চাতালটার তিন দিক ঘিরে চওড়া, উঁচু বারান্দা। আর-একদিকে রান্নাঘর। উনুন ধরানো হয়েছিল। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে গল গল করে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে।
বারান্দার একধারে চাতাল। অন্য ধারে ঘরের পর ঘর। সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বিনয় লক্ষ করল, প্রতিটি ঘরেই আলাদা আলাদা তক্তপোশে দুটো বা তিনটে করে বিছানা। তার মানে এক-এক ঘরে দুই বা তিনজন বোর্ডার।
সারা মেস-বাড়ির ঘুম ভেঙে গেছে। বোর্ডারদের কেউ বিছানায় বসেই দাঁতন করছে, কেউ খবরের কাগজ পড়ছে। কারও হাতে চায়ের কাপ। কোনও ঘরে রেডিওতে গান বাজছে।
সিঁড়ি ভেঙে দোতলা পেরিয়ে তেতলায় উঠে এল বিনয়। প্রতিটি ফ্লোরেরই নকশা একরকম। বারান্দা ঘিরে সারিবদ্ধ ঘর। প্রতিটি ঘরে একই দৃশ্য। বোর্ডারদের চা খাওয়া, খবরের কাগজ পড়া, ইত্যাদি। এই মুহূর্তে কারও কোনও তাড়া নেই। শীতের সকালটা সবাই আয়েশ করে কাটিয়ে দিচ্ছে।
তেতলার বাঁ পাশের শেষ ঘরখানার সামনে চলে আসে বিনয়। দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে একটা ক্যাম্বিসের ইজিচেয়ারে বসে কী যেন করছেন প্রসাদ। তার কাছাকাছি কোত্থেকে যেন চাপা সাঁ সাঁ আওয়াজ হচ্ছে। শব্দটা কীসের ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
প্রসাদের মুখ উলটো দিকে ফেরানো। বিনয় রয়েছে তার পেছনের বারান্দায়। তাই তাকে তিনি দেখতে পাননি।
বিনয় খুব আস্তে ডাকল, প্রসাদদা–।
প্রসাদ শুনতে পেয়েছিলেন। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন। ও, তুমি। ভেতরে এস–
চটি খুলে বারান্দায় রেখে বিনয় ঘরে ঢুকে পড়ল। মেসের অন্য সব ঘর যেটুকু চোখে পড়েছে। তার থেকে এটা আলাদা কিছু নয়। নেহাতই সাদামাঠা। সাজসজ্জার বালাই নেই। একটা দেওয়ালের গায়ে কাঠের অনেকগুলো র্যাক। সেগুলো বইয়ে ঠাসা। এছাড়া সিঙ্গল-বেড খাটে বিছানা, কাঠের একটি আলমারি, পড়াশোনার জন্য টেবল চেয়ার, টেবলে ফেবার-লিউবা কোম্পানির টেবল ক্লক, টেলিফোন, আরাম করার জন্য ইজিচেয়ার ইত্যাদি ছাড়াও গদি-বসানো কটা বেতের মোড়া। একটা মাত্র বিছানা দেখে বিনয়ের মনে হল, পুরো ঘরখানা নিয়ে একাই থাকেন প্রসাদ। অন্য কোনও ভাগীদার নেই।
