চোখাচোখি হতেই যুবকটি হাত নেড়ে ডাকতে লাগল, এস–এস,
কয়েক পলক তাকিয়ে থাকার পর চিনতে পারল বিনয়। হিরণের বন্ধু আদিত্য। মাসদেড়েক আগে তরুণ সঙঘ এখানকার হরিশ পার্কে যে জলসার আয়োজন করেছিল সে ছিল তার একজন মস্ত পাণ্ডা।
রাস্তা পেরিয়ে ওপারে চলে এল বিনয়। আদিত্যর হাতের চটের থলেটা বোঝাই। টাটকা পালং মুলো পেঁয়াজকলির সতেজ সবুজ পাতা মাথা তুলে আছে। এছাড়া রয়েছে ছোট একটা মাছের ব্যাগ। বোঝাই যাচ্ছে সে বাজার করে এসেছে।
আদিত্যও বিনয়কে দেখে বেশ অবাক হল। এত সকালে তুমি আমাদের পাড়ায়!
বিনয় বলল, একটা দরকারে এসেছি। একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
কার সঙ্গে?
বিনয় প্রসাদ লাহিড়ির নাম বলল।
আদিত্য বলে, মহেশ হালদার লেনের শান্তিনিবাস মেসে থাকেন। জার্নালিস্ট?
বিনয় জিজ্ঞেস করে, আপনি চেনেন?
আদিত্য হাসে, আমরা চার জেনারেশন এপাড়ায় আছি। ঠাকুরদা বাবা আমি–সবাই এখানে জন্মেছি। ভবানীপুরের এদিকটার নাইনটি পারসেন্ট লোককে আমি চিনি। তা প্রসাদ লাহিড়ির সঙ্গে তোমার আলাপ হল কী করে?
বিনয় নতুন ভারত-এর কথা জানালো।
তুমি তাহলে নিউজ পেপারে জয়েন করেছ? গুড।
একটু হেসে বিনয় বলল, হ্যাঁ। মহেশ হালদার লেন এখান থেকে কতদূর?
কাছেই। বাঁদিকের দুটো সরু গলি ছেড়ে যে রাস্তাটা পাবে সেটাই মহেশ হালদার লেন।
আদিত্যদা, আজ চলি। পরে আবার দেখা হবে
আদিত্য প্রায় লাফিয়ে উঠল, চলি মানে? বাড়ির দোর অবধি এসেছ। এক কাপ চা না খেয়ে। গেলে আমার খুব খারাপ লাগবে। এস–এস
হাতজোড় করে বিনয় বলল, দেখতেই পাচ্ছি, বাজার করে নিয়ে এসেছেন। রান্নাবান্না হবে। খেয়ে অফিসে দৌড়বেন। এই তাড়াহুড়োর সময় আপনাদের আর ব্যস্ত করব না। পরে একদিন আসব।
পরের কথা পরে। এক কাপ চা খেতে কতক্ষণ আর লাগবে–অ্যাঁ? আদিত্য প্রায় নাছোড়বান্দা, ম্যাক্সিমাম পনেরো কুড়ি মিনিট। আজ না হয় অফিসে একটু লেটই হবে। তুমি হিরণের শালা। যখন শুনবে, বাড়িতে না নিয়ে, চা না খাইয়ে তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি, আমার গর্দান চলে যাবে।
প্রচুর কাকুতি মিনতির পর রেহাই পাওয়া গেল। আসলে বিনয়ের মনটা একমুখী। যে-চিন্তা একবার মাথায় চেপে বসে তার বাইরে আর কিছু ভাবতে চায় না। আজ সকালে প্রসাদ লাহিড়ি দেখা করতে বলেছেন। প্রথমে সেটাই করবে সে। তারপর অন্য কিছু।
আদিত্য বলল, ফাংসানের দিন আমার বউ সবিতা তোমাদের আসার জন্যে বার বার বলেছিল। আমিও বলেছি। আসোনি কিন্তু।
বিনয় জানালো, মাঝখানে বেশ কিছুদিন চাকরির জন্য ছোটাছুটি ছাড়াও নানা সংকটে এতই জড়িয়ে পড়েছিল যে আদিত্যদের বাড়িতে আসার মতো সময় করে উঠতে পারেনি। তবে এবার আসবে, নিশ্চয়ই আসবে।
যে-গলির মুখে দাঁড়িয়ে দুজনে কথা বলছিল সেটার ভেতর দিকে ডান ধারের তিনটে বাড়ির পর একখানা সেকেলে ধাঁচের হলুদ রঙের তেতলা বিল্ডিং দেখিয়ে আদিত্য বলল, ওটা আমাদের বাড়ি। সুধা আর হিরণকে সঙ্গে নিয়ে এস। জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে
আচ্ছা।
বিনয় যাবার জন্য সবে পা বাড়িয়েছে, আদিত্য ব্যস্তভাবে বলে উঠল, ভাল কথা, সেই মেয়েটির খবর কী? ওই যাকে তুমি পাকিস্তান থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলে?
বিনয়ের বুকের ভেতরটা আমূল কেঁপে যায়। আদিত্য কোন মেয়েটির কথা বলল তা কী আর বুঝতে বাকি আছে? ঝাপসা গলায় সে কী জবাব দেয়, নিজের কাছেই তা স্পষ্ট নয়।
আদিত্য কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কথা বলছিল ঠিকই, কিন্তু বিনয়কে সেভাবে লক্ষ করেনি। করলে দেখতে পেত, পাকিস্তানের মেয়েটির কথা উঠতেই কত দ্রুত তার মুখ কষ্টে ভেঙেচুরে কতটা বদলে গেছে। আদিত্য নির্ঘাত হতভম্ব হয়ে যেত।
আদিত্য বলল, ঠিক আছে ভাই, তুমি প্রসাদবাবুর সঙ্গে গিয়ে দেখা করো। আমাদের বাড়ি চিনিয়ে দিলাম। যেদিন আসবে সেই মেয়েটিকেওকী যেন নাম, হ্যাঁ ঝিনুক–নিয়ে এস- বলে সে তাদের গলির দিকে এগিয়ে গেল।
বিনয় আচ্ছন্নের মতো সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। ঝিনুক কবেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কিন্তু তাকে ভুলে যাবে, সাধ্য কী বিনয়ের? তার গোটা সৌরলোক জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটা।
.
২৮.
মহেশ হালদার লেনটা খুব চওড়া নয়। বড়জোর কুড়ি বাইশ ফিট। পাক খেতে খেতে আদি গঙ্গার দিকে চলে গেছে।
এক নজরেই টের পাওয়া যায়, এলাকাটা খুবই পুরানো। দুধারে মলিন চেহারার দালান কোঠা। সাদামাঠা। ছিরিছাঁদহীন। বেশির ভাগেরই ছালচামড়া খসে হাড়গোড় বেরিয়ে পড়েছে। তাছাড়া গা জড়াজড়ি করে রয়েছে প্রচুর টিন বা টালির ঘর। আছে খোলার চালের চাপবাঁধা বস্তি। আছে সস্তা চায়ের দোকান, মুদিখানা, ডাক্তারখানা, লন্ড্রি, হরেকরকমবা মনিহারি দোকান, তেলেভাজার দোকান, মুড়ি মুড়কি চিড়ে বাতাসার দোকান, ইত্যাদি। ফুটপাথ নেই, রাস্তার ধার ঘেঁষে ল্যাম্পপোস্টগুলো ঘাড় ঝুঁকিয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোর মাথা থেকে ঝুলছে একটা করে বাস্তু।
মহেশ হালদার লেনে ঢুকে কয়েক পা এগুতেই বিনয়ের মনে হল, আদ্যিকালের কলকাতায় চলে এসেছে। এখানকার সব কিছুতেই প্রাচীনত্বের ছাপ মারা। চার দিক থেকে উঠে আসছে পুরানো সোঁদা গন্ধ।
পাকিস্তান থেকে চলে আসার পর ঝিনুক যখন নিখোঁজ হয়ে গেল, তার খোঁজে উভ্রান্তের মতো প্রায় সারা শহর ঘুরে বেড়িয়েছে বিনয়। এ-রাস্তা, সে-রাস্তা, এ-গলি, সে-গলি, এ-পাড়া, সে-পাড়া এমন কোনও এলাকা নেই যেখানে সে হানা দেয়নি। কদিনই বা সে কলকাতায় এসেছে। এর মধ্যেই এই বিশাল মেট্রোপলিসের নাড়িনক্ষত্র অনেকটাই জানা হয়ে গেছে।
