না না, তোর যাবার দরকার নেই। অফিস আগে, তারপর অন্য সব। পরে সময় সুযোগ করে মুকুন্দপুরে যাস।
নিশ্চয়ই যাব স্যার। চলুন, আপনাদের ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে পৌঁছে দিয়ে আসি।
কাল যেতে পারবে না। তাই আজ যতটা পারা যায়, প্রাক্তন মাস্টার মশাইটিকে সঙ্গ দেবার ইচ্ছা বিনয়ের। কিন্তু হিরণ বাধা দেয়, না না, সারাদিন অফিস করে এত ঠাণ্ডায় বাড়ি এসেছ। এই হিমে আর তোমাকে বেরুতে হবে না। আমি একটা ট্যাক্সি করে স্যারেদের দিয়ে আসি। এই রাত্তিরে রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা। যে ট্যাক্সিতে যাব সেই ট্যাক্সিতেই ফিরব। মিনিট কুড়ি পঁচিশের বেশি লাগবে না।
আশু দত্তও জানালেন, বিনয়ের যাবার দরকার নেই। তবে হিরণ গেলে আপত্তি নেই। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। তার সঙ্গে হিরণ, সুধা এবং বিনয়। সুধা আর বিনয় সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেবে। দ্বারিক দত্ত অবশ্য নামবেন না। বুড়ো মানুষ। সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা করতে তার হাঁফ ধরে যায়।
নিচে নামতে নামতে বিনয় যুগলকে বলল, তুমি যে আজ মুকুন্দপুরে ফিরবে না, পাখিকে বলে এসেছ?
যুগল কী ভাবছিল। মুখ ফিরিয়ে বলল, না। কইছিলাম সন্ধ্যা তরি (নাগাদ) ফিরা যামু। আপনের লেইগাই তো দেরি হইয়া গ্যাল
পাখি খুব চিন্তা করবে।
হে তো করবই। কিন্তুক অহন আর কী করন? এত রাইতে পাখিরে খবর পাঠামু ক্যামনে? এই নিয়া ভাইবা লাভ নাই—
একতলায় এসে হিরণ আশু দত্ত আর যুগলকে নিয়ে বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে থাকে। মুহূর্তে গাঢ় কুয়াশায় তিনটি মানুষ ঝাপসা হতে হতে দূরে মিলিয়ে যায়।
সুধা ধীরে ধীরে সদর দরজা বন্ধ করে ভাইকে বলল, চল—
দোতলায় উঠে উমাকে দিয়ে গরম জল করিয়ে বাথরুমে পাঠিয়ে দিল সুধা। বিনয়কে বলল, যা, হাত মুখ ধুয়ে, বাইরের জামাকাপড় পালটে নে। আমি খাবার গরম করতে থাকি।
মিনিট পঁচিশের ভেতর হিরণ ফিরে এল। দ্বারিক ও দুপুরে মাছ মাংস ডাল তরকারি সব খান কিন্তু রাত্তিরে স্রেফ দুখানা সুজির রুটি, নিরামিষ রকারি আর একটা সন্দেশ। হিরণের জেঠিমা সরস্বতী খান দুধ-খই। খাবারগুলো তাদের ঘরে পৌঁছে দিয়ে সুধারা তিনজন খেতে বসে। তাদের খাওয়া হলে উমা খায়। এটাই হল তাদের রোজ রাতের রুটিন। আজও তার হেরফের ঘটল না।
অফিসে প্রথম দিনটা বিনয়ের কেমন কেটেছে, জানার জন্য উৎসুক হয়ে ছিল হিরণ আর সুধা। কিন্তু যুগল এবং আশু দত্ত এসে পড়ায় এ নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়নি।
খেতে খেতে হিরণ জিজ্ঞেস করল, অফিস কেমন লাগল?
বিনয় বলল, খুব ভাল।
তোমার কলিগদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে?
অনেক জার্নালিস্ট। সবার সঙ্গে কি একদিনে আলাপ হওয়া সম্ভব? আমাদের রিপোর্টিং সেকশানের কয়েকজনের সঙ্গে হয়েছে।
কেমন মনে হল?
চকিতে রমেন বিশ্বাসের মুখটা মনে পড়ে গেল বিনয়ের। ঈর্ষাকাতর, স্বার্থপর একটি মানুষের মুখ। রমেনের কথা বললে হিরণদের মন খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু বাকি সবাই যথেষ্ট আন্তরিক। কথায় বার্তায় চমৎকার। একটু অন্যমনস্ক হয়ে রইল সে। ভাবল সবাই তো আর দেবশিশু হয় না। যে কজনকে তার পছন্দ হয়েছে শুধু তাদের সম্বন্ধে বলল, বেশ ভদ্র, হেল্পফুল
অফিসে যাবার পর তাকে কী কী করতে হয়েছে, তার ডিউটি কটা থেকে কটা অবধি, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিল সুধা। রমেন আর লাহোরের সেই ধর্ষিতা মেয়েটা যার নাম নীলম, এই দুজনকে ছাড়া বাকি সব বলে গেল বিনয়। নীলমকে বাদ দিল, কারণ তার প্রসঙ্গ উঠলেই ঝিনুকের কথা মনে পড়ে যাবে সুধাদের। আজ সেটা চায় না সে।
.
২৭.
পরদিন সকালে সাতটার ভেতর মুখ টুখ ধুয়ে, শেভ করে, বাসি কাপড় চোপড় পালটে, চা। খেয়ে, গায়ে একটা শাল জড়িয়ে নিল বিনয়।
সুধা জিজ্জেস করল, এখনও ভাল করে রোদ ওঠেনি, কুয়াশা পুরোপুরি কাটেনি। কোথায় চললি তুই?
বিনয় বলল, কাল তোদের সবার সামনেই তো আশু স্যারকে বললাম, আজ সকালে একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাব। মনে নেই?
সুধার মনে পড়ল, হ্যাঁ, বলেছিলি।
যার কাছে যাচ্ছি তিনি আমাদের চিফ রিপোর্টার। অফিসেরই একটা দরকারে আমাকে যেতে বলেছেন।
কখন ফিরবি?
একটু ভেবে বিনয় বলল, মনে হয় দশটা সাড়ে-দশটার ভেতর চলে আসতে পারব। তারপর তো রেডি হয়ে অফিসে যাওয়া আছে।
সুধা আর কোনও প্রশ্ন করল না।
জাফর শা রোড থেকে বড় রাস্তায় আসতে হাসতে বিনয়ের চোখে পড়ল, শীতের শহর সবে আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করেছে। কুয়াশা পাতলা হয়ে এলেও রোদ খুব ম্যাড়মেড়ে, নিস্তেজ। হিম- বাতাস বয়ে যাচ্ছে ধীর চালে।
খাবারের দোকান, চায়ের দোকান আর বিড়ি-সিগারেটের দোকান ছাড়া অন্য সব দোকানপাট বন্ধ। রাস্তায় লোজন কম। গাড়িটাড়ি আরও কম।
একটা ফাঁকা ট্রামে উঠে পূর্ণ সিনেমার সামনের স্টপেজে এসে নামল বিনয়। তারপর বাঁদিকের একটা গলি দিয়ে চলে এল হরিশ মুখার্জি রোডে।
কীভাবে তার মেসে যেতে হবে, প্রসাদ লাহিড়ি কাল তা নিখুঁতভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বিনয় ডানদিকের ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলল। হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে ডেকে উঠল, বিনয় বিনয়–
বিনয় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। রীতিমতো অবাক সে। এখানে কে তাকে ডাকতে পারে? এধারে ওধারে তাকাতে চোখে পড়ল, রাস্তার উলটো দিকের ফুটপাথে, কোনাকুনি একটা গলির মুখে, একজন দাঁড়িয়ে আছে। বয়স তিরিশের আশেপাশে। যুবকই বলা যায়। পরনে পাজামা এবং শার্টের ওপর র্যাপার জড়ানো। হাতে বাজারের থলে। মুখটা চেনা চেনা মনে হল।
