সবই ঠিক। তবু এই বয়সে শরীর যখন দ্রুত অচল হয়ে পড়ছে তখন নতুন স্কুল বসানোর মতো প্রচণ্ড ধকল নিতে পারবেন কি না, এই নিয়ে আশু দত্তর নিজেরই সংশয় ছিল। তাই রাতারাতি তিনি যে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেবেন, ভাবা যায়নি।
বিনয় কয়েক পলক আশু দত্তকে লক্ষ করে। তারপর ভয়ে ভয়ে বলে, একটা কথা জিজ্ঞেস করব স্যার?
কর না—
সন্তোষবাবুদের ওখানে আপনাদের কি কোনওরকম অসুবিধে হচ্ছে?
বিনয়ের প্রশ্নটার মধ্যে একটা ইঙ্গিত রয়েছে। লহমায় সেটা ধরে ফেলেন আশু দত্ত। তার এই প্রাক্তন ছাত্রটি হয়তো জানতে চায়, এই বাজারে যখন চাল ডাল তেল মশলা আনাজপাতি মাছটাছের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে চড়ছে, দুটো মানুষ হুট করে পাকিস্তান থেকে চলে আসায় নিশ্চয়ই বিপাকে পড়েছেন সন্তোষরা। প্রথম দিকে আবেগের বশে তাদের কিছু বলেননি ওঁরা। এখন হয়তো বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে না পেরে দুর্ব্যবহার শুরু করেছেন।
আশু দত্ত চমকে উঠে হাত-পা নাড়তে নাড়তে বলেন, না না, সন্তোষরা আমাদের মাথায় করেই রেখেছে। মাকে আর আমাকে কী যত্নই না করে! কিন্তু আমার তো বিবেক বলে একটা বস্তু আছে। সন্তোষ মুখ ফুটে কিছু বলে না। তবে বুঝতে পারি ওকে ধার কর্জ করে চালাতে হচ্ছে। আমরা থাকলে দেনা বেড়েই চলবে।
আশু দত্ত আরও জানালেন, সন্তোষের ভার লাঘব করার জন্য কম চেষ্টা করেননি। সেদিন মুকুন্দপুরে যাবার আগে কালীঘাট চেতলা টালিগঞ্জের স্কুলগুলোতে একটা চাকরির জন্য বার বার হানা দিয়ে বেড়িয়েছেন। মুকুন্দপুর থেকে ফেরার পরও সেসব জায়গায় ফের গেছেন। কিন্তু কোনও আশার সংকেত নেই।
হতাশ, ক্লান্ত আশু দত্ত মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়তে পড়তে কখনও যা ভাবেননি, ঠিক করলেন, তাই করবেন। পয়সার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছেলেমেয়ে পড়াবেন। কিন্তু প্রাইভেট টিউশনের পথও আপাতত বন্ধ। বছর শেষ হয়ে আসছে। টিউটর যা রাখার আগেই রাখা হয়ে গেছে। স্কুলে স্কুলে অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর রেজাল্ট বেরুলে নতুন বছরে প্রাইভেট টিউটরের কথা ভাবা যাবে। অভিভাবকরা তখন আশু দত্তকে দেখা করতে বলেছেন।
কিন্তু নতুন বছর পড়তে এখনও কিছুদিন দেরি। ততদিন কী করে চালাবে সন্তোষ? সে তো ধারদেনায় আরও ডুবে যাবে। হাতের কাছে বাঁচার একটা রাস্তাই খোলা রয়েছে। সেটা হল মুকুন্দপুরে চলে যাওয়া।
আশু দত্ত বলতে লাগলেন, মাঝখানে কিছুদিন তুই ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে যাসনি। সুধাদের বাড়ির ঠিকানাও জানতাম না যে নিজে এসে তোর সঙ্গে স্কুলের বিষয়ে পরামর্শ করব। খুব অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। আজ দুপুরে হঠাৎ ঘোড়ায় জিন দিয়ে শ্রীমান যুগলচন্দ্র সন্তোষের বাসায় এসে হাজির। কী ব্যাপার? না, আজই তার সঙ্গে মুকুন্দপুরে যেতে হবে। ওদের কলোনির লোকজন চাইছে, নতুন ইংরেজি সাল থেকেই স্কুল চালু করতে। তাই আগে আগেই আমার সেখানে যাওয়া চাই। মুখের কথা খসালেই তো স্কুল হয় না। তার আগে অনেক কাজ থাকে। যথেষ্ট প্রিপারেশন দরকার। তা আমি যুগলকে বললাম, বিনুর সঙ্গে দেখা না করে যাব না। যুগলও তাই চাইছিল। সন্তোষের বাসায় দুপুরের খাওয়া সেরে দুজনে এখানে চলে এলাম।
আশু দত্ত মুকুন্দপুরে গিয়ে স্কুল বসাতে রাজি হয়েছেন। যুগলকে আর কে পায়? সে যেন তার জীবনের সেরা স্বপ্নটিকে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে। তার উদ্দীপনা বেড়ে গেছে শতগুণ। জ্বলজ্বলে চোখে বিনয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, বুঝলেন নি ছুটোবাবু, ইট কাঠ বাশ নয়া টিন-ইস্কুল-বাড়ি বানানের লেইগা হগল জুগাড় কইরা রাখছি। মাস্টরমশয় গিয়া য্যামন য্যামন কইবেন ত্যামন ত্যামন ঘর তুইলা দিমু। অ্যাতদিনে মনে লয় (হয়), কুলোনির পুলাপানগুলান লিখাপড়া শিখ্যা মানুষ হইব।
যুগলের কথার জবাব না দিয়ে বিনয় আশু দত্তকে বলে, আপনি যে মুকুন্দপুর চলে যাবেন, সন্তোষবাবু কি জানেন?
আশু দত্ত বললেন, কলকাতায় কিছু না পেলে আমাকে যে মুকুন্দপুর চলে যেতে হবে সেটা ও বুঝতে পেরেছে। তবে কালই যে যাব, তা জানে না। যুগল দুপুরে যখন এল তখন সন্তোষ অফিসে। এখন ফিরে গিয়ে ওকে বলব।
ঠাকুমাকেও কি নিয়ে যাবেন?
ঠাকুমা, অর্থাৎ আশু দত্তর মা।
আশু দত্ত বললেন, না। এখন মা সন্তোষের কাছেই থাকবে। তারপর কিছু একটা ব্যবস্থা হলে নেবার কথা ভাবব।
মুকুন্দপুরে তো আপনার বাড়িঘর কিছুই নেই। ওখানে গিয়ে কোথায় থাকবেন?
প্রশ্নটার জবাব দিল যুগল, আমার একখান বাড়তি ঘর আছে হেইখানে থাকতে পারেন। হরনাথদাদাও তেনার বাড়িতে থাকনের কথা কইছেন। হে এট্টা বন্দবস্ত হইয়া যাইব।
আরও দুচার কথার পর উঠে পড়লেন আশু দত্ত। তাঁর সঙ্গে যুগলও। হঠাৎ কিছু খেয়াল হতে বিনয় উঠল, এত রাতে যুগল তো মুকুন্দপুরে ফিরতে পারবে না। শিয়ালদা থেকে ওই লাইনের লাস্ট ট্রেন এতক্ষণে চলে গেছে।
হিরণ পাশ থেকে বলল, ও আমাদের এখানেই থাকতে পারে।
আশু দত্ত বললেন, আমাকে ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে পৌঁছে দিয়ে আবার এখানে আসবে। কাল সকালে ফের ওকে আমার কাছে যেতে হবে। এত দৌড়ঝাপের কী দরকার? একটু কষ্ট টষ্ট করে একটা রাত সন্তোষের ওখানেই না হয় থেকে যাবে। সকালে উঠেই তো মুকুন্দপুর রওনা হব।
বিনয় কঁচুমাচু মুখে বলল, স্যার, কাল সকালে আপনি যখন বেরুবেন তখন গিয়ে যে দেখা করব তার উপায় নেই। আগেই কথা হয়ে আছে, ঠিক ওই সময় অফিসের কাজে একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
