সুধাদের বাড়ির কড়া নাড়তে উমা নেমে এসে দরজা খুলে দিল। ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে যুগলের গলা শুনতে পেল বিনয়। রীতিমতো অবাক হয়ে যায় সে। সেই যে শেষবার আশু দত্তর সঙ্গে মুকুন্দপুর গিয়েছিল, তারপর এত কাণ্ড ঘটে গেছে যে, যুগলের কথা তার মাথাতেই ছিল না।
যুগল এমনিতে এ-বাড়িতে আসে দুপুরবেলায়। আগে আগে ফি সপ্তাহে লেকের ধারের হাসপাতালে পা ড্রেস করিয়ে দশটা সাড়ে-দশটার ভেতর চলে আসত। পায়ের ক্ষত যত শুকিয়ে আসছিল, হাসপাতালে আসাটা তার ততই অনিয়মিত হয়ে পড়ছিল। এখন মাঝে মাঝে এসে ডাক্তারকে দেখিয়ে গেলেই চলে।
যে মানুষ দশটা সাড়ে-দশটায় এসে দিনের আলো থাকতে থাকতেই ফিরে যায়, হঠাৎ সে কেন আজ রাত্তিরে এসে হাজির হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে না। তাহলে কি ওদের কলোনি নিয়ে কোনও ঝাট দেখা দিয়েছে? কিংবা যুগলের নিজস্ব কোনও সমস্যা?
দোতলায় এসে আরও একবার অবাক হতে হল। বিনয়ের চোখে পড়ল, বাইরের ঘরে শুধু যুগলই নেই, আশু দত্তও রয়েছেন। আর আছে সুধা, হিরণ, দ্বারিক দত্ত। যুগল ছাড়া সবাই বসেছে চেয়ারে। যুগল যথারীতি মেঝেতে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, তাই একটা পুরু কম্বল কাটা আসনের ওপর।
বিনয়কে দেখে হইচই বাধিয়ে দিল যুগল, আসেন ছুটোবাবু, আসেন
আশু দত্তও ডাকলেন, আয় বিনু হাতকাটা সোয়েটারে শীত ঠেকানো যাচ্ছিল না। নতুন ভারত-এর অফিস থেকে এতটা পথ বিনয় কীভাবে এসেছে, তা শুধু সেই জানে। সারা শরীর হি হি কাঁপছে। আঙুলগুলো সিঁটিয়ে গেছে। বাইরের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বিনয় সুধাকে বলল, ছোটদি, চট করে আগে আমাকে একটা কম্বল টম্বল এনে দে
এক্ষুনি আনছি। দুপুরে তাড়াহুড়োয় আমার একদম খেয়াল ছিল না। কাল থেকে গরম শাল দিয়ে দেব। ফেরার সময় গা-মাথা ভাল করে ঢেকে নিবি। এই শীতে ইত্যাদি বলতে বলতে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সুধা।
যুগল বলল, ইস, ছুটোবাবু এক্কেরে কালাইয়া (ঠান্ডায় কাবু হয়ে) গ্যাছে। এই টালকির (শীতের) সোময় কেও চদর চুদর ছাড়া পথে বাইর অয় (হয়)?
আশু দত্ত, হিরণ এবং দ্বারিক দত্তও একই কথা বললেন। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না নিয়ে এই হিমঋতুতে বাইরে থাকলে, বিশেষ করে রাত্তিরে, ঠাণ্ডা লেগে বড় রকমের অসুখ বিসুখ বেধে যাবে।
কারও কথাই মন দিয়ে শুনছিল না বিনয়। তার মাথায় একটাই চিন্তা। একটাই প্রশ্ন। যুগলরা কেন এল? একটা খালি চেয়ারে বসতে বসতে বিনয় আশু দত্তকে বলল, স্যার, আপনি আজ এ বাড়িতে আসবেন, ভাবতেই পারিনি। ছোটদি, হিরণদা, দ্বারিকদাদুর সঙ্গে এই সেদিন কথা হচ্ছিল, এক রবিবার আপনাকে নিয়ে আসব। সারাদিন আমাদের কাছে থাকবেন। তা হঠাৎ আজই–তা এই রাত্তিরবেলায়– কথা শেষ না করে সে থেমে গেল।
আশু দত্ত উত্তর দেবার আগেই যুগল তড়বড় করে বলে, রাইতে আইছেন নিকি? আইছেন হেই বিকালে। আমিই কালীঘাটে গিয়া তেনার মাউসাতো ভাইয়ের বাসা থিকা লইয়া আইছি।
সুধা মোটা পশমি চাদর নিয়ে ফিরে এল। বিনয়কে সেটা দিতেই সারা গায়ে জড়িয়ে নিল সে। চাদরের উত্তাপ ধীরে ধীরে রক্তমাংসে ছড়িয়ে পড়ছে তার। আরাম বোধ করতে লাগল বিনয়।
দ্বারিক দত্ত এতক্ষণ প্রায় চুপ করেই ছিলেন। এবার বলে উঠলেন, আমি তো পার্টিশানের পরেই কলকাতায় চলে এসেছিলাম। বহুকাল পর আশুর সঙ্গে দেখা। কী ভাল যে লাগল! সেই বিকেল থেকে সারাক্ষণ খালি দেশের গল্প করছি। ওখানকার মাটির সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক ছিঁড়ে ইন্ডিয়ায় চলে এসেছি। কী সোনার দেশ ছিল! কী আনন্দেই না দিন কেটেছে একসময়। সব ছবির মতো চোখের সামনে ভাসে। পার্টিশান সমস্ত কিছু ছারখার করে দিল।
হিরণ লঘু সুরে বিনয়কে বলল, সন্ধেবেলায় অফিস থেকে ফিরে দেখি রাজদিয়ার দুই গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যান দেশের জন্যে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন। আমিও সেই শোক-সংকীর্তনে গলা মেলাতে মেলাতে তোমার জন্যে ওয়েট করতে লাগলাম। একটু চুপ করে থাকার পর বলল, যা হবার হয়েই গেছে। যে দেশ হারিয়ে এসেছি তা আর কোনওদিনই ফিরে পাওয়া যাবে না। পুরানো দিনের কথা ভাবলে শুধুই কষ্ট। তার স্বর শেষ দিকে ভারী হয়ে আসে।
বিনয় উত্তর দিল না। যা সে জানতে চায়, জানা হয়নি। ভেতরে ভেতরে সে বিরক্ত হচ্ছিল।
এদিকে আশু দত্ত সময় সম্পর্কে হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠলেন। অনেক রাত হয়ে গেছে। এবার আমাকে ফিরতে হবে। সন্তোযরা নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছে। বিনু, একটা বিষয়ে আমি মনস্থির করে ফেলেছি। তোকে সেটা জানিয়েই উঠে পড়ব।
গভীর বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে বিনয়। জিজ্ঞেস করে, বিষয়টা কী?
আশু দত্ত বলতে লাগলেন, কাল সকালে যুগলের সঙ্গে আমি মুকুন্দপুরে চলে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম তোকেও দুচার দিনের জন্যে নিয়ে যাব। কিন্তু এখানে এসে সুধাদের কাছে শুনলাম, আজই তুই খবরের কাগজে জয়েন করেছিস। নতুন চাকরি। এখনই কি আর তোর পক্ষে ছুটি নেওয়া সম্ভব?
বিনয় বিব্রতভাবে বলল, না স্যার। অফিস থেকে আমাকে প্রচুর কাজ দেওয়া হয়েছে। একটা দিনও কামাই করা যাবে না।
আশু দত্ত বললেন, তুই সঙ্গে থাকলে অনেকখানি ভরসা পেতাম। স্কুল বসানো কি সোজা কাজ?
এমন কথা আগেও বলেছিলেন আশু দত্ত। মুখ নিচু করে চুপচাপ বসে থাকে বিনয়।
মুকুন্দপুর কলোনিতে আশু দত্ত যাবেন, সেখানে উদ্বাস্তু ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন স্কুল গড়ে তুলবেন, মোটামুটি এরকম কথা হয়েই আছে। কিছুদিন আগে বিনয় আর যুগলের সঙ্গে সেখানে গিয়ে স্কুলের জন্য জায়গাও পছন্দ করে এসেছেন। মুকুন্দপুর বাস্তুহারা কল্যাণ সমিতির খাতাতেও তার নাম উঠে গেছে। বাড়ি তৈরির জন্যও তাকে জমি দেওয়া হবে।
