মোটামুটি মসৃণভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল রমেনদের। শেষপর্যন্ত কাটল না। ছেচল্লিশে বড় দাঙ্গা। সাতচল্লিশে পার্টিশান। দেশভাগের পর রাতারাতি সব বদলাতে লাগল। সারাক্ষণ আতঙ্ক। সারাক্ষণ অবিশ্বাস।
একদিন পূর্ব পাকিস্তানের অন্য সব এলাকার মতো মীরকাদিমেও ভাঙন শুরু হল। দেশে আর থাকতে সাহস হয় নি। ভিটেমাটি ফেলে প্রথমে তারা চলে এসেছিল আগরতলায়। মা-বাবা-ভাই-বোনকে ওখানকারই এক ত্রাণশিবিরে রেখে রমেন সোজা চলে এল কলকাতায়। অনার্স গ্র্যাজুয়েট। উদ্বাস্তু। যে কোনও সরকারি দপ্তরে তার চাকরি হয়ে যেত। কিন্তু একবার যার শ্বাসপ্রশ্বাসে খবরের কাগজ ঢুকে গেছে তার কি অন্য কাজ মনে লাগে? মির্জাপুরের মেসে কয়েক মাস থেকেও একাগজ সেকাগজ ঘোরাঘুরি করে, একে তাকে ধরাধরি করেও কিছু না পেয়ে যখন হতাশ হয়ে পড়েছে, তখন মরিয়া হয়ে জগদীশ গুহঠাকুরতার সঙ্গে দেখা করে এবং নতুন ভারত-এর কাজটা হয়ে যায়।
রমেন বলে, থাউক এই সব প্যাচাল। প্রায় প্রতিটি রিফিউজির একই হিস্টোরি।
কীভাবে রমেনের চাকরি হয়েছে, দুপুরে তারাপদ ভৌমিকের কামরায় বসে একবার শুনেছে বিনয়। ফের শুনতে হল। সে কোনও উত্তর দেয় না। সে পাকিস্তান থেকে কবে এসেছে, কী কারণে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে, এ-সব সম্বন্ধে লেশমাত্র আগ্রহ নেই রমেনের। এ নিয়ে কিছু জানতেও চায় না সে।
কিছুক্ষণ নীরবে হাঁটার পর আচমকা রমেন জিজ্ঞেস করে, নতুন ভারত-এ তোমার কাজটা হইল কী করে?
বিনয় সরল মনে সব জানিয়ে দেয়।
রমেন একটু থতিয়ে যায়। তারপর বলে, জগদীশবাবু তোমার ভগ্নীপতিরে খাতির করেন। তোমার খুটির জোর জবর। বলেই খেয়াল হয় এভাবে বলাটা ঠিক হয়নি। বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। দ্রুত সামলে নিল সে, অবশ্য নিউজ এডিটর আর চিফ রিপোর্টার তোমার লেখার খুব প্রেইজ করতে আছিলেন। তবু
তবু কী?
আমার উপুর কিন্তু অবিচার হইল বিনয়।
রমেনের কথাগুলোর আগামাথা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কে অবিচার করল, কীভাবে করল, কেন করল, ভেবে তলকূল পায় না বিনয়। তবে এটুকু আঁচ করতে পারে, লোকটার মধ্যে কোনও কারণে ক্ষোভ জমে আছে।
রমেন এবার বলে, আমি একজন পাক্কা রিপোর্টার। সাত-আট বচ্ছর কাজের এক্সপিরিয়েন্স রইছে আমার। এই মুহূর্তে ইন্ডিয়ার সব থিকা জ্বলন্ত প্রবলেম হইল রিফিউজি প্রবলেম। এই অ্যাসাইনমেন্ট গুলা আমার মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিকরে না দিয়া কি না তোমারে দিলেন তারাপদদা, প্রসাদদা! তোমার লেখার হাত ভাল হইতে পারে কিন্তু এক্সপিরিন্সে? সেইটা তো আর নাই। এই লাইনে তুমি একেবারে নূতন।
ঝুলির ভেতর থেকে এতক্ষণে বেড়ালটি বেরিয়ে পড়েছে। সাব-এডিটরদের টেবলের আড্ডা ছেড়ে কেন রমেন চলে এসেছিল, কেন তাকে কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তা এখন বিনয়ের কাছে মোটামুটি স্পষ্ট। উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে লেখালেখির দায়িত্ব তাকে দেওয়াতে রমেন খুশি হতে পারেনি।
ওরা কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের ক্রসিংয়ে পৌঁছে গিয়েছিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা দুনম্বর রুটের ডবল ডেকার এসে পড়ল। বিনয়রা উঠে সোজা একতলায় ঢুকে যায়।
বাসটা একরকম ফাঁকাই। এধারে ওধারে অল্প কটি প্যাসেঞ্জার চাদর, কম্ফোর্টার বা ফুলহাতা সোয়েটার আর মাঙ্কি ক্যাপের ভেতর জড়সড় হয়ে বসে আছে।
রমেন আর বিনয় মুখোমুখি সিটে বসেছে। জানালা টানালা সব বন্ধ। বাস হিমবাতাস আর শীতের কুয়াশা কুঁড়ে কুঁড়ে দৌড়চ্ছে। উধ্বশ্বাসে।
রমেন বলল, এখন সারা দ্যাশের নজর রিফিউজিগো উপুর। যে তাগো নিয়ে লেখবে তারই নামডাক হয়ে যাবে। একটা উপকার করবা ভাই?
লোকটার যে কিছু একটা মতলব আছে, সে যে খুব সাদাসাপটা মানুষ নয়, ধীরে ধীরে টের পাচ্ছিল বিনয়। তার স্নায়ুগুলো সতর্ক হয়ে উঠল। কী উপকার?
তুমি রিফিউজিগো ব্যাপারটা আমারে ছেড়ে দাও—
রমেনের চোখেমুখে, গলার স্বরে কাকুতি মিনতি।
কিছুক্ষণ হতবাক তাকিয়ে থাকে বিনয়। রমেনের উদ্দেশ্যটা এখন জলের মতো পরিষ্কার। উদ্বাস্তুদের নিয়ে লিখলে তার সুনাম হবে, সাংবাদিক হিসেবে কলকাতায় সে প্রতিষ্ঠা পাবে। সেজন্য বিনয়ের হাতের মুঠোয় অযাচিতভাবে যে সুবর্ণ সুযোগটা এসেছে সেটা তাকে ছেড়ে দিতে হবে।
বিনয়ের ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ তাকে রূঢ় হতে দেয় না। সে জিজ্ঞেস করে, আমাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেটা কীভাবে ছাড়ব?
তার পথ আছে।
কী পথ?
তুমি তারাপদদা আর প্রসাদদারে বলবা, রিফিউজির ব্যাপারটা খুব ডিফিকাল্ট। তোমারে যেন ওনারা অন্য অ্যাসাইনম্যান্ট দ্যান
খুব ঠাণ্ডা গলায় বিনয় বলল, আমার পক্ষে ওঁদের বলা সম্ভব নয়। আমাকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে আমি সেটাই করব–
ও-ও- মুখটা কালো হয়ে যায় রমেনের।
এরপর অদ্ভুত নীরবতা। মির্জাপুরের মুখের স্টপেজটায় বাস এসে থামতেই নেমে যায় রমেন। কোনও কথা তো বলেই না, বিনয়ের দিকে ফিরেও তাকায় না।
আজ অফিসের প্রথম দিনটা চমৎকার কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু ষোল আনা ভাল বলে বোধহয় কিছু হয় না। এই মুহূর্তে রমেন তার মন তিক্ততায় ভরে দিয়ে গেছে। স্বার্থপর, ঈর্ষাকাতর এই লোকটা সম্পর্কে তাকে ভবিষ্যতে সাবধান থাকতে হবে।
