এক নিশ্বাসে পড়া শেষ করলেন প্রসাদ। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর বললেন, ভেরি গুড কপি। ভীষণ টাচিং। প্রসাদ তারাপদর মতো ততটা আবেগপ্রবণ নন। উঁচু গলায় কথা বলেন না। তবু যে কটি শব্দ উচ্চারণ করলেন সেগুলোতে অঢেল প্রশংসা। বুকের কাঁপুনিটা উধাও বিনয়ের। তারাপদর কাছে প্রথম পরীক্ষাটা খুব ভালভাবেই উতরে গিয়েছিল। দুনম্বর পরীক্ষার বেড়াও নির্বিঘ্নে পেরিয়ে গেল।
প্রসাদ বলতে লাগলেন, নীলমের জন্যে ভীষণ কষ্ট হয়। কিন্তু সুরেশের গ্রেটনেসের জন্যে কী শ্রদ্ধা যে হল, বলে বোঝাতে পারব না। তিনি আরও বললেন, পার্টিশানের পর দেশ তোলপাড় হয়ে গেছে। সুরেশের মতো সাহসী, সংস্কারমুক্ত যুবকদের এখন খুবই প্রয়োজন। ইত্যাদি।
লেখাটার প্রশংসায় বিনয় যতটা খুশি হয়েছিল, সুরেশের নামটা শোনামাত্র–যদিও তার কথা সে এখনই লিখে এনেছে–ততটাই কুঁকড়ে যায়। নিজেকে আরও একবার ধিক্কার দেয় সে। একটি কথাও না বলে মুহ্যমানের মতো বসে থাকে।
প্রসাদ জিজ্ঞেস করেন, কোন কাগজে রিপোর্টটা বেরিয়েছে?
বিনয় দিল্লির কাগজের নাম বলল। তার লেখাটার শেষ পাতায় নিচের দিকে নামটা লিখতে লিখতে জিজ্ঞেস করলেন, লেখাটা কি পুরোপুরি বাংলায় ট্রানস্লেশন করে দিয়েছ?
না। বিনয় জানায় নীলমের জীবনের ঘটনাগুলো সাজিয়ে নিজের মতো করে লিখেছে।
গুড। এই লেখাটা এখন রেখে দিচ্ছি। আমাদের কাগজ যখন বাজারে বেরুবে, এটা ছাপা হবে। বাইরের কাগজ ঘেঁটে এরকম হিউম্যান স্টোরি পেলে লিখে আমাকে দিও।
আচ্ছা
একটু চুপচাপ।
তারপর প্রসাদ বললেন, এখন তো কাজের কোনও প্রেসার নেই। পুর শিফট না থাকলেও চলবে। ইচ্ছে করলে বাড়ি চলে যেতে পার। নইলে- নিউজ ডিপার্টমেন্টের অন্য প্রান্তে সুধেন্দুরা যেখানে সাব-এডিটরদের সঙ্গে জমিয়ে গল্প করছে সেদিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলেন, নতুন নতুন অনেক ছেলে নিউজে জয়েন করেছে। যাও না, ওদের সঙ্গে আলাপ টালাপ করো। ওই তো সুধেন্ধুরাও রয়েছে–
বিনয়ের স্বভাবটাই এমন, যেচে কারও সঙ্গে মিশতে পারে না। কিন্তু একবার পরিচয় হয়ে গেলে বাধো বো ভাব আর থাকে না।
বিনয় বলল, রোজই তো অফিসে আসব। আস্তে আস্তে সবার সঙ্গে আলাপ হবে। আজ বাড়িই চলে যাই। আসলে এখন কিছুই ভাল লাগছে না। ঘুরে ফিরে নীলম আর ঝিনুক তার ভাবনায় হানা দিয়ে চলেছে।
ঠিক আছে। বলেই হঠাৎ প্রসাদের নজরে পড়ল, বিনয়ের পরনে ধুতি আর ফুলশার্টের ওপর উলের হাতকাটা সোয়েটার। শীতবস্ত্র বলতে মাত্র এটুকুই। বললেন, এবার বেশ শীত পড়েছে। ওইটুকু সোয়েটারে ঠেকানো যাবে না। কাল থেকে গরম চাদর নিয়ে এস।
বিনয় উঠে পড়েছিল। এই সময় রমেন ওদিক থেকে চলে এল। সে একাই এসেছে। বাকি দুজন চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। সহজে সুধেন্দুরা ওখান থেকে নড়বে বলে মনে হয় না।
রমেন প্রসাদকে বলল, আমার একটা দরকারী কাজ আছে। আপনে পারমিশান দিলে চইলা যেতে পারি।
তক্ষুনি অনুমতি পাওয়া গেল।
এদিকে বিনয় নিউজ ডিপার্টমেন্ট পেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে নিচে নামছিল।
.
২৫.
অফিস থেকে বেরিয়ে টের পাওয়া গেল বাইরে তাপাঙ্ক দু-তিন ডিগ্রি কম। কনকনে উত্তরে হাওয়া শহরটাকে উলটো পালটা চাবুক মারতে মারতে ছুটে যাচ্ছে। হিম নামছে আকাশ থেকে। হিম উঠছে পাতাল থেকে। এখন কত আর রাত হবে? সাতটার বেশি নয়। এর মধ্যেই মানুষজন কমে গেছে, গাড়িঘোড়াও তেমন চোখে পড়ে না। কুয়াশা এমনভাবে চারপাশের আলোর টুটি চেপে ধরেছে যে সব কেমন যেন ঘোলাটে দেখায়।
বাস-স্ট্যান্ড অবধি যাবার আগেই পেছন থেকে ডাকটা শোনা গেল, বিনয়—
চমকে ঘুরে দাঁড়াতেই বিনয়ের চোখে পড়ল–রমেন। কাছে এসে সে বলল, বাড়ি যাচ্ছ তো?
হ্যাঁ।
কোথায় বাড়ি?
বিনয় জানিয়ে দিল, টালিগঞ্জে।
এখান থেকে ধর্মতলায় গিয়ে বাস কি ট্রাম ধরলে তোমার সুবিধা হয়। তা এট্টু কষ্ট করবা?
বিনয় অবাক।–মানে?
রমেন বুঝিয়ে দিল। সে থাকে মির্জাপুরে। তাকে বিবেকানন্দ রোড ধরে একা একা হেঁটে কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে গিয়ে ট্রাম কি বাস ধরতে হবে। বিনয় তার দেশের ছেলে। সে যদি সঙ্গে থাকে, গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে গিয়ে দুনম্বর দোতলা বাস ধরলে তাদের দুজনেরই সুবিধা। রমেন মির্জাপুরের মুখে নেমে যাবে। আর বিনয় সোজা রাসবিহারী পর্যন্ত চলে যেতে পারবে। সেখান থেকে টালিগঞ্জের গণ্ডা গণ্ডা বাস কি ট্রাম পাওয়া যায়।
হিম-বাতাস জামাকাপড়-সোয়েটার ভেদ করে হাডেমজ্জায় হাজারটা ছুরির ফলা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বিনয় টের পাচ্ছে, শরীরের রক্ত-মাংস-ত্বক জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরে গরম জলে হাত-পা-মুখ ধুয়ে খাওয়া দাওয়া চুকিয়ে কম্বল কি লেপের ভেতর ঢুকে পড়াটাই এখন একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু রমেন বয়সে বড়, সহকর্মী। তাছাড়া তার সঙ্গ পেতে সে এমন উৎসুক যে মুখের ওপর না বলা গেল না।
সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ থেকে ডাইনে ঘুরে ফাঁকা হয়ে আসা বিবেকানন্দ রোড ধরে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নিমেষে বিনয় টের পেয়ে গেল, রমেন অন্যের কথা শোনার চেয়ে নিজের কথা বলতেই বেশি ভালবাসে। মিনিট চারেকের ভেতর তার জীবনের সত্তর শতাংশ জানা হয়ে যায় বিনয়ের।
রমেন বলে, আমি যে ঢাকার কাগজে রিপোর্টারি করতাম, হে তো শোনছই। মীরকাদিমের নাম জানো? ঢাকার পোলা যখন নিশ্চয়ই জানো। মুন্সিগঞ্জ স্টিমারঘাটা থিকা বড় জোর মাইল তিনেক। সেইখানে আমাগো বাড়ি। বাড়িতে থাকত বাবা, মা, এক ভাই, আঠার উনিশ বচ্ছরের এক ভগ্নী। আমি বি. এ পাস কইরা ঢাকার কাগজে চাকরি নিলাম। কামকাজ যেখানে করি সেইখানেই তো থাকা লাগব। নাকি? আমি ঢাকাতেই থাকতাম। অনর্গল বকে যায় সে।
