কী হল তোমার? কী হল?
উদ্বিগ্ন সুধেন্দুরা দৌড়ে আসে।
লাইব্রেরির শেষ মাথা থেকে মার্কামারা গলায় রামগোপাল দত্ত চেঁচিয়ে উঠলেন, ছোকরা অমন ছেতরে পড়ল কেন হে? দেখ, ওকে দেখ–
বিনয় ভীষণ অস্বস্তি বোধ করছিল। লজ্জার একশেষ। কোনওরকমে সামলে নিয়ে টেবল থেকে নিজেকে টেনে তুলে সোজা হয়ে বসল।
সুধেন্দুরা ঝুঁকে পড়েছিল। কি, শরীর খুব খারাপ লাগছে?
বিব্রতভাবে বিনয় বলল, না না, আমি ঠিক আছি। মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গিয়েছিল। তাই
সুধেন্দুরা বার বার জানতে চাইল, ডাক্তারখানায় নিয়ে যাবে কি না। বিনয় তাদের বোঝালো তার জন্য উৎকণ্ঠার কারণ নেই। ডাক্তার দেখাবার মতো কিছুই হয়নি।
সুধেন্দুরা যে-যার জায়গায় ফিরে গেল।
টেবলের ওপর নিউজপ্রিন্টের চৌকো চৌকো কটা বাঁধানো প্যাড পড়ে ছিল। সেগুলো সাংবাদিকদের লেখালিখির জন্য। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর একটা প্যাড টেনে নিয়ে কাগজের সেই প্রতিবেদনটা থেকে নীলমের জীবনের ঘটনাধারার চুম্বক টুকে নিতে লাগল বিনয়। পরে এগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে বিশদ করে লিখতে হবে।
ওদিকে সুধেন্দুরাও তাদের পছন্দমতো বিষয় পেয়ে সংক্ষেপে মূল পয়েন্টগুলো লিখে নিচ্ছে।
.
লাইব্রেরির কাজ শেষ হলে রামগোপালের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিনয়রা ফের নিউজ ডিপার্টমেন্টে প্রসাদ লাহিড়ির কাছে চলে এল।
প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, কী, ইন্টারেস্টিং কিছু মেটিরিয়াল পাওয়া গেল?
সুধেন্দু, মণিলাল এবং রমেন জানালো, লেখার মতো ভাল মালমশলা তারা পেয়েছে।
প্রসাদ বিনয়ের দিকে তাকালেন, তুমি?
বিনয় ভারী গলায় বলল, আমিও পেয়েছি। লাহোরের একটি মেয়ের লাইফ হিস্ট্রি।
সবাই কপি তৈরি করে নিয়ে এস।
রিপোর্টিং সেকশানে বেশ কটা নতুন টেবল চেয়ার খুব যত্ন করে পর পর পেতে রাখা আছে। বিনয়রা এক-একটা টেবল নিয়ে বসে পড়ে।
সাব-এডিটর, প্রফ-রিডার এবং ফটোগ্রাফারদের টেবলগুলো থেকে কলরোল ভেসে আসছে। এদের আধাআধি অল্প বয়সের টাটকা যুবক। কলেজ বা ইউনিভার্সিটি থেকে সবে বেরিয়েছে। নতুন কাগজে নতুন চাকরি। বিপুল উৎসাহ তাদের। প্রবল উদ্দীপনা। অবশ্য বয়স্ক, অভিজ্ঞ সাংবাদিকও রয়েছে। অন্য সব কাগজ থেকে তাদের বেশি টাকার টোপ দিয়ে নিয়ে এসেছেন জগদীশ গুহঠাকুরতা। নতুন পুরানো মিলিয়ে তার নতুন ভারত-এর টিম।
আনকোরা ছোকরা সাংবাদিকদের ক্যাচর ম্যাচর তো রয়েছেই। তার সঙ্গে দুই টেলিপ্রিন্টারের অবিরাম খটখটানি। কিন্তু এই শব্দপুঞ্জ বিনয়ের কানে ঢুকছে না। হালকা গুঞ্জনের মতো পাশ দিয়ে পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। লাহোরের এক লুণ্ঠিত তরুণী, দুবছর ধরে তার মৃত্যুযন্ত্রণা, তাকে নরক থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা, নিদারুণ লাঞ্ছনার পর তার পুনর্জন্ম–সব একাকার হয়ে বিনয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
কেমন ছিল নীলম? দিল্লির কাগজের সেই লেখাটার সঙ্গে তার কোনও ছবি ছাপা হয়নি। বিনয় কল্পনা করে নেয়, সে সুন্দরী। সদ্যফোঁটা ফুলের মতো। সে চুলবুলে। চঞ্চল, লঘু কোনও পাখির মতো। আর দশটা ওই বয়সের মেয়ের মতো দুই মুঠিতে স্বপ্ন পুরে মনে মনে, উড়ে উড়ে, আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে, দূরে কোথাও ভেসে যেতে সে ভালবাসত। কিন্তু লাহোরের দাঙ্গায় তার সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই।
বিনয় নীলমের মুখ যতবার ভাবতে চেষ্টা করছে ততবারই সেটা ঝিনুকের মুখ হয়ে যাচ্ছে।
একসময় তার মনে হল, দেরি করা ঠিক নয়। সব টেবলেই সাংবাদিকদের লেখালেখির জন্য নিউজ প্রিন্টের চৌকো চৌকো প্যাড পড়ে আছে। ভাবনাটা গোছগাছ করে নিয়ে একটা প্যাড টেনে সে লিখতে শুরু করে।
লেখাটা শেষ করতে বেশ সময় লাগল। বাইরে শীতের রোদ কখন মুছে গেছে, কখন নেমেছে সন্ধ্যা, কখন রাস্তায় আলোগুলো জ্বলে উঠেছে, খেয়াল করেনি বিনয়। নিউজ ডিপার্টমেন্টের বিশাল হল-ঘরটাকে আলোয় ভাসিয়ে দিয়ে চতুর্দিকে অগুনতি তেজী বাল্ব জ্বলছে।
বিনয় লক্ষ করল, তার পাশের টেবলগুলোতে সুধেন্দুরা নেই। দূরে সাব-এডিটরদের জটলায় গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। একই কাগজে কাজ করবে। সবাই সহকর্মী। প্রথম দিনই আলাপ-পরিচয় করে নিচ্ছে। আন্দাজ করা যাচ্ছে, সুধেন্দুরা এর মধ্যেই কপি তৈরি করে প্রসাদের কাছে জমা দিয়েছে।
ওধার থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে লেখাটা পড়ে ফেলল বিনয়। একবার। দুবার। তিন বার। নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিক সেদিন বার বার বলে দিয়েছিলেন, খবরের কাগজের বেশির ভাগ পাঠকই সাধারণ মানুষ। বিদ্যেবুদ্ধি যৎসামান্য। তারা যাতে সহজেই বুঝতে পারে তেমন ভাষায় লিখতে হবে। যতটা সম্ভব খটমট, শক্ত শক্ত শব্দ বাদ দেওয়া দরকার।
তিন বার পড়ার পর কয়েকটা আলগা, অনাবশ্যক শব্দ বাদ দিয়ে অন্য শব্দ বসাল বিনয়। ছসাতটা সেনটেন্স কেটেকুটে ছোট করল। তারপর লেখাটা নিয়ে পায়ে পায়ে প্রসাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
প্রসাদ ঘাড় ঝুঁকিয়ে লিখছিলেন, পায়ের আওয়াজে মুখ তুলে তাকালেন। বিনয়কে বসতে বলে জিজ্ঞেস করলেন, হয়ে গেছে?
নিঃশব্দে টেবলের এধারে একটা চেয়ারে বসতে বসতে হাতের লেখাটা বাড়িয়ে দিয়ে বিনয় ঘাড় কাত করে। আধফোঁটা গলায় বলে, হ্যাঁ। এই যে
লেখাটা নিয়ে তক্ষুনি পড়তে শুরু করেন প্রসাদ। বিনয়ের বুক দুরু দুরু। তার লেখা তারাপদ ভৌমিকের ভাল লেগেছিল বলে প্রসাদ লাহিড়ির ভাল লাগবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। পড়তে পড়তে প্রসাদের চোখেমুখে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করছে সে।
